প্রদর্শনী পরিক্রমা
প্রথম দেখার পরে

প্রয়াত দুই চিত্রকর মাহমুদুল হক, কালিদাস কর্মকারসহ অগ্রজ শিল্পী মনিরুল ইসলাম, বীর মুক্তিযোদ্ধা ও চিত্রশিল্পী অধ্যাপক সৈয়দ আবুল বারক আলভী, শিল্পী শহীদ কবির, একুশে পদকজয়ী অধ্যাপক রোকেয়া সুলতানা, চিত্রশিল্পী আনিসুজ্জামান আনিস, শিল্পী আবদুল্লাহ আল বশীর এবং শিল্পী ফারজানা আহমেদ উর্মীর শিল্পকর্ম নিয়ে সাজানো হয়েছে এ প্রদর্শনী
শিল্পের ইতিহাসে কিছু শব্দ কেবল একটি শিল্পধারার নাম হয়ে থাকে না। সময়ের সঙ্গে তারা পরিণত হয় একটি দৃষ্টিভঙ্গির প্রতীকে। ‘ইমপ্রেশন’ তেমনই একটি শব্দ— যার অর্থ একটি নির্দিষ্ট শিল্প-আন্দোলনের সীমানা ছাড়িয়ে হয়ে উঠেছে দেখার এক বিশেষ পদ্ধতির প্রতীক। ১৮৭৪ সালে প্যারিসে একদল তরুণ শিল্পীর প্রদর্শনীতে ক্লদ মোনের ‘ইমপ্রেশন সানরাইজ’ প্রদর্শিত হওয়ার পর ‘ইমপ্রেশন’ শব্দটি শিল্পের ইতিহাসে নতুন অর্থ পেতে শুরু করে। সমালোচক লুই লেরোয়া ছবিটির নাম থেকেই ব্যঙ্গাত্মকভাবে তাদের ‘ইমপ্রেশনিস্ট’ বলে অভিহিত করেছিলেন। কিন্তু যে শব্দটি শুরু হয়েছিল বিদ্রূপ হিসেবে, সেটিই পরবর্তীকালে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্প-আন্দোলনের পরিচয় হয়ে ওঠে। প্রচলিত অ্যাকাডেমিক রীতির বাইরে গিয়ে শিল্পীরা দৃশ্যমান জগৎকে ধরতে চাইলেন তার তাৎক্ষণিক অনুভূতি, আলো, রঙ ও পরিবর্তনশীলতার মধ্য দিয়ে। ‘ইমপ্রেশন’ তখন হয়ে উঠল প্রথম দেখার সেই ক্ষণিক অভিঘাতের প্রতীক। কিন্তু প্রথম দেখার পর কী ঘটে?
আমরা যখন কোনো ছবির সামনে দ্বিতীয়বার দাঁড়াই, তখন কি একই ছবি দেখি? সম্ভবত না। প্রথম দেখার বিস্ময় বা আকর্ষণ কিছুটা সরে গেলে ছবির ভেতরের নির্মাণপ্রক্রিয়াগুলো ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হতে শুরু করে। রঙের নিচে থাকা আরেক রঙ, রেখার পুনরাবৃত্তি, পৃষ্ঠের স্তর, আলো-অন্ধকারের সম্পর্ক কিংবা কোনো অসম্পূর্ণতা তখন নতুন অর্থ তৈরি করে। প্রথম দেখায় আমরা হয়তো দেখি কী, দ্বিতীয় দেখায় প্রশ্ন করি কীভাবে। ‘সেকেন্ড ইমপ্রেশন’ প্রদর্শনীটি যেন এ দ্বিতীয় দেখার জায়গাটিকেই পরিবর্ধন করে।
প্রদর্শনীটির তাৎপর্য আরও স্পষ্ট হয় এখানে উপস্থিত শিল্পীদের প্রজন্মগত অবস্থান বিবেচনা করলে। একদিকে রয়েছেন এমন শিল্পী, যাদের শিল্পযাত্রার সূচনা সত্তরের দশকে। অন্যদিকে রয়েছেন পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পী, যাদের শিল্পচর্চার বিকাশ দুই হাজারের পর। তাদের সময় আলাদা, চারপাশের সামাজিক ও শিল্প-বাস্তবতাও আলাদা। ফলে একই শিল্প-উত্তরাধিকারের ভেতর দিয়ে ভিন্ন সময় কীভাবে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে, প্রদর্শনীটি সেই পরিবর্তনটিকেই দেখার সুযোগ করে দেয়।
