সমাধির রাজনীতি মতাদর্শের বিভাজন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
স্বাধীন বাংলাদেশের শুরুর দিকে মারা যান কবি ফররুখ আহমদ। তিনি তার কবিতায় উচ্চারণ করেছিলেন সমাজের অবহেলিত মানুষের বেদনা। তার সেই অমর পঙ্ক্তি ‘রাত পোহাবার কত দেরী পাঞ্জেরী?’— সময়ের সব অন্ধকারের বিরুদ্ধে যেন এক অনন্ত প্রশ্নচিহ্ন। অথচ জীবনের অন্তিম সময়ে এই কবিকেও কাটাতে হয়েছিল অবহেলা ও দারিদ্র্যের মধ্যে। তার এমন করুণ পরিণতি দেখে আহমদ ছফা লিখেছিলেন, ‘আজকের সমগ্র বাংলা সাহিত্যে ফররুখ আহমদের মতো একজনও শক্তিশালী স্রষ্টা নেই। এমন একজন স্রষ্টাকে অনাহারে রেখে তিলে তিলে মরতে বাধ্য করেছি আমরা। ভবিষ্যৎ বংশধর আমাদের ক্ষমা করবে না।’ মৃত্যুর পরও ফররুখ আহমদের ভাগ্যে জোটেনি নির্বিঘ্ন বিদায়। কোথায় তাঁকে দাফন করা হবে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছিল জটিলতা। সরকারিভাবে কোনো জায়গা না পাওয়ায় কবি বেনজীর আহমদ নিজের শাহজাহানপুরের পারিবারিক কবরস্থানে তার দাফনের ব্যবস্থা করেন।
স্বাধীন বাংলাদেশে ফররুখ আহমদকে এই বঞ্চনা সইতে হয়েছিল কেবল মতাদর্শিক ভিন্নতার কারণে— এমন অভিযোগ তুলে ১৯৭৩ সালে গণকণ্ঠ পত্রিকায় ‘কবি ফররুখ আহমদের কী অপরাধ’ শিরোনামে লিখেছিলেন আহমদ ছফা। ইতিহাসের পরিহাস, প্রায় তিন দশক পর একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয় তাকেও। ২০০১ সালের ২৮ জুলাই ছফার মৃত্যু হলে তাকে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়নি। আহমদ ছফার ভ্রাতুষ্পুত্র নূরুল আনোয়ার আগামীর সময়কে বলেন, ‘আহমদ ছফা মারা যাওয়ার পর তাকে সাধারণ কবরে দাফন করা হয়েছিল। তৎকালীন সরকারের অনীহার কারণে আহমদ ছফা একজন মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও তাকে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে দাফনের অনুমতি দেওয়া হয়নি।’
নূরুল আনোয়ার জানান, সাধারণ কবরটি ৯৯ বছরের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময় শেষে সেটি আর থাকবে না। তাই পরিবারের পক্ষ থেকে কবরটি বুদ্ধিজীবী অংশে স্থানান্তর করে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের আবেদন করা হয়। তার ভাষ্য, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্থানান্তরের প্রক্রিয়া শুরু হয়। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সেটি অনুমোদন পায়। দুই মাস আগে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) এক সভায় সিদ্ধান্ত হলেও জেলা প্রশাসনের অনুমতির কারণে বিষয়টি আটকে ছিল। সম্প্রতি অনাপত্তিপত্র মেলায় এখন দ্রুতই কবর স্থানান্তর হবে বলে তিনি আশা করছেন।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খানও বলেছেন, ‘জেলা প্রশাসনের ছাড়পত্র বাকি ছিল। সেটি এখন হয়েছে। লেখকের পরিবার চাইলে যেকোনো দিন কবর স্থানান্তর হতে পারে।’
প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘আহমদ ছফা কি বুদ্ধিজীবী নন? তবে তাকে বুদ্ধিজীবীদের কবরস্থানে সমাহিত করা হয়নি কেন? এটি ছিল অবিচার। একটি অবিচারের অবসান হচ্ছে।’
আহমদ ছফার কবর স্থানান্তরের উদ্যোগকে অনেকে দীর্ঘদিনের একটি অবিচারের সংশোধন হিসেবে দেখছেন। কিন্তু সেই খবরের মধ্যেই আবার সামনে এসেছে আরও কিছু পুরনো প্রশ্ন। বেগম রোকেয়ার কবর কেন এখনো দেশের বাইরে, ভারতের এক প্রান্তিক এলাকায়? মুর্তজা বশীরের মতো একজন খ্যাতিমান শিল্পীর জন্যও কেন স্থায়ী কবর নিশ্চিত করা গেল না? আবার কাজী নজরুল ইসলামের কবরের পাশে ওসমান হাদির সমাহিত হওয়াকেও কেউ কেউ দেখছেন রাজনৈতিক বিতর্কের চোখে।
কলকাতার উপকণ্ঠ সোদপুর-পানিহাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বেগম রোকেয়া। প্রায় দেড় দশক আগে তার মরদেহ পায়রাবন্দে এনে সমাহিত করার দাবি উঠেছিল। ২০০৯ সালের ৯ ডিসেম্বর রোকেয়া মেলায় রংপুরের তৎকালীন জেলা প্রশাসক বিএম এনামুল হক এ দাবির প্রতি একাত্মতা জানিয়ে উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। ২০১০ সালেও জেলা প্রশাসন জানায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। কিন্তু সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি।
চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর মারা যান ২০২০ সালের ১৫ আগস্ট। তাকে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয়। পরে তার পরিবার কবরটি স্থায়ী করার জন্য ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে আবেদন করে। কিন্তু সে উদ্যোগ আর এগোয়নি। মুর্তজা বশীরের মেয়ে মুনীরা বশীর আগামীর সময়কে বলেন, ‘বনানী কবরস্থানে বাবা শুয়ে আছেন। ওই কবরে তো অন্য কাউকে কবর দেওয়া হবে, যেহেতু এটি স্থায়ী নয়। কিন্তু আমরা চাই বাবার কবরটি যেন স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা হয়। সে জন্য বনানী কবর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলাম। তারা জানিয়েছিল, স্থায়ীভাবে এটি সংরক্ষণ করতে চাইলে কবরটি কিনতে হবে। এর জন্য অনেক টাকা লাগবে। আমরা সিটি করপোরেশনে যোগাযোগ করেছিলাম যেন কবরটি স্থায়ীভাবে রাখা যায়। তারা আমাদের মৌখিক আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু এটি করা সম্ভব হয়নি। মুর্তজা বশীর তো দেশের সম্পদ। তার কবর দেখতে নতুন প্রজন্ম আসবে। তাকে নিয়ে গবেষণা হবে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তো তার কবর সংরক্ষণ করা।’
প্রশ্ন কেবল আহমদ ছফা, বেগম রোকেয়া কিংবা মুর্তজা বশীরকে ঘিরে নয়; প্রশ্ন হলো— রাষ্ট্র তার সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকারকে কীভাবে স্মরণ ও সংরক্ষণ করতে চায়। ব্যক্তি বা সরকারের পরিবর্তনের সঙ্গে যদি শেষ আশ্রয়ের মর্যাদাও বদলে যায়, তবে তা কেবল কয়েকটি কবরের গল্প নয়; রাষ্ট্রীয় স্মৃতি, সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা এবং ইতিহাসচর্চার ধারাবাহিকতা নিয়েও গভীর প্রশ্ন রেখে যায়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখা মুর্তজা বশীর ছিলেন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সন্তান, দেশের অন্যতম প্রথিতযশা শিল্পী