শামসুর রাহমান ও মোহাম্মদ রফিক
দুই কবির দুটি অগ্রন্থিত গদ্য

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শামসুর রাহমান ও মোহাম্মদ রফিক— দুই প্রজন্মের দুই মহান কবির জন্মদিন কাকতালীয়ভাবে অভিন্ন মাসের একই তারিখে, ২৩ অক্টোবর। বাংলাদেশের সাহিত্যের ইতিহাসে তাদের দুজনেরই কবিতার অবস্থান যে চিরস্থায়ী, সে সম্পর্কে কারও দ্বিমত নেই। তেমনি তাদের গদ্যও যে সমানভাবে ঋদ্ধ ও বিশিষ্ট, তাও সমঝদার পাঠকরা জানেন। তাদের জন্মতিথি উপলক্ষে দুজনের লেখা দুটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রন্থিত গদ্য একত্রে সংকলিত হলো এ আয়োজনে। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে, ১৯৭২ সালের ২ এপ্রিল দৈনিক বাংলায় প্রকাশ পাওয়া অ্যানা ফ্র্যাংকের ডায়েরি প্রসঙ্গে রচিত তার তেমনই একটি গদ্য এখানে পত্রস্থ হয়েছে। পক্ষান্তরে মোহাম্মদ রফিক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত কিংবদন্তিতুল্য লিটল ম্যাগাজিন ‘কণ্ঠস্বর’-এর ১৯৬৫ সালে প্রকাশিত প্রথম সংখ্যাতেই হেরমান হেসের ‘Narcissus and Goldmund’ উপন্যাসটি নিয়ে তিনি লিখেছিলেন সংক্ষিপ্ত অথচ সংবেদী এক আলোচনা। তার গদ্যগ্রন্থের কোনোটিতেই অদ্যাবধি অন্তর্ভুক্ত না হওয়া লেখাটিও স্থান পেল এখানে
শামসুর রাহমান
একটি তরুণীর ডায়েরি
জীবনের প্রতি বিশ্বাস হারানো কি সম্ভব? কেউ কেউ হারান অবশ্যই, কিন্তু অনেকেই হারান না। জীবন নামক জটিল সুবিশাল প্রান্তরে যেমন ফুল ফোটে সুপ্রচুর, তেমনি জেগে থাকে রক্তপিপাসু কাঁটা। এই যে বাক্যটি আমি লিখলাম, এটা নিঃসন্দেহে ব্যবহারজীর্ণ। ফুলটুল আর কাঁটাফাটা ব্যবহার করতে করতে মানুষে এতদিনে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। কিন্তু কি জানেন, এসব শব্দ ভারি নাছোড়। যত পুরনোই হোক না কেন, ঘুরেফিরে এরা আসে, আসে নানা অনুষঙ্গ নিয়ে। যেমন প্রেম। প্রেম শব্দটি আদৌ নতুন কিছু নয়, কিন্তু আমাদের এই চেনা ভুবনে নিত্য প্রেমের আসা-যাওয়া। তাই ব্যবহারের ধুলো প্রেম নামক শব্দটির উজ্জ্বলতা হরণ করতে পারেনি আজও।
যা হোক, এই কিছুদিন আগেও আমাদের পক্ষে জীবনের প্রতি আস্থা রাখা সহজ ছিল না। জীবন আমাদের সামনে যেসব দৃশ্যাবলি তুলে ধরেছিল, তাতে ওকে ভয়ংকরের অন্য নাম বলেই চিনেছিলাম। কিন্তু কী আশ্চর্য, মৃত্যুর উন্মত্ত নৃত্যের মধ্যেও জীবনের জন্য আমাদের তৃষার তীব্রতা কমেনি এতটুকু। না, জীবনের প্রতি বিশ্বাস আমরা হারাইনি। যেমন হারায়নি অ্যানা ফ্র্যাংক। মানুষের প্রতি মানুষের নির্দয়তা, বর্বরের তাণ্ডবলীলা, সবকিছুই প্রত্যক্ষ করেছিল সেই তরুণী। ইহুদি হয়ে জন্মানোর মাশুল দিতে হয়েছিল। নাৎসিদের হাত থেকে রেহাই পায়নি সে। ইউরোপের অজস্র কঙ্কালের মধ্যে মিশে গিয়েছিল অ্যানা ফ্র্যাংকেরও