বাইশে শ্রাবণ আগে-পরে

শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আঁকা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর; সৌজন্যে শিল্পী পরিবার
কবিগুরুর মহাপ্রয়াণের ৮৫ বছর পূর্ণ হলো। ঠিক পঁচাশি বছর আগে ১৩৪৮ সনের ২২ শ্রাবণ, বৃহস্পতিবার রাখী পূর্ণিমার দিন দুপুর ১২টা ১০ মিনিটে এ পৃথিবীর বুকে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার তিরোধানের খবরে সেদিন আসমুদ্রহিমাচল বিস্তৃত বাঙালির হৃদয় জুড়ে মহাশোকের ছায়া নেমে এসেছিল। শ্রাবণধারার মতন বাংলার প্রকৃতিও যেন অশ্রুপাত করেছিল। ম্রিয়মাণ স্তব্ধতা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল শান্তিনিকেতনের সবুজ বৃক্ষরাজি। এর আগে ২৫ জুলাই ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দ, কবিকে শান্তিনিকেতন থেকে শেষবারের মতো তাদের জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে নিয়ে আসা হয়েছিল। ৮০ বছর আগে তিনি যে বাড়িতে প্রথম চোখ মেলে এ পৃথিবীর আলো দেখেছিলেন সেখানে। তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের রেলওয়ের একটা বিশেষ সেলুনকোচে করে তাকে কলকাতায় আনা হয়েছিল। বোলপুর থেকে সকাল ৮টায় ছেড়ে আসা ট্রেনটি অপরাহ্ণে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছেছিল। সেদিন সকাল থেকে শান্তিনিকেতনের আশ্রমের বাতাসে কান্নার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। কবি স্ট্রেচারে শুয়েই তার ঋষিজ চোখে তাকিয়ে ছিলেন। প্রায় ৭০ বছরের স্মৃতিজাগানিয়া শান্তিনিকেতনের চারদিকটা দেখছিলেন। রাস্তার দুপাশে সারিবদ্ধ দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষও জোড়হাত করে প্রণাম জানাচ্ছিল। তখন কবির চোখ অশ্রুসজল ছিল। প্রায় সাত ঘণ্টার রেলপথে কবি সুস্থই ছিলেন। ট্রেনে স্বজনদের সঙ্গে খোশ আলাপ করেছেন। ২৬ জুলাই সারা দিন কবির শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ভালো ছিল। অনেকের সঙ্গে স্মৃতিচারণ করেছেন, মুখে মুখে দুয়েক লাইন কবিতা রচনা করেছেন। তার লেখা ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা’ কবিতাটি শুনতে চেয়েছেন। বলেছিলেন, ‘এ কবিতাগুলো তোমরা মুখস্থ করে রাখবে।’ এ কথা সত্য যে, কবিগুরু ১৯৩৭ সালে তার বয়স ৭৬ বছর হলে তখনই মোটামুটি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তখন তিনি ইরিসিপ্লাস নামক রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন। বলা চলে, এর পর থেকে তার শরীর কখনো রোগহীন ছিলই না। প্রোস্টেটসহ আরও কিছু শারীরিক সমস্যা ছিল। তবে কবির শরীরে অপারেশন নিয়ে ভারতের বিখ্যাত দুজন চিকিৎসকের মধ্যে খানিক মতবিরোধ হয়েছিল। তারা হলেন ডা. নীলরতন সরকার আর ডা. বিধানচন্দ্র রায়। ডা. নীলরতন অপারেশনের পক্ষে ছিলেন না, কিন্তু বিধান রায়ের যুক্তিতে রবীন্দ্রনাথের সুকুমার শরীরে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত হয়েছিল। ডা. নীলরতন শারীরিক অবস্থা দেখে বলেছিলেন, ‘ওষুধ দিয়েই কবির চিকিৎসা চলুক।’ উল্লেখ্য, অপারেশনের বিষয়ে কবিগুরুর নিজেরও প্রবল অনিচ্ছা ছিল। বলেছিলেন, ‘শনি যদি একটা কিছু ছিদ্র খোঁজে, সে যদি আমার মধ্যে রন্ধ্র পেয়েই থাকে তাকে স্বীকার করে নাও। মানুষকে তো একদিন মরতেই হবে। যাবার আগে আমাকে নিয়ে টানাছেঁড়া কেন?’
