আমেরিকায় বাংলা বইমেলা ও সাহিত্য উৎসব
- ভাষা ও ভালোবাসায় স্পন্দিত প্রাণ

বিদেশের মাটিতে নিজের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির শিকড় প্রোথিত ও বিস্তৃত করতে হলে তা নতুন প্রজন্মের মধ্যে প্রবাহিত করার কোনো বিকল্প নেই
যুক্তরাষ্ট্রে এটি আমার দ্বিতীয় সফর। কিন্তু এই দুটো সফরই বিশেষ একটি কারণে আমার কাছে উল্লেখযোগ্য। সেই বিশেষ কারণটি হলো এই দুবারই আমি এসেছি লেখক হিসেবে আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে। প্রথমবার ২০২৫ সালের মে মাসে; নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা উদ্বোধন করতে। দ্বিতীয়বার ডিসি বাংলা সাহিত্য উৎসবের প্রধান অতিথি ও উদ্বোধক হিসেবে। এ দুটি উৎসবই আমাকে অসাধারণ সব অভিজ্ঞতা উপহার দিয়েছে। অনুভব করিয়েছে বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের এই মার্কিন মুল্লুকেও বাংলা ভাষাভাষী মানুষের অনুভব, উচ্ছ্বাস, উদযাপনের সুতীব্র ব্যকুলতা।
২০২৫ সালে ছিল নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার ৩৪তম আসর। সেই আসরের উদ্বোধক হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয় আমাকে। সেই আমন্ত্রণ পেয়ে একই সঙ্গে ভীষণ উচ্ছ্বসিত ও হতবিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম। কারণ, বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বাইরে বাংলা ভাষায় প্রকাশিত বইয়ের সবচেয়ে বড় আয়োজন এই নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা। ১৯৯২ সালে শুরু হওয়ার পর থেকে প্রতিবছর জ্যামাইকার পারফর্মিং আর্ট সেন্টারে নিরবচ্ছিন্নভাবে আয়োজিত হচ্ছে এই বইমেলা এবং বিভিন্ন সময়ে এর উদ্বোধন করেছেন হুমায়ূন আহমেদ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সৈয়দ শামসুল হক, হুমায়ুন আজাদ, হাসান আজিজুল হক, অধ্যাপক আনিসুজ্জামানসহ বাংলা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্ররা। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই মেলার উদ্বোধক হিসেবে আমন্ত্রণ পেয়ে রীতিমতো বিস্মিত ও বিহ্বল হয়ে পড়েছিলাম আমি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধায়ও ভুগেছি। কারণ, এ রীতিমতো অভাবনীয় এক ব্যাপার। শেষ অবধি নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ লেখক হিসেবে এর ৩৪তম আসর উদ্বোধন করি আমি এবং সঞ্চয় করি অসাধারণ, অনিন্দ্য সব অভিজ্ঞতা। ২০২৫ সালটি তাই আমার লেখকজীবনের জন্য বিশেষ এক বছর। সেবার নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বইমেলার আয়োজকদের আন্তরিকতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ীদের অশেষ ভালোবাসা নিয়ে আমি অংশ নিতে যাই ভার্জিনিয়ায় অনুষ্ঠিত ডিসি বাংলা সাহিত্য উৎসবের প্রথম আসরে। সেখানেও যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী বাংলা ভাষাভাষী মানুষের যে ভালোবাসা আমি পেয়েছি, তা অভাবনীয়। এই অভিজ্ঞতাও চিরকাল ভাস্বর হয়ে থাকবে আমার হৃদয়ের গহিন গোপন কোণে।
২০২৫ সালের অবিস্মরণীয় সেই সফরের ধারাবাহিকতাতেই এবার ২০২৬ সালেও যুক্তরাষ্ট্র সফরের আমন্ত্রণ পাই আমি। আবারও অংশ নিই নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা ও ডিসি বাংলা সাহিত্য উৎসবে। প্রথমবার যেকোনো অভিজ্ঞতাই সম্ভবত স্রেফ নতুন কিছুর স্বাদ নেওয়ার, স্পর্শ, অনুভব কিংবা দর্শনের আনন্দ-আচ্ছাদনে আবৃত থাকে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা উন্মুক্ত হতে থাকে, ঝলমলে মোড়কের ভেতরটাও আবিষ্কার করার সুযোগ হয়। খুলে ফেলা যায় একরঙা রোমাঞ্চকর চশমাও। দর্শন করার সুযোগ হয় নির্মোহ, নিরপেক্ষভাবে। আমার যুক্তরাষ্ট্র সফরের দ্বিতীয় পর্বে সেই উপলব্ধি বা দর্শনের অভিজ্ঞতা কেমন?