কঙ্কাল। এ তরুণীর পরিচয়ও হয়তো হারিয়ে যেত, যদি না সে রেখে যেত তার চিরঞ্জীব ডায়েরি। নাৎসিদের চোখ এড়িয়ে, অস্ত্রের আঘাত এড়িয়ে অ্যানা ফ্র্যাংক তার পিতামাতা ও ভগ্নির সঙ্গে পঁচিশ মাস স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে ছিল একটা বাড়িতে। ওদের সঙ্গে ছিল আরও একটি ইহুদি পরিবার। যে বাড়িতে ওরা আশ্রয় নিয়েছিল তার নিচের তলায় একটা গুদাম ছিল। দিনে সেই গুদামে কাজ করত লোকজন। তাই দিনে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করতে পারত না ওপরতলার বাসিন্দারা। অতি সন্তর্পণে চলাফেরা করত, বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দিত বসে বসে। এই দমবন্ধ আস্তানায় দীর্ঘ পঁচিশটি মাস ওদের কাটাতে হয়েছিল। রাত এলে কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারত ওরা। কেননা, তখন গুদামঘরের কর্মীরা চলে যেত যে যার ঘরে।
এরই মধ্যে আসে জন্মদিন, বহু কষ্টে সুহৃদ আনেন সামান্য কিন্তু আন্তরিকতায় ভরপুর উপহার। এরই মধ্যে চলে করুণ গেরস্থালি, ঝগড়াঝাঁটি। এরই মধ্যে চলে পড়াশোনা, ডায়েরি লেখা। কখনো-সখনো ফাঁকফোকর দিয়ে দূরের নীলিমা ও গাঙচিলের ওড়াউড়ি দেখে নেয় অ্যানা ফ্র্যাংক। যদি রাস্তায় বেরিয়ে হাঁটতে পারত একটু, যদি বুক ভরে নিতে পারত খোলা হাওয়া। যে পরিবেশে অ্যানা ফ্র্যাংককে কাটাতে হয়েছে পঁচিশটি মাস, তেমন ভয়ানক পরিবেশ আমাদের অচেনা নয় আর। কমবেশি এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষেরই হয়েছে। আমাদের দেশের কোনো অ্যানা ফ্র্যাংকের কোনো ডায়েরির খোঁজ কি পাওয়া যাবে কখনো?
ইউরোপের মাটি যখন থরথর করে কাঁপছে হিটলারের ট্যাংকের ঘড়ঘড়ে, কামানের গোলায়, যখন পরিখার পর পরিখা ভরে উঠছে লাশে, ইহুদিদের হত্যা করা হচ্ছে নির্বিচারে, তখন মৃত্যুর চোয়ালে বসে একটি তরুণী রচনা করছে তার রোজনামচা। বস্তুত সেই তরুণী, অ্যানা ফ্র্যাংক, তার রক্তিমবর্ণ ডায়েরির দুটি মলাটের মধ্যে রেখে গেছে এক খণ্ড অমরতা। এ ডায়েরি কোনোদিন প্রকাশিত হবে তা সে কল্পনাও করেনি। দিনের পর দিন সে নিজের মনের কথা লিপিবদ্ধ করেছে ডায়েরির পাতায়। অ্যানা ফ্র্যাংক জানত না যে তার লেখনী থেকে যে শব্দমালা নিঃসৃত হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে উজ্জ্বল সাহিত্যকীর্তি হিসেবে বিবেচিত হবে। সর্বনাশা সংবর্তের মধ্যে সে ভরিয়ে তুলেছিল তার ডায়েরির পাতা— মানুষের ভয়ংকর রূপ তাকে প্রত্যক্ষ করতে হয়েছিল একজন ইহুদির ঘরে জন্মেছিল বলে। কিন্তু এসব সত্ত্বেও তার ডায়েরিতে কোনো তিক্ত সুর ধ্বনিত হয়নি। ভয়ংকরের মুখোমুখি দাঁড়িয়েও অ্যানা ফ্র্যাংক মানুষের শুভ চেতনার প্রতি বিশ্বাস হারায়নি। তাই দেখি, জীবনের চরম সংকট-লগ্নেও তার চরিত্রের মাধুর্য অক্ষুণ্ন থেকে যাচ্ছে, অম্লান থেকে যাচ্ছে হার্দিক সম্পদ।
