প্রদর্শনী পরিক্রমা
ক্যানভাসে অবিরাম সময়ের প্রবাহ

জলের নিজস্ব কোনো স্থিরতা নেই। বাতাস বদলালে তার রঙ বদলায়, আলো বদলালে বদলে যায় তার শরীর। দূরের নৌকা, নদীর পাড় কিংবা গাছের ছায়াও তাই কখনো একই থাকে না। শিল্পীর চোখে ধরা পড়া প্রকৃতিও এমনই— দৃশ্যমান অথচ পরিবর্তনশীল, পরিচিত অথচ প্রতিবার নতুন। ‘কন্টিনিউয়াম’-এর শিল্পকর্মগুলোয় প্রকৃতিকে দেখার এই পরিবর্তনশীল দৃষ্টিই বারবার ফিরে আসে। সিদ্ধার্থ তালুকদার, কারু তিতাস ও নাজমুল হক বাপ্পীর শিল্পকর্ম নিয়ে লালমাটিয়ার ভূমি গ্যালারিতে আয়োজিত দলীয় প্রদর্শনী ‘কন্টিনিউয়াম’ যেন তিনটি পৃথক শিল্পভাষার মধ্য দিয়ে একই প্রবাহকে অনুভব করার সুযোগ তৈরি করেছে। ১২ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই প্রদর্শনীতে তেলরঙ, অ্যাক্রিলিক, জলরঙ ও মিশ্র মাধ্যমে আঁকা প্রায় ৬০টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হচ্ছে। তিন শিল্পীর কাজের বিষয়, রঙ প্রয়োগ ও নির্মাণভঙ্গিতে পার্থক্য থাকলেও প্রকৃতি, স্মৃতি, সময় ও দৃশ্যমান বাস্তবতার সঙ্গে তাদের নিজস্ব সংলাপই প্রদর্শনীর মূল শক্তি। সিদ্ধার্থ তালুকদারের কাজ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকে আছে বিমূর্ততার দিকে। তার ক্যানভাসে দৃশ্যমান কোনো নির্দিষ্ট অবয়বকে সরাসরি অনুসরণ করার চেয়ে রঙ, রেখা, আকৃতি ও পৃষ্ঠের পারস্পরিক সম্পর্ক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কোথাও রেখা ভেঙে যায়, কোথাও রঙের স্তর একে অন্যকে আড়াল করে, আবার কোথাও কিছু অস্পষ্ট আকৃতি দর্শকের চোখে ধরা দেয়। ফলে তার কাজকে একটি নির্দিষ্ট অর্থে আটকে রাখা কঠিন। বরং প্রতিটি ক্যানভাস দর্শককে নিজের মতো করে পড়ার সুযোগ দেয়। সিদ্ধার্থ তালুকদারের বিমূর্ততার মধ্যে প্রকৃতি ও বাস্তবতার ইঙ্গিত থাকলেও তা সরাসরি দৃশ্যের অনুবাদ নয়। পরিচিত কোনো দৃশ্য ধীরে ধীরে ভেঙে গিয়ে যখন রঙ ও রেখার স্বাধীন বিন্যাসে পরিণত হয়, তখন বাস্তবতা সেখানে নতুন এক অভিজ্ঞতা তৈরি করে। তার কাজের এই বিমূর্ত প্রবণতা ‘কন্টিনিউয়াম’-এর ধারণার সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত— কারণ, এখানে কোনো দৃশ্যের শেষ সীমানা নির্দিষ্ট নয়; একটি আকার আরেক আকারে, একটি রঙ আরেক রঙে ক্রমাগত রূপান্তরিত হয়। অন্যদিকে কারু তিতাসের কাজে সবচেয়ে আগে চোখে পড়ে রঙের প্রাধান্য। তার ক্যানভাসে রঙ শুধু দৃশ্যকে পূর্ণ করার উপকরণ নয়, বরং নিজেই হয়ে ওঠে বক্তব্যের প্রধান ভাষা। উজ্জ্বল ও গভীর রঙের পাশাপাশি রঙের স্তর, সংঘাত এবং পাশাপাশি অবস্থান ছবির ভেতরে তৈরি করে এক ধরনের প্রাণবন্ততা। প্রকৃতি, গাছপালা কিংবা দৃশ্যের আভাস তার কাজে থাকলেও রঙের তীব্র উপস্থিতি অনেক সময় সেই দৃশ্যকে অতিক্রম করে যায়। কারু তিতাসের ছবিতে তাই প্রকৃতিকে শুধু দেখা যায় না, অনুভবও করা যায়। সবুজের ভেতর অন্য রঙের