নিউ ইয়র্ক বাংলা বইমেলা ২০২৬
৩৫তম নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলা উদ্বোধন করেন প্রখ্যাত লেখক ইমদাদুল হক মিলন। প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ড. রওনক জাহান, চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগর, ভয়েস অব আমেরিকা বাংলা বিভাগের প্রথম নারীপ্রধান রোকেয়া হায়দার, কবি সুবোধ সরকারসহ অসংখ্য গুণী মানুষ।
উদ্বোধন অনুষ্ঠানটি আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছে। জ্যামাইকা পারফর্মিং আর্ট সেন্টারের ঘাসে ঢাকা সবুজ চত্বরে যেন ভেসে উঠেছিল একটুকরো জীবন্ত বাংলাদেশ। বাংলা গান, নৃত্য, সাজপোশাকে শত শত মানুষের যে প্রাণবন্ত উপস্থিতি, তা যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল পহেলা বৈশাখের রমনা বটমূলকে। আবার বাংলা বইয়ের স্টলগুলোয় পাঠকের যে জমজমাট ভিড়, তা যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল ঢাকার অমর একুশে বইমেলার দৃশ্যকেই। চারদিকে যেদিকে তাকাই রঙবেরঙের শাড়ি, পাঞ্জাবিতে প্রজাপতির মতো উড়ে বেড়াচ্ছিল বাংলা ভাষাভাষী মানুষ। তাদের চোখেমুখে সে কী উচ্ছ্বাস, উদযাপনের আনন্দ! যেন এতদূরের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতেও বাঙালিয়ানা উদযাপনের অনিবার্য অনুষঙ্গ এই বইমেলা। এ মেলা ছাড়া অপূর্ণ তাদের বছরের সালতামামি। এত কিছুর ভিড়েও একটি বিষয় আমাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। আর তা হলো শিশু-কিশোরদের উপস্থিতি। কারণ, বিদেশের মাটিতে নিজের ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির শিকড় প্রোথিত ও বিস্তৃত করতে হলে তা নতুন প্রজন্মের মধ্যে প্রবাহিত করার কোনো বিকল্প নেই। এই কাজটিও দারুণভাবে করেছে মেলা কর্তৃপক্ষ। চার দিনের এই বইমেলায় মিলনায়তনে যেমন দিনভর শিল্প-সাহিত্য, সংগীত, নৃত্য নিয়ে নানা আয়োজন চলেছে, তেমনি বাইরের চত্বর জুড়ে স্টলগুলোয় চলেছে বইয়ের বিকিকিনি। যদিও মেলার দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন তুমুল বৃষ্টি ও কনকনে ঠান্ডা হাওয়ায় ছন্দপতন ঘটে সেই প্রবাহের। তবে শেষ দিনে সূর্যের আলোর সঙ্গে সঙ্গে আবার যেন ঝলমল করে ওঠে এই বইমেলা প্রাঙ্গণ। সঙ্গে মানুষের মন ও মুখও। ১৯৯২ সাল থেকে শুরু হওয়া এই বইমেলা যে যুক্তরাষ্ট্রের মতো জায়গায় প্রায় তিন যুগ ধরে এমন আলো ছড়াচ্ছে, ক্রমে বিস্তৃত হচ্ছে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে, তা না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন। সুদীর্ঘ সময় ধরে এমন একটি আয়োজন অব্যাহত রাখা রীতিমতো অসম্ভব এক ব্যাপার। হয়তো এ কারণেই এর কিছু কিছু ত্রুটি বা সীমাবদ্ধতা চোখে পড়লেও তা আমাকে একটুও আশাহত হতে দেয়নি; বরং সর্বৈব অর্থেই আলোড়িত করেছে এবং এই আয়োজনে বাংলাদেশ সরকারের যুক্ততা কিংবা সহযোগিতার বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ভাবনা সম্পর্কে কৌতূহলী করেছে। নিউ ইয়র্ক আন্তর্জাতিক বাংলা বইমেলার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুক্তধারা কর্ণধার বিশ্বজিৎ সাহা। তিনি যা করেছেন, তা নিঃসন্দেহে অনন্য এক যাত্রা। তবে এই যাত্রা যেন কিছুতেই বন্ধ না হয়, থমকে না দাঁড়ায়, সে বিষয়ে সরকারি তরফেও যেন উদ্যোগ নেওয়া হয়— সেই প্রত্যাশা থাকবে।
ডিসি বাংলা সাহিত্য উৎসব ২০২৬
ওয়াশিংটন ডিসির ভার্জিনিয়ায় গত বছর প্রথমবারের মতো শুরু হয় ডিসি বাংলা সাহিত্য উৎসব। কবিতা দিলাওয়ার এই উৎসবের উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা। তাকে আমি ব্যক্তিগতভাবে একজন সাহিত্য অন্তঃপ্রাণ মানুষ হিসেবেই চিনতাম। তিনি কবিতা আবৃত্তি করেন। ‘কবিতার সাথে’ নামে অনলাইনে একটি পডকাস্ট করেন। তাতে বাংলা ভাষা, গান, শিল্প ও সাহিত্যের নানা মাধ্যমের লোকেরা উপস্থিত হন। সেভাবেই আমাদের পরিচয়। চুপচাপ, শান্ত, কোমল স্বভাবের মানুষ। কিন্তু সেই মানুষটি যে এমন একটি মহাযজ্ঞ করে ফেলতে পারেন, তা কিছুতেই ভাবিনি। ২০২৫ সালে এই উৎসব প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয় ভার্জিনিয়ার স্প্রিংফিল্ডের হোটেল হলিডে ইনে। সেই আয়োজন ছিল একদিনের এবং বাংলা বইয়ের স্টলের সঙ্গে সঙ্গে ছিল নানা আয়োজন। এবার ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে হলো ডিসি বাংলা সাহিত্য উৎসবের দ্বিতীয় আয়োজন। আর তা হলো দুদিনের। এই দুদিনে সেই আয়োজন ছাপিয়ে গেছে তার প্রথম আসরকে। এটি হয়েছে আরও বর্ণাঢ্য, জমকালো ও বৃহৎ। দুদিনের এই অসাধারণ আয়োজনের উদ্বোধক হিসেবে যখন ফিতা কেটে এর লোগোর মোড়ক উন্মোচন করি, তখন হলভর্তি দর্শক যে তুমুল উচ্ছ্বাস, হর্ষধ্বনি ও করতালিতে প্রকম্পিত করে তুলেছিলেন ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির মিলনায়তন, সেই কম্পন বা শব্দ যেন ছড়িয়ে পড়ছিল দূর থেকে দূরে, দিক থেকে দিগন্তে, দেশ থেকে দেশান্তরে। কে জানে, বাংলা ভাষা অন্তঃপ্রাণ মানুষগুলো হয়তো এভাবেই এই ভাষা, সাহিত্য, সংস্কৃতিকে ছড়িয়ে দেবে বিশ্বময়। আর নিজেরা হয়ে উঠবে এই ভাষার প্রাণসঞ্চারী বীজ। আর সেই বীজ যদি ছড়িয়ে পড়ে, তবে তা মহীরুহ হয়ে উঠবেই।
ডিসি বাংলা সাহিত্য উৎসবের সমাপনী পর্বে সংগীত পরিবেশন করছিলেন বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীতশিল্পী অদিতি মহসিন। তিনি যখন গাইছিলেন ‘আগুনের পরশমণি ছোঁয়াও প্রাণে...’, তখন আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল, এতদূর দেশে বসেও এই যে মানুষগুলো বুকের গভীরে দ্বীপ জ্বেলে রেখেছে মা, মাটি ও মাতৃভাষাকে, তাদের চেয়ে বড় পরশমণি আর কে আছে! এই পরশমণি স্পর্শ করুক আরও অসংখ্য মানুষের মন। অযুত জীবন। আলোয় ভরে উঠুক ভাষা ও ভাবনার ভুবন।
লেখক: কথাসাহিত্যিক