বিকট ডিক্টেটর হিটলারের কর্কশ কণ্ঠস্বর স্তব্ধ হয়ে গেছে সেই কোন ধূসর অতীতে। কিন্তু অ্যানা ফ্র্যাংকের কণ্ঠস্বর আজও শুনতে পাচ্ছে নানা দেশের নানান মানুষ। চিরদিন শুনবে। অস্ত্রের ঝনঝন, ডিক্টেটরের চেঁচামেচি— কোনোকিছুই সেই কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করতে পারবে না কোনোদিন।
দৈনিক বাংলা, ২ এপ্রিল ১৯৭২
মোহাম্মদ রফিক
শিল্প ঈশ্বর প্রেম
‘Like great works, deep feelings always mean more than they are conscious of saying.’ —Albert Camus প্রেম সমস্ত সৃষ্টির মূল উৎস এবং মূল্যনির্ধারক। তাই প্রেমের ঔদার্যেই সমস্ত সৃষ্টিতে আন্তরিকতা লভ্য। আর আমার এই আলোচনা (‘Narcissus and Goldmund’, হেরমান হেস) সংক্রামিত প্রেমের পাণ্ডুলিপি, প্রেমে বলতে চেয়েছি আমার অনুভূতি।
জীবনকে কী গভীর প্রণয় এবং সেই প্রণয়ের অন্তিম সরলতায় কী গভীর ব্যর্থতা; সমস্ত মহৎ শিল্পই ব্যর্থ, যেহেতু জীবন ও জীবনের গভীরে প্রবেশ প্রচেষ্টা নিরর্থক— অসত্যের ভাঁড়ামিকেই বিনীত প্রশ্রয়। সত্যের হৃদয়ে প্রবেশ অসম্ভব আর প্রবেশের কিছুটা পথ আবিষ্কার করতে পারলেও সবার কাছে তাকে এনে উপস্থিত করা আরও অসম্ভব। ঈশ্বর ব্যর্থ, প্রণয় ব্যর্থ আর প্রণয়ই সমস্ত জ্ঞানের অন্তিম জ্ঞান, সমস্ত শিল্পের শুরু এবং শেষ।
হেরমান হেস লেখক। এবং কবি। এবং ঔপন্যাসিক। এবং সেই সব শিল্পীর একজন যারা ঈশ্বর। করুণ অথচ মহৎ। সুর, বেদনা, অনন্তে, আহা, আমার— আমাদের জীবন শুরু এবং এই শুরুর উত্তরণেই মৃত্যু। জন্ম এবং মৃত্যু— তারপর আনন্দ। জীবন তাই মৃত্যু এবং মৃত্যু তাই আনন্দ— আর এই আনন্দ প্রাপ্য ঈশ্বরের দেবতার সন্ন্যাসীর। আনন্দের পরিবেশন যার কাম্য, সে তো সবার থেকে মহৎ; তাই দুঃসহতম তার প্রকাশ। হেসে পড়তে গেলে শরীর কাঁপে; হৃদয়ে চাপা বেদনা, তবু হেসে আনন্দ— অনাবিল আনন্দ। ঝাঁক ঝাঁক মৃত্যুর শীর্ষে অর্ফিয়াসের সুর— রিল্কের দুর্বহ নির্জনতায় মুক্তির বিরল গান। ভালোবাসা মানুষের দুঃখকে দুঃখহীনতাকে এইখানে ডাকে— এই স্রোত বাতাসের স্বর আত্মার গূঢ়তা সমস্ত সৃষ্টির আন্তরিকতায়। এখানে এসে সমস্ত মতবাদ স্তব্ধ, বিচারক নিশ্চুপ— কেবল গভীরতম স্তব্ধতম অনুভূতির আলোড়ন। এ যে আত্মার অন্বেষণ, আত্মাকে অন্বেষণ, এক সমুদ্রজগৎ। ব্যর্থতার সৌরবলয় তাই মুক্তির সোপান। প্রতিটি শব্দ প্রতিটি পঙ্ক্তির পেছনে কী বিষণ্ন মৃত্যু, বেদনা, গানের সুর, কী গভীর কম্পিত প্রবালের নির্জন শূন্যতা! এবং ভীষণ আশ্চর্য হতে হয়, অত সহজ সাবলীল ভাষার হৃদয়ে এই গভীরতা ধ্বনিত হওয়া সম্ভব কী এক বিস্ময়কর প্রতিভার কৌমার্যে! প্রথমে রক্তে প্রতিফলিত এবং পড়তে পড়তে বিশ্বাসে পরিণত! সমস্ত মহৎ শিল্পই বুঝি স্বাভাবিক গতিতে বেগবান!