জ্যেষ্ঠ প্রজন্মের শিল্পীদের শিল্পচর্চা গড়ে উঠেছিল এমন এক সময়ে, যখন মাধ্যমের শৃঙ্খলা, কারিগরি দক্ষতা এবং নির্মাণের ধৈর্য শিল্পশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। পেইন্টিং, পেস্টেল, ওয়াটারকালার কিংবা ছাপচিত্র—মাধ্যম আলাদা হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রেই উপকরণের নিজস্ব স্বভাবকে বোঝা এবং তার সীমার মধ্যে থেকে একটি দৃশ্যমান ভাষা নির্মাণ ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ফলে তাদের কাজে রঙ, রেখা, পৃষ্ঠ ও কম্পোজিশনের ব্যবহারে এক ধরনের সংযম এবং নির্মাণের সচেতনতা লক্ষ করা যায়।
কিন্তু পরবর্তী প্রজন্ম যখন সেই উত্তরাধিকার গ্রহণ করে, তখন তারা আর একই জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। তাদের সামনে রয়েছে বহুমাধ্যমের বিস্তার, প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং শিল্পের প্রচলিত সীমানা ভেঙে যাওয়ার অভিজ্ঞতা। ফলে একই রঙ, রেখা কিংবা পৃষ্ঠ তাদের কাছে ভিন্নভাবে ফিরে আসে। ওয়াটারকালারের স্বচ্ছতা, পেস্টেলের সরাসরি স্পর্শ, অয়েলের স্তর কিংবা ছাপচিত্রের পুনরুৎপাদন—সবকিছুকেই তারা নিজেদের সময় ও অভিজ্ঞতার সঙ্গে নতুনভাবে সম্পর্কিত করতে পারে। মাধ্যম তখন শুধু কাজ তৈরির উপকরণ থাকে না; নিজেই হয়ে ওঠে ভাবনার অংশ।
তাই দুই প্রজন্মের সম্পর্কটি এখানে অনুকরণের নয়, বরং সংলাপের। পূর্ববর্তী প্রজন্মের শিল্পভাষা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে কোনো স্থির উত্তরাধিকার হয়ে থাকে না; বরং তা নতুন সময়ের প্রশ্নের মুখোমুখি হয়ে বদলে যায়। কোথাও রঙের ব্যবহার হয়ে ওঠে আরও মুক্ত, কোথাও রেখা ভাঙে প্রচলিত অবয়বের সীমা, কোথাও পৃষ্ঠের স্তর তৈরি করে স্মৃতি ও সময়ের অনুভূতি। একই শিল্পভাষা তাই ভিন্ন প্রজন্মে এসে ভিন্ন স্বর তৈরি করতে পারে।
এ পরিবর্তন বিষয় বা মাধ্যমের ব্যবহারে নয়, দেখার মধ্যেও। একটি প্রজন্ম যে বাস্তবতাকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করেছে, পরবর্তী প্রজন্ম হয়তো সেই বাস্তবতাকে স্মৃতি, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা কিংবা সমকালীন দৃশ্যমান সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে পুনর্গঠন করে। প্রথম দেখায় যে অনুভূতি আমাদের স্পর্শ করে, দ্বিতীয় দেখায় আমরা তার নির্মাণ পড়তে শুরু করি। আর সেই নির্মাণের ভেতর দিয়ে ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয় সময়, স্মৃতি, অভিজ্ঞতা এবং ব্যক্তিগত ইতিহাস। এ অর্থে ‘সেকেন্ড ইমপ্রেশন’কে ইমপ্রেশনিজমের সরাসরি উত্তরাধিকার দাবি করার চেয়ে, ধারণাটিকে সময়ের ভেতর দিয়ে পুনর্বিবেচনার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা অধিক তাৎপর্যপূর্ণ। আর সেই ফিরে তাকানোর মধ্যেই হয়তো তৈরি হয় সেকেন্ড ইমপ্রেশন।
বেঙ্গল ফাউন্ডেশনে আয়োজিত ‘সেকেন্ড ইমপ্রেশন’ প্রদর্শনীটি ৩ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে।



