আলজেরিয়া কেন কামুকে নিজের মনে করে না

আলবেয়ার কামু। (৭ নভেম্বর, ১৯১৩- ৪ জানুয়ারি, ১৯৬০)
দুই বছর আগে আলজেরীয় লেখক-সাংবাদিক কামেল দাউদের ‘দ্য ম্যোরসো ইনভেস্টিগেশন’ উপন্যাস পড়ে, কামুর আলজেরীয় জীবন এবং সম্পর্ক নিয়ে আরও জেনেছি। দাউদের একটা সাক্ষাৎকারে জানা গেল, তার মতে, আলজেরিয়ায় কামুকে কেউ মনে রাখেনি, তিনি সেখানে কেউ নন। আরও খুঁজতে খুঁজতে, ২০১৩ সালে কামুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে আমেরিকার ‘স্মিথসোনিয়ান’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত জশুয়া হ্যামারের লেখা একটা প্রতিবেদনে কিছু তথ্য পেলাম, যা পড়ে আমার মন খারাপ হয়েছে, কারণ আমি কামুর সাহিত্য ভালোবাসি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আলজেরিয়ার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বইপত্রে কামুর কথা তেমন উল্লেখযোগ্যভাবে নেই। ২০১০ সালে তার মৃত্যুর ৫০ বছর উপলক্ষে কয়েকটা শহরে সাহিত্যপাঠের উদ্যোগ নেওয়া হলেও কর্তৃপক্ষ সেগুলো বন্ধ করে দেয়।
তবে সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবীদের আলোচনায় তিনি এখনো আছেন। ২০২৪ সালে আলজেরিয়ার কনস্টান্টিন বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখানো হয়েছে, সেখানকার সমকালীন সাহিত্যিকদের লেখায় কামুর প্রভাব এখনো গভীর।
কামুর জন্মভূমির আলো-বাতাস, পাহাড়-সমুদ্র এবং মানুষের জীবন তার সাহিত্যকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল, কিন্তু সেই দেশই তাকে আপন করে নিতে পারেনি। অথচ আমাদের কাছে তিনি বিংশ শতাব্দীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লেখক। ‘দি স্ট্রেইঞ্জার’, ‘দি প্লেইগ’, ‘দি ফল’ কিংবা ‘দি মিথ অব সিসিফাস’ আজও মানুষের জীবন, মৃত্যু, স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার ও অস্তিত্বের অর্থ নিয়ে ভাবায়।
প্রশ্ন হচ্ছে, যিনি দেশকে এত ভালোবাসলেন, সেই দেশ কেন তাকে নিজের বলে গ্রহণ করতে চায় না? এটা বুঝতে হলে আলজেরিয়ার ঔপনিবেশিক ইতিহাস, ফরাসি অত্যাচার, স্বাধীনতার সংগ্রাম এবং সেই সময় কামুর রাজনৈতিক অবস্থান আমাদের জানা প্রয়োজন।
১৯১৩ সালে আলজেরিয়ার মন্দোভি শহরে কামুর জন্মের সময় আলজেরিয়া ছিল ফ্রান্সের উপনিবেশ। তার পরিবার ছিল ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত দরিদ্র বসতি স্থাপনকারীদের একটা। কামুর বাবা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মারা যান। মা ছিলেন প্রায় বধির ও নিরক্ষর। আলজিয়ার্সের বেলকুর এলাকায় বাস করে অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতেন। কামুর স্কুলের শিক্ষক লুই জারমেইর সাহায্যে কামু প্রাথমিকের পর পড়ালেখার সুযোগ পান।
কামুর জীবনের বড় জটিলতা হচ্ছে তার পরিবারের সদস্যরা দরিদ্র ছিলেন, তবে তারা ছিলেন ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত ফরাসি নাগরিক। অন্যদিকে আলজেরিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ আরব ও বারবার জনগোষ্ঠী নিজেদের দেশেই প্রায় সব অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিল। তারা ফ্রান্সের নাগরিক নয়, তবে ফ্রান্সের সব আইন-কানুন তাদের মেনে চলতে হতো। এই গরিব জনগোষ্ঠীর জন্য অনেক লেখালেখি এবং অ্যাক্টিভিজম করেও কামু শেষ পর্যন্ত ইউরোপীয়দের ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেননি।
আলজেরিয়ার প্রতি কামুর ভালোবাসা নিয়ে সন্দেহ কেউই করে না। ভূমধ্যসাগরের নীল পানি, তিপাসার প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ, গ্রীষ্মের সূর্য, সমুদ্রসৈকত, ফুটবল খেলার দিনগুলো তার লেখায় বারবার ফিরে এসেছে। ‘নুপশিয়ালস অ্যাট তিপাসা’ এবং ‘রিটার্ন টু তিপাসা’ প্রবন্ধে আমরা এমন একজন কামুকে পাই, যিনি প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে জীবনের আনন্দ খুঁজেছেন। অথচ এই আলজেরিয়ার সমুদ্রসৈকতেই তিনি তার বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য স্ট্রেইঞ্জার’-এর হত্যাকাণ্ডটা ঘটিয়েছেন। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ম্যোরসো এক আরব যুবককে গুলি করে হত্যা করে।
আলজেরিয়ার পাঠকদের কাছে উপন্যাসটার আরেকটা অর্থ দাঁড়িয়েছে, যা তাদের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। ম্যোরসো যে আরব যুবককে হত্যা করে, তার কোনো নাম নেই। সে শুধু একজন ‘আরব’। অথচ উপন্যাস জুড়ে আছে হত্যাকারী ম্যোরসোর চিন্তা, অনুভূতি, স্মৃতি ও অস্তিত্বের সংকট।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে, কামু কি নিজের অজান্তেই ঔপনিবেশিক সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি সাহিত্যে রোপণ করেছেন?
