নির্বাচিত কবিতা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
উম্মে রায়হানা
তুমি আমার
‘তুমি আমার’ বলে
লোকে অনেক কিছুই বলে!
যেমন, ‘তুমি আমার পোড়া রুটি’
আদর খাওয়ার ছলে!
‘তুমি আমার ছোড়দি হবে, বৌদি হবে?’ বলে, যেমন নজরুলের ঐ খুকির মতন
সব খুকিদের দুইটা ঝুটি দোলে!
‘তুমি আমার বিড়াল বাচ্চা কুকুরছানা’ হলে
কোথাও তোমায় রাখতাম না,
রাখতাম শুধু কোলে—
‘তুমি আমার আকাশ বাতাস মেঘ বিদ্যুৎ’ হয়ে
যেমন শরীরজুড়ে বৃষ্টি নামাও, ঝড়ের মতন বয়ে—
শেষে ‘তুমি আমার মিথ্যাবাদী রাখাল ছেলে’ও হলে
মিথ্যাগুলো উঠলো ভরে ফুলে এবং ফলে—
‘তুমি আমার ঘর’ হয়েছ? চাওনি হতে!
আচ্ছা তবে থাকুক পড়ে এখন সকল কথাই
আকাশ জুড়ে মেঘ করেছে, আমিই বোকা!
অন্ধকারে লিখছি বসে বৃথাই
‘তুমি আমার পর’ হলে কি
শুঁকবো না আর তোমার গায়ের ঘ্রাণ?
অন্য মেয়ে কামড়ে দিয়ে
বলবে কানে, ‘তুমি আমার জান’!
রনক জামান
নিরুদ্দেশ
যদিও গন্তব্য নাই, তাও হাঁটতেছিলাম
টেনে-হিঁচড়েই বয়ে নিয়ে যাইতেছিলাম—
কোন্ দিকে
সড়কে
মাটিতে— নিজেরই ছায়াটা ঘষে ঘষে...
সেঁজুতি জাহান
একটি রাজনৈতিক কবিতা
এক টুকরো কাগজ আর একটা মাইক্রোফোন কারও হাতে থাকলেই আমরা তাকে বিশ্বাস করে ফেলি। আমাদের মনস্তত্ত্ব এমনভাবে তৈরি হয়ে গেছে যেন তারাই আমাদের মাথা। আমাদের যাবতীয় কথা গিয়ে মিশে যায় যুদ্ধের ঠোঙায়। আমাদের কানের মধ্যে দফের পেটের মতো বাজতে থাকে কামানের কাশি আর হৃদয়ের দোয়াতে কে যেন লিখতে থাকে কামের আহাজারিনামা। আমরা বিশ্বাস করি— এখানে, ওখানে, যেখানে যা-ই ঘটে যাক; খুব ভালোভাবে কোথাও কিছু ঘটে না, খারাপও চিরকাল নিজস্ব তাঁতে জাবর কাটে না।
আমাদের কথা ছিল গর্বের সঙ্গে আমাদের প্রেম ও ন্যূনতম স্বস্তির গান সুর করার। আমরা সেটা পারিনি, কখনো কখনো করিওনি। আমরা ক্রমশই হয়ে গেছি বিয়োগান্তক স্ক্রিপ্টের কোনো ত্রিস্তান-রেখা। দুঃস্বপ্নের ভয়ে রাতের বুক থেকে ঘুমকে আলাদা করে দিয়েছি। আমাদের কারও চোখে প্রভুর মতো ভক্তি নেই, কমলার মতো সমর্পণ নেই, ওরিয়ান্নার মতো মমতা নেই। আমাদের মাথা কেবল একটি কাগজ আর একটা ইতস্তত মাইক্রোফোন। আমাদের খুলিগুলো দূরতর হাওয়ায় খুলে পড়া বিল্ডার্স বট। যেকোনো যুদ্ধের বিকট পরিণতি আমাদের স্মৃতিকে খুঁচিয়ে তোলে, আমাদের সংকটগুলো মোরগের গ্রীবার মতো প্রসারিত করে। আমরা হেরে যেতে চাই, না হারার সীমানা-চেরা প্রতিযোগিতায়। আমরা হেরে যেতে চাই, হেরেই থাকতে চাই। কখনোবা অসীম শক্তি হয়ে ভূপতিত করি কোনো ভৌতিক জাদুমন্ত্র। আবার ভূত হয়ে জন্মাই নতুন রূপ ধরে, চেতনার ঘাড়ে ঘাড়ে। আমরা তাদের কথা শুনি যাদের মাথায় কান থাকে না। আমরা তাদের কথা শুনি যাদের মুখে জিভ থাকে না, পেটের ভেতর অন্ত্র থাকে না।
আমরা তাদের বিশ্বাস করি যারা আমাদের স্বীকার করে না, ভালোবাসি তাদের যারা আমাদের কৃতদাস মনে করে। আম-পাকা গাছের ঘ্রাণ আর বেহালার সুরে বেজে ওঠা কোনো এক পটার কাছে ফিরে যেতে চাই, যেনবা সে সবকিছু বুঝে এটিএম বুথের মতো সমাধান দিতে থাকবে।
আমরা ভুলে যাই ইতিহাসের কাঁথা একদিন ঢেকেছিল আমাদের ভাঙা ভাঙা শীতল মেরুদণ্ড। আমরা মুগ্ধ হই না, আমরা ভক্তি করি না, আমরা যেনবা আসমান থেকেই সরাসরি নেমে আসা প্রাণী।
আমরা মানচিত্রের কাছে গিয়ে দাঁড়াতে পারি না, মুখগুলো দেখাতে পারি না মানচিত্রের নামের সামনে।
এক টুকরো কাপড়ে মোড়ানো অদম্য এক বিলকিস যেন এ ভূমির বৃদ্ধা মানচিত্র!