ভীষণ, ভীষণ ভালো লাগে এই বই। উত্তেজিত করে, আলোড়িত করে। অপরাধী, ভীষণ অপরাধী মনে হয় নিজেকে। আহ্ বেদনা, আকণ্ঠ বেদনা! আর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়। আর বলতে গেলে অনুভূতির অপমৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং যেহেতু সত্যতম অনুভূতিগুলো আন্তরিকভাবে ধ্বনিত হয়, যা বেদনা দেয় চরমতম; সেখানে ঈশ্বরের মতো আমি সময়হীন, তাই— অস্তিত্বহীন, ভাল্গার। আমার জঘন্যতা এখানে স্তব্ধ, মৃত্যু ক্লান্ত, সবই অনন্ত একটা সুরের নিঃসঙ্গতা— যার মুক্তি আমার মুক্তিকে বন্ধ্যা, আত্মার মুক্তিকে ধ্বনিত করে। সমস্তটা বই আমাকে ভাসিয়েছে দুলিয়েছে— তাই আমার কথাগুলো দুলছে, আবর্তিত হচ্ছে। তবু, যেহেতু আমার অনুভূতিগুলোর কিছুটা মর্মপীড়া আছে, আমার বক্তব্যের মর্মপীড়াও তাই আত্মসচেতন।
গোল্ডমান্ড আসল ব্যক্তি যাকে ঘিরে সমস্ত ঘটনার প্রকাশ; সে শিল্পী যাকে ঘিরে এক আগ্নেয় ধূসরতা, বন্ধু নার্জিস এবং মা, যে-ভদ্রমহিলার আবির্ভাব ঘটনার ঘটনাস্থলে অনুপস্থিত অথচ যিনি সবকিছু করিয়েছেন, গড়ে তুলেছেন— তিনিই অন্তর্লীন স্রোত— পবিত্রতা, মুক্তি, হতাশার আশ্বাস। বইটা শেষ করে উঠলে শুধু একজনের উপস্থিতিই প্রকট রূপে আহত করে। অথচ তিনি একবারও নেপথ্য থেকে সম্মুখে এসে আবরণ তুলে ফেললেন না— তিনিই গোল্ডমান্ডের মা এবং মায়ের অস্তিত্ব। শিল্পীজীবনের আশা-নিরাশা ক্লেদ সৌন্দর্য সবকিছু ছাপিয়ে উঠেছে সৃষ্টির অনুভব অর্থাৎ মায়ের পবিত্রতা এবং তাই আমাদের আহত করে। পবিত্রতাই বুঝি আমাদের সেই অকরুণ বন্ধু, যে আশা দেয় না বরং নৈরাশ্যকে সম্প্রসারিত ও প্রকটিত করে। জীবনে নিজের আত্মার নৈকট্যে নিজের পথ বেছে নেওয়াই প্রকৃত শিল্পীর পথ।
ভালোবাসা জন্ম, ভালোবাসা মৃত্যু। ভালোবাসা সৃষ্টির পথ। মুক্তির পথ। সমস্ত বইটার শব্দে শব্দে ভালোবাসা ধ্বনিত, সংক্রামিত। তাই আমাদের উত্তেজিত করে, নিঃশ্বাসকে আহত করে। ভালোবাসাকে ভয় করি। তবু ভালোবাসাকে প্রেম। প্রেম স্বর্গ। প্রেম ঈশ্বর। আর ঈশ্বর সেই হেরমান হেস।
কণ্ঠস্বর: প্রথম বর্ষ প্রথম সংখ্যা, ১৯৬৫