আলজেরিয়া তাকে পুরোপুরি নিজের মনে করে না, কারণ কামু শুধু একজন সাহিত্যিক নন, তিনি দেশটির ঔপনিবেশিক অতীতেরও এক ক্ষত
সাহিত্য-সমালোচক এডওয়ার্ড সাঈদ তার ‘কালচার অ্যান্ড ইম্পেরিয়ালিজম’ বইয়ে কামুর সাহিত্যকে ঔপনিবেশিক বাস্তবতার আলোকে কামুর কথা লিখেছেন। তার সমালোচনার মূল কথা হচ্ছে, কামুর লেখায় আলজেরিয়ার ভূগোল ও প্রকৃতি অত্যন্ত জীবন্ত হলেও সেখানকার উপনিবেশিত মানুষের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক উপস্থিতি যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি।
এদিক, দাউদ তার ‘দ্য ম্যোরসো ইনভেস্টিগেশন’ উপন্যাসে কামুর নামহীন আরব চরিত্রের একটা নাম দিয়েছেন— মুসা। এই গল্পে মুসা একজন মানুষ, যার পরিবার আছে, অতীত আছে, ভাই আছে। আমার মনে হয়েছে, এই উপন্যাসের মাধ্যমে দাউদ কামুকে প্রশ্ন করেছেন, যে মানুষটিকে আপনি হত্যা করালেন, তার গল্পটা বলবে কে? দাউদের গল্পে আমরা কামুর প্রতি শ্রদ্ধা যেমন পাই, তেমনি ঔপনিবেশিক ইতিহাসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও দেখতে পাই।
কামু ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রচণ্ডভাবে লিখে গেছেন। ১৯৩৯ সালে আলজেরিয়ার ক্যাবাইলিয়া এলাকার ভয়াবহ দারিদ্র্য ও অনাহার নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে ফরাসি প্রশাসনের অবহেলা তুলে ধরেছিলেন। ১৯৪৫ সালে সেতিফে ফরাসি বাহিনীর হত্যাযজ্ঞের পর তিনি সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি অনুসন্ধান করেন এবং নির্যাতন, বৈষম্য ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিরোধিতা করেন।
ওদিকে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নাৎসি দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে ফরাসি প্রতিরোধ আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। কামু বিশ্বাস করতেন, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ মানুষের নৈতিক দায়িত্ব।
তাহলে এ মানুষটাই কেন আলজেরিয়ার স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন করলেন না?
১৯৫৪ সালে আলজেরিয়ার স্বাধীনতাযুদ্ধ শুরু হয়। ফরাসি সরকার তা থামাতে আলজেরিয়ায় হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। অন্যদিকে স্বাধীনতাকামীরা সশস্ত্র সংগ্রাম শুরু করে। কামু এই দুপক্ষের সহিংসতারই বিরোধিতা করেন। তিনি চাইতেন আলজেরিয়ায় ফরাসি বংশোদ্ভূত এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠী শান্তিপূর্ণভাবে একসঙ্গে বসবাস করুক। রাজনৈতিক সংস্কার হোক, বৈষম্য দূর হোক, কিন্তু আলজেরিয়া ফ্রান্স থেকে সম্পূর্ণ স্বাধীন না হোক।
আলজেরিয়ার স্বাধীনতাকামী মানুষ তার এই অবস্থান মেনে নেয়নি। তাদের প্রশ্ন ছিল, দেশ ১০০ বছরের বেশি সময় ধরে বিদেশি শাসনের অধীনে রয়েছে, সেই দেশের মানুষের স্বাধীনতার অধিকার অস্বীকার করে কীভাবে ন্যায়বিচারের কথা কামু বলতে পারেন?