দুই
৩০ জুলাই। অপারেশনের অল্প আগে কবিগুরু জীবনের শেষ কবিতা মুখে মুখে বললেন, ‘তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি/বিচিত্রছলনা জালে/হে ছলনাময়ী’। তিনি অসুস্থ পুত্রবধূ প্রতিমা দেবীকে একটা চিঠিও মুখে বলে লিখিয়েছিলেন। এতে কষ্ট করে নিচে স্বাক্ষর করেছিলেন, ‘বাবামশাই’ বলে। প্রোস্টেট গ্ল্যান্ডের অপারেশনের সময় ব্যথাটা কেমন হবে তাও জিজ্ঞেস করেছেন। সেদিন কবির অপারেশনে সময় লেগেছিল মাত্র ২৫ মিনিট। ৩১ জুলাই থেকে কবির শরীরে জ্বালা-যন্ত্রণা শুরু হয়। ১ আগস্ট কথাবার্তা প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। কেমন যেন আচ্ছন্ন ভাব। ডাক্তাররাও বেশ চিন্তিত হয়ে পড়েন। তবে কবির চেতন ছিল, কষ্ট হচ্ছে তা বোঝাতে পেরেছেন। ৩ আগস্ট শান্তিনিকেতন থেকে পুত্রবধূ এসে সেবা করতে শুরু করলেন। কানের কাছে কথা বললেন, তিনি সাধ্যমতো উত্তর দিয়েছেন। ৫ আগস্ট মঙ্গলবার। কবির হিক্কা বন্ধ হচ্ছে না, ডাকলেও সাড়াশব্দ কমে গেছে। ডা. নীলরতন সরকার, বিধান রায়সহ সবাই এলেন। তাদের কপালে দুশ্চিন্তার ভাঁজ। দুদিন আগে থেকেই স্যালাইন চলেছিল। ৬ আগস্ট বুধবার। কবি মূলত অক্সিজেনের ওপর বেঁচে আছেন। বাইরে আত্মীয়স্বজন, কাছে-দূরের শুভাকাঙ্ক্ষীরা ভিড় জমাচ্ছেন। কবির অবস্থা মহাআশঙ্কাজনক, বাতাসে দুঃসংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে। জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির ঘরে-বাইরে লোকারণ্য। ৭ আগস্ট দুপুরে মহাপ্রয়াণের খবর বেতারে ঘোষণা হলে সারা কলকাতা শহর যেন ভেঙে পড়েছিল ঠাকুরবাড়ির সড়কের ওপর। কবির হৃৎস্পন্দন একেবারে শূন্য হয়ে এলে তার নাক থেকে অক্সিজেনের নলটা খুলে দেওয়া হলো। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনন্তলোকে পাড়ি জমালেন। তখন বাইরের বারান্দা থেকে কেউ একজন গেয়ে চলেছেন— কে যায় অমৃতধামযাত্রী...। বাঁধভাঙা গণজোয়ার আর অভূতপূর্ব জনসমুদ্রের ভেতরে স্কুল-কলেজ থেকে ছাত্রছাত্রীদের মিছিল, শোকাঞ্জলি প্রকাশ করতে আসে, তারা কবিকে একনজর দেখতে ব্যাকুল হয়ে ওঠে। জনতা উদ্বেল, অস্থির, পুলিশ বাহিনী এদের সংযত করার চেষ্টা করে। অবস্থাটা দাঁড়ায়, কে কাকে ঠেকাবে এমন। সবকিছু নিয়ন্ত্রণের অধীনে থাকেনি। সেদিন কয়েক ঘণ্টা ধরে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত শ্রদ্ধা নিবেদন চলেছিল। কবির অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক চলে, শান্তিনিকেতন না কলকাতার নিমতলা শ্মশানঘাটে হবে। কবির পুত্র রথীন্দ্রনাথের সিদ্ধান্তে শেষ পর্যন্ত নিমতলায় স্থির হয়। সেদিন পড়ন্ত বিকালে বিশাল এক শোকযাত্রা শুরু হলো। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনের সামনে থেকে বের হওয়া এ শোকযাত্রায় শোকাহত লাখো জনতার ঢল নেমেছিল। তখন বেতার কেন্দ্র থেকে অনেকের মধ্যে কবি নজরুল ইসলামের কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছিল স্বরচিত কবিতা, ‘ঘুমাইতে দাও শ্রান্ত রবিরে’...।