প্রবেশ, নীলের সঙ্গে উষ্ণ রঙের সম্পর্ক কিংবা আলো-আঁধারির পার্থক্য— সব মিলিয়ে তার কাজের পৃষ্ঠে তৈরি হয় একধরনের স্পন্দন। কখনো তা উচ্ছল, কখনো গভীর, আবার কখনো স্বপ্নময়। তার রঙের ব্যবহার দর্শককে দৃশ্যের ভেতরে টেনে নেয় এবং বাস্তবতার চেয়ে অনুভূতির দিকে বেশি মনোযোগী করে তোলে। নাজমুল হক বাপ্পীর কাজে আবার সম্পূর্ণ ভিন্ন এক আবহ তৈরি হয়েছে। তার ক্যানভাসে রঙের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে হালকা ও সংযত। জলরঙ ও মিশ্র মাধ্যমে নির্মিত কাজগুলোয় স্বচ্ছতা, আলো এবং ফাঁকা জায়গার ব্যবহার বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নীল, ধূসর, মাটি কিংবা সবুজের মৃদু টোনে তার দৃশ্যগুলো অনেক সময় যেন কুয়াশার ভেতর থেকে ভেসে ওঠে। কোথাও নদী, কোথাও নৌকা, কোথাও দূরের ভূদৃশ্য— সবকিছুই স্পষ্ট অথচ সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়। এই অস্পষ্টতাই নাজমুল হক বাপ্পীর কাজের অন্যতম সৌন্দর্য। তিনি দৃশ্যকে পুরোপুরি প্রকাশ না করে এর কিছুটা দর্শকের কল্পনার জন্য রেখে দেন। হালকা রঙের স্তর ও নরম টোনের কারণে তার ছবিতে একধরনের নীরবতা তৈরি হয়। সেখানে প্রকৃতি যেন কোনো উচ্চকণ্ঠ বক্তব্য নয়; বরং ধীর, দীর্ঘস্থায়ী একটি অনুভূতি। বিশেষ করে জল ও নৌকার উপস্থিতি তার কাজে সময় ও যাত্রার প্রতীকী ব্যঞ্জনা তৈরি করে। তিন শিল্পীর কাজ পাশাপাশি দেখলে তিন ধরনের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে— কারও কাজে বিমূর্ততা ও রেখা-আকৃতির অনুসন্ধান, কারও রঙের তীব্র ও প্রাণবন্ত ব্যবহার আর কারও কাজে সংযত রঙ, স্বচ্ছতা ও আবহনির্ভর নির্মাণ। অথচ এই পার্থক্যই প্রদর্শনীকে বিচ্ছিন্ন করেনি; বরং পরস্পরের পরিপূরক করে তুলেছে। একজন যেখানে দৃশ্যকে ভেঙে তার অন্তর্গত কাঠামো খুঁজছেন, অন্যজন সেখানে রঙের মধ্য দিয়ে অনুভূতির বিস্তার ঘটাচ্ছেন আর তৃতীয়জন দৃশ্যকে মৃদু আলো ও রঙের স্তরে ধরে রাখছেন। ‘কন্টিনিউয়াম’ নামটির তাৎপর্যও এখানেই। শিল্পের ধারাবাহিকতা শুধু সময়ের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার মধ্যে নয়; একই সঙ্গে তা শিল্পীর নিজস্ব অনুসন্ধান, মাধ্যমের পরিবর্তন এবং দর্শকের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেও প্রবাহিত হয়। রাজধানীর লালমাটিয়ায় ভূমি গ্যালারিতে গত ১২ সেপ্টেম্বর এই প্রদর্শনী উদ্বোধন হয়। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পী ও ইমেরিটাস অধ্যাপক হাশেম খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন স্থপতি মুস্তাফা খালিদ পলাশ। আরও ছিলেন ভূমি গ্যালারির প্রতিষ্ঠাতা সাইফুর রহমান লেনিন। ‘কন্টিনিউয়াম’ শেষ হবে আগামী ২৫ সেপ্টেম্বর। প্রতিদিন বেলা ৩টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এই প্রদর্শনী দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত।