১৯৫৬ সালে কামু আলজিয়ার্সে গিয়ে বেসামরিক মানুষ হত্যা বন্ধের আহ্বান জানান। কিন্তু তার এই শান্তির আহ্বান সফল হয়নি, বরং ফরাসি কট্টরপন্থীরাও তাকে বিশ্বাসঘাতক মনে করা শুরু করে।
১৯৫৭ সালে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর আলজেরিয়ার সহিংসতা নিয়ে তার একটি মন্তব্যে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তিনি বলেছিলেন— ‘আলজিয়ার্সের ট্রামে এখন বোমা পুঁতে রাখা হচ্ছে। আমার মা-ও হয়তো সেই ট্রামগুলোর কোনো একটাতে থাকতে পারেন। এটিই যদি ন্যায়বিচার হয়, তাহলে আমি আমার মাকেই বেছে নেব।’ তিনি আসলে বোঝাতে চেয়েছিলেন, বোমা হামলায় যে কারও মা নিহত হতে পারেন, সেই সহিংসতাকে তিনি ন্যায়বিচার বলে মেনে নিতে পারেন না।
কামুকে যারা পছন্দ করেন, তারা এটিকে এক মানবিক উদ্বেগ হিসেবে দেখেছেন। কিন্তু সমালোচকরা বলেছেন, একজন মায়ের নিরাপত্তার প্রশ্ন কি একটা জাতির স্বাধীনতার অধিকারের চেয়ে বড় হয়ে উঠতে পারে? স্বাধীনতাকামীদের কাছে তার অবস্থান ছিল ঔপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখার প্রচেষ্টা। এরপর, কামু আলজেরিয়ার যুদ্ধ নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। অনেকের কাছে সেই নীরবতাও ছিল অন্যায়ের মুখে অবস্থান নিতে না পারার ব্যর্থতা।
১৯৬০ সালের জানুয়ারিতে ফ্রান্সে এক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। আলজেরিয়ার স্বাধীনতা তিনি দেখেননি। ১৯৬২ সালে দেশটা স্বাধীন হয়।
দীর্ঘ সংগ্রাম ও অনেক প্রাণহানির মধ্যে দিয়ে জন্ম নেওয়া নতুন রাষ্ট্রের জাতীয় পরিচয়ের কেন্দ্রে ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে বিজয়। সেই জাতির সামগ্রিক স্মৃতিতে কামুর জন্য স্থান তৈরি করা কারও পক্ষেই সহজ ছিল না। যারা চেষ্টা করেছেন, তারা মনে করেন কামুর রাজনৈতিক সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেও তার সাহিত্যিক অবদানকে মূল্য দেওয়া সম্ভব। তবে এরপরও কথা থাকে— একজন লেখকের সাহিত্যিক মহত্ত্ব কি তার রাজনৈতিক ভুল থেকে আলাদা করে বিচার করা যায়? একজন মানুষ কি একই সঙ্গে মানবিক, ন্যায়পরায়ণ এবং নিজের সময়ের অন্যায় ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার ঘরে বন্দি থাকতে পারেন?
কামু সহিংসতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, কিন্তু একটা পরাধীন জাতির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে পুরোপুরি মেনে নিতে পারেননি। তিনি আলজেরিয়াকে নিজের দেশ মনে করতেন, কিন্তু আলজেরিয়া তাকে নিজের মনে না করার অনেক কারণ ছিল।
তিপাসার সাগরের কাছে কামুর স্মরণে একটা ছোট্ট স্মৃতিফলক আছে। আবার ২০১৩ সালে সেই ফলক থেকে তার নাম মুছে ফেলার তথ্যও পাওয়া যায়। আলজেরিয়া তাকে পুরোপুরি নিজের মনে করে না, কারণ কামু শুধু একজন সাহিত্যিক নন, তিনি দেশটির ঔপনিবেশিক অতীতেরও এক ক্ষত।
আমি যদি কামুকে বুঝতে চাই, তাহলে তার মানবতাবাদ যেমন দেখব, তেমনি দেখব তার সীমাবদ্ধতাও। আর আলজেরিয়ার কষ্ট বুঝতে হলে আমাদের মনে রাখতে হবে যে, স্বাধীনতা শুধু একটা রাজনৈতিক দাবি নয়, স্বাধীনতা হচ্ছে লক্ষ-কোটি মানুষের কাছে তাদের নিজের অস্তিত্ব, মর্যাদা এবং নিজের ইতিহাস নিজে লেখার অধিকার।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু আলজেরিয়া কেন কামুকে নিজের মনে করে না, তা নয়। একজন মানুষ যে দেশকে নিজের বলে ভালোবাসেন, সেই দেশের মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে পুরোপুরি বুঝতে না পারলে, দেশের জন্য তার ভালোবাসা কি অসম্পূর্ণ থেকে যায়?