তিন
কবিগুরুর মহাপ্রয়াণে তাৎক্ষণিক শ্রদ্ধাঞ্জলি ও শোকবার্তায় অসংখ্য দেশবরেণ্য মানুষ নিজেদের নিজ িনজ অনুভূতির কথা তুলে ধরেছেন। তৎকালীন ভারতবর্ষের প্রায় সব রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবী, ব্রিটিশ গভর্নর জেনারেল, শিল্প-সংস্কৃতির পুরোধা ব্যক্তিত্বসহ বিদেশি কবি, লেখক, রাষ্ট্রনায়ক তাদের শোকাঞ্জলি প্রেরণ করেন। মহাত্মা গান্ধী, পণ্ডিত নেহরু, জিন্নাহ, শরৎ বসু, এ কে ফজলুল হক, সরোজিনী নাইডু, ড. জাকির হোসেন, সর্বেপল্লী রাধাকৃষ্ণন, বিজয়লক্ষ্মী পণ্ডিত, সোফিয়া ওয়াদিয়া, ড. রাজেন্দ্রপ্রসাদ, উদয়শঙ্কর, কিরণশঙ্কর রায়, জিডি বিড়লা, সিকান্দার হায়াৎ খাঁ এমন আরও অনেকে। বিদেশ থেকে শোকবার্তা পাঠান ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, চিয়াং কাইশেক, উইলিয়াম রোদেনস্টাইন, জাপান থেকে রাসবিহারী বসু, মিৎসু তোয়ামা প্রমুখ।
- মহাত্মা গান্ধী তার শোকবার্তায় জানালেন, ‘কেবল বর্তমান যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ কবিকে হারাইনি, মানবসেবায় উৎসর্গীকৃতপ্রাণ এক নৈষ্ঠিক জাতীয়তাবাদীকে হারিয়েছি’।
- দেরাদুনের জেল থেকে পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু লিখেছেন, ‘গুরুদেবের অভ্রভেদী ব্যক্তিত্ব ও প্রতিভার আশ্রয়ে আমরা যারা মানুষ হয়েছি, তারা আজ অসহায় ও দিশেহারা’।
- মুহাম্মদ আলি জিন্নাহ বলেন, ‘বাল্যকাল থেকে তাকে জানার সুযোগ পেয়েছি। শেষ সাক্ষাৎ ১৯২৯ সালে লন্ডনে। তার আন্তরিকতাপূর্ণ আলোচনায় প্রাণে সাহস ও উৎসাহের সঞ্চার হতো’।
- রাধাকৃষ্ণন বললেন, ‘আধুনিক ভারতের নবজাগরণের শ্রেষ্ঠ প্রতীক রবীন্দ্রনাথ। বাল্মীকি, কালিদাসের যথার্থ উত্তরাধিকারী ছিলেন তিনি’।
- চিয়াং কাইশেক বলেছেন, ‘বিশ্ব আর প্রবীণ ঋষির মহান এবং জ্ঞানগর্ভ কণ্ঠস্বর শুনতে পাবে না, আমাদের প্রতিবেশী দেশের আকাশের দিকে তাকালে মনটা বিষাদে ভরে যায়’।
- সরোজিনী নাইডুর মন্তব্য ছিল, ‘প্রতিভা, সৌন্দর্যবোধ, জ্ঞান, তীক্ষ্ণ ধীশক্তি এবং মহান ব্যক্তিত্বের মাধুর্য সমন্বয়ে তিনি কল্পলোকের অধিবাসী হিসেবে গণ্য হয়েছিলেন, মৃত্যুর পর তিনি স্বপ্নলোকের নায়ক রূপে চিত্রিত হবেন’।
কবিগুরুর মৃত্যুতে লন্ডন টাইমস, নিউ ইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ানসহ বিদেশি অসংখ্য পত্রপত্রিকায় বিশেষ ও সচিত্র সংবাদ প্রকাশিত হয়েছিল। তবে কলকাতার ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’ অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিল। সঙ্গে যুগান্তর, দৈনিক বসুমতী, ভারত, প্রবাসী ইত্যাদিতেও বিপুল আয়োজনে সংবাদ প্রকাশ করেছিল। শ্রদ্ধা জানিয়েছেন সে সময়কার প্রায় সব কবি, লেখক ও সাহিত্যিক। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন ও শান্তিনিকেতনসহ কবির শ্রাদ্ধানুষ্ঠান হয়েছিল একাধিক স্থানে। ১৯৪১ সালের ১৭ আগস্টকে ‘জাতীয় শ্রদ্ধাঞ্জলি দিবস’ হিসেবে উদযাপন করা হয়।




