প্রদর্শনী পরিক্রমা
চেনা রেখার অচেনা যাত্রা

বেঙ্গল শিল্পালয়ে চলমান ‘বিয়ন্ড দ্য ব্রিফ’ প্রদর্শনীর দরজা ঠেলে ঢুকতেই কানে এলো— ‘এ আবার কেমন আর্ট! ধুর, সময় নষ্ট।’ মন্তব্যটি শুনে থমকে দাঁড়ালাম। মনে হলো, সমকালীন শিল্প এমন এক ভাষা, যা সবার কাছে একইভাবে ধরা দেয় না। কেউ শিল্পকর্মের ভেতরে লুকিয়ে থাকা ভাবনা ও প্রতীক খুঁজে পান, আবার কেউ তাকে দুর্বোধ্য বলে পাশ কাটিয়ে যান।
বৃত্ত আর্টস ট্রাস্ট ও বেঙ্গল আর্টস প্রোগ্রামের যৌথতায় অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনী সেই প্রশ্নগুলোকেই আরও গভীর করে তোলে। দীর্ঘদিন ধরে ক্লায়েন্ট, ব্র্যান্ড ও বাণিজ্যিক যোগাযোগের জন্য কাজ করা ১০ জন গ্রাফিক ডিজাইনার এখানে হাজির হয়েছেন তাদের স্বাধীন শিল্পীসত্তা নিয়ে। ফলে এটি কেবল শিল্পকর্মের প্রদর্শনী নয়; বরং ফলিত শিল্প ও চারুকলার মধ্যকার প্রচলিত বিভাজনকে নতুন করে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রয়াস।
প্রদর্শনীতে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে একটি বিশাল অংশগ্রহণমূলক ইনস্টলেশন। সবুজ ভূমির ওপর ছোট ছোট ইটের ব্লক দিয়ে দর্শনার্থীরাই গড়ে তুলছেন একটি শহর। কেউ রাস্তা বানাচ্ছেন, কেউ বাড়ি, কেউ সেতু। এখানে শিল্পী একক স্রষ্টা নন; দর্শকও হয়ে উঠেছেন সৃষ্টির অংশীদার। শিল্পকে শুধু দেখার নয়, নির্মাণের অভিজ্ঞতায় রূপ দেওয়ার এই প্রয়াস প্রদর্শনীর অন্যতম আকর্ষণ। নগরায়ণ, মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের ধারণা এখানে শিল্পের ভাষায় নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আরেকটি কাজ মিনিমাল উপস্থাপনার মধ্যেও তীব্র সামাজিক ভাষ্য নির্মাণ করে। সাদা রঙের বিশাল ওষুধের ক্যাপসুল, চালের দানা এবং বস্তার আদলে নির্মিত ভাস্কর্যগুলোর গায়ে লেখা— ‘Your Wealth in My Grip’, ‘Cut the Price Rice’, ‘Date of Expire: Unlimited’। পরিচিত ভোগ্যপণ্যকে শিল্পের উপাদানে রূপান্তর করে শিল্পী স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা, মূল্যস্ফীতি এবং বাজার ব্যবস্থার অদৃশ্য ক্ষমতা-কাঠামোর দিকে ইঙ্গিত করেছেন। আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও অতিরিক্ত অলংকরণ ছাড়াই কীভাবে একটি শিল্পকর্ম শক্তিশালী রাজনৈতিক ও সামাজিক বক্তব্য বহন করতে পারে, এটি তার উজ্জ্বল উদাহরণ।
এরপর দেয়ালে সারিবদ্ধ তিনটি কাঁথা শিল্পী মিতা মেহেদীর হাতে হয়ে উঠেছে তিনটি ক্যানভাস। ‘কলাবাগান’, ‘ভূতের গলি’ ও ‘কাঁটাবন’— এই তিনটি এলাকার নাম রূপ নিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্যভাষায়। কাপড়ের ওপর সূচিকর্ম, অ্যাপলিক ও বাংলা টাইপোগ্রাফির সংমিশ্রণে নির্মিত এই কাজ ঢাকার স্থান নামের ইতিহাসকে নতুনভাবে পাঠ করার সুযোগ করে দেয়। এখানে শব্দ শুধু পাঠযোগ্য নয়; তা দৃশ্যমানও। গ্রাফিক ডিজাইনের ভাষা কীভাবে লোকজ কারুশিল্প ও টেক্সটাইল শিল্পের সঙ্গে মিশে নতুন নন্দন ভাষা তৈরি করতে পারে, এই কাজ তার চমৎকার উদাহরণ।
নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মোড়ক ব্যবহার করে নির্মিত আরেকটি কাজও দর্শকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। চায়ের প্যাকেট, সাবানের মোড়ক ও নানা ভোগ্যপণ্যের রঙিন প্যাকেজিং একত্র হয়ে সৃষ্টি করেছে প্রাণীর অবয়ব। প্রথম দর্শনে এটি রঙিন ও দৃষ্টিনন্দন মনে হলেও একটু থামলেই স্পষ্ট হয় এর অন্তর্নিহিত বক্তব্য। প্রতিদিনের ব্যবহার শেষে ফেলে দেওয়া বস্তুই এখানে পরিবেশদূষণ, অতিভোগ এবং পুনর্ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। শিল্পী দেখিয়েছেন, শিল্পের ভাষা নির্মাণে উপকরণের চেয়ে দৃষ্টিভঙ্গিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
শুধু ক্যানভাস বা ইনস্টলেশনই নয়, অ্যানিমেশন শর্টফিল্মের মাধ্যমেও শিল্পীরা তাদের ভাবনা প্রকাশ করেছেন। স্থির শিল্পকর্মের সঙ্গে চলমান চিত্রভাষার এই সংলাপ প্রদর্শনীতে ভিন্ন এক ছন্দ যোগ করেছে। ফলে দর্শক একই পরিসরে স্থির ও গতিশীল— দুই ধরনের শিল্প-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সমকালীন শিল্পচর্চার বহুমাত্রিকতা উপলব্ধি করার সুযোগ পান।
পুরো প্রদর্শনী ঘুরে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে— শিল্প কোনো একক মাধ্যমের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। পেইন্টিং, টাইপোগ্রাফি, টেক্সটাইল, ইনস্টলেশন, ভাস্কর্য, পুনর্ব্যবহৃত উপকরণ কিংবা অ্যানিমেশন— সবকিছুই এখানে সমান গুরুত্ব নিয়ে উপস্থিত। গ্রাফিক ডিজাইনারদের পেশাগত অভিজ্ঞতা তাদের শিল্পভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে, কিন্তু সেই দক্ষতা কখনোই শিল্পকর্মের ভাবনাকে ছাপিয়ে যায়নি। ‘বিয়ন্ড দ্য ব্রিফ’ তাই কেবল একটি প্রদর্শনী নয়; এটি সৃজনশীল স্বাধীনতার এক দৃঢ় উচ্চারণ। প্রদর্শনীটি মনে করিয়ে দেয়, পেশা শিল্পীর পরিচয়ের একটি অংশ হতে পারে, কিন্তু তার সৃজনশীলতার সীমা নয়। ব্রিফের বাইরে এসে এই শিল্পীরা নতুন পরিচয় নির্মাণ করেননি; বরং দীর্ঘদিন ধরে পেশাগত বাস্তবতার আড়ালে থাকা তাদের ব্যক্তিগত শিল্পীসত্তাকেই উন্মোচন করেছেন। সেই কারণেই ‘বিয়ন্ড দ্য ব্রিফ’ শুধু একটি প্রদর্শনী নয়; সমকালীন বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল সংস্কৃতিতে গ্রাফিক ডিজাইনারদের শিল্পচর্চাকে নতুনভাবে মূল্যায়নেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
শিল্পী মাহবুবুর রহমানের কিউরেশনে প্রদর্শনীতে অংশ নিয়েছেন ইমরান হোসেন পিপলু, মনির মৃত্তিক, আলী সাগর, শেখর শাশ্বত, পীযূষ তালুকদার পিন্টু, মাহবুবুর রহমান, সানদ কুমার বিশ্বাস, মিতা মেহেদী, মেহেদী হাসান ও শিমুল দত্ত। প্রদর্শনীটি বেঙ্গল শিল্পালয়ের কামরুল হাসান প্রদর্শনী কক্ষ (লেভেল-১) এবং লেভেল-৩-এ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গ্যালারিটি ৮ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত প্রতিদিন বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।



