প্রিয় ৫ বই
- ডেভিলস/পসেসড— ফিওদর দস্তয়েভস্কি
- ডাবলিনার্স— জেমস জয়েস
- দ্য লাভ সং অফ জে. আলফ্রেড প্রুফ্রক— টি এস এলিয়ট
- দ্য লেপার্ড— গুইসেপ্পো ডি ল্যাম্পেডুসা
- সুহাসিনীর পমেটম— কমলকুমার মজুমদার

আফসান চৌধুরী
বই পড়ে জীবনটা গেল। শুরু হয় বছর চারেক বয়স থেকে, সারা জীবন পড়েছি— যেভাবে এডিক্টের নেশার বস্তু লাগে সেভাবে।
পশ্চিমা ক্লাসিকস বেশি ভালো লাগে। পাঁচটি বইয়ের তালিকা দিলাম; খুব প্রিয় আরও বই আছে। ভালোর ভালো, সবই কি ভালো? এই পাঁচটি বেশি ভালো নিশ্চয়ই। দস্তয়েভস্কির ‘ডেভিলস/পোসেসড’ ভীষণ প্রিয়। উনিশ শতকের অস্থির রাশিয়ার চিত্র কোথাও এমনভাবে আসেনি। গল্পের মধ্য দিয়ে অসাধারণ সব চরিত্র সৃষ্টি করে লেখক সেসব কথা বলেছেন। উপন্যাসটি ‘দেশপ্রেম’ ভারাক্রান্ত নয়, নিরেট বয়ান। লেখক গোটা রাশিয়ার আত্মার ভেতরে গিয়ে দেখে এসে ভ্রমণ কাহিনি লিখেছেন যেন। রাশিয়ান সাহিত্য ইতিহাসের ছায়ায় বড় হয়েছে। সেটা তলস্তয় হোক, ওয়ার অ্যান্ড পিস অথবা চেকভের চেরি অর্চার্ডের শেষটা ভাবুন, কুড়ালের আঘাতে চেরির বাগান মেলাচ্ছে। একজন বলল, ‘বিদায় পুরান জীবন/দুনিয়া, অন্যজন বলে স্বাগতম নতুন দুনিয়া’। সবই ক্রান্তিকাল, ইতিহাস। জেমস জয়েস তো ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠ ঔপন্যাসিক অনেকে বলেন। কিন্তু আমার কাছে তার শ্রেষ্ঠ কাজ ছোট গল্পের সংগ্রহ ‘ডাবলিনারস’। তার বেড়ে ওঠার, আত্মার শহরের চিত্রকে আমি উপন্যাস হিসেবে দেখি। বিচ্ছিন্ন, খণ্ডিত চিত্রগুলো উপন্যাসের চ্যাপ্টার যেন ছোট গল্পের আকারে। এটি জয়েসের প্রিয়তম বই। সবাই বিশেষ করে বোদ্ধাজন ‘ইউলিসিস’ নিয়ে বলেন, লেখেন; কিন্তু আমার কাছে বোরিং লাগে, আরোপিত মনে হয় যেন অমরত্বের সন্ধানে লেখা। পেয়েছেন যোগ্য সম্মান; কিন্তু ডাবলিনারস টিকবে মানুষের মনে। ‘লাভ সং অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রক’ পড়েনি তেমন ইংরেজি সাহিত্যের বান্দা কমই আছে। এটা নিয়ে বেশি কিছু বলব না। কারণ, তর্কাতীতভাবে আধুনিককালের ইংরেজি ভাষার শ্রেষ্ঠ কবিতা, কাঠামো, ভাবনা আর কাব্য চৈতন্যের দিক থেকে। যারা পড়েননি, কিন্তু গুণী পাঠক শুধু পাঠ করতে অনুরোধ করব। অনেকে ‘ওয়েস্ট ল্যান্ডের’ কথা বলবেন, কিন্তু এটিও আরোপিত একটু। ইলিয়ট তার ইতিহাসভিত্তিক পশ্চিমা দুনিয়ার পতনের সংবাদ দিচ্ছেন কাব্যের চেয়ে যেন। দুটিই মহান কবিতা, তবে প্রুফ্রক অধিক কাব্যিক লাগে। ‘দ্য লেপার্ড’ উপন্যাস ক্ষয়িষ্ণু সামন্তবাদী ইতালীয় ইতিহাসের ওপর নির্মিত। অনেকেরই অচেনা লাগবে জানি। একদিন কবি বেলাল চৌধুরী ভাই আমাকে বইটা দিয়ে বললেন, ‘তোমার ভালো লাগবে’। আমি পরে স্তম্ভিত হয়েছিলাম এর দক্ষতায়, ট্র্যাজিক ইতিহাসের বিবরণে। আমার শিক্ষা হলো, কখন যে কোন মাস্টারপিস হাতে আসবে কে জানে! বেশিরভাগ মানুষ বইটা হয়তো পড়েননি, কিন্তু পশ্চিমা সাহিত্যের বোদ্ধা দুনিয়ায় এটা প্রায় পূজনীয় কাজ। চাইলে চ্যাটজিপিটি দিয়ে চেক করে নিতে পারেন। সঙ্গে একটা সংবাদ দিই। লেখক লাম্পেদুসার এই বইটি প্রকাশকরা ফেরত দেন। বেঁচে থাকতে লেখক বইটা দেখে যেতে পারেননি। মৃত্যুর পর সবাই মাস্টারপিস মাস্টারপিস করে হল্লা করে। শেষ বইটা ‘সুহাসিনীর পমেটম’। বাংলা গদ্যের যে একঘেয়েমি, প্রেডিক্টেবিলিটি, সুশীল ভদ্রতা আক্রান্ত চেহারা, সেটিকে কমল কুমার মজুমদার যেমন আঘাত করেছেন, তেমন অন্যরা কমই করেছেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার বাংলা গদ্য পড়ি আজও। এই উপন্যাসের শেষ দৃশ্য যেখানে খাঁচার পাখিটা মুক্ত হয়ে আকাশে উড়ছে, আর লেখার চরিত্ররা নদীতে, তার চিত্রকল্প কেবল সাহিত্য নয়, চিত্রশিল্পও বটে। ইহা বড় সুন্দর ইহা বড় সুন্দর— এই হলো তো, প্রিয় বইয়ের কথা হলো।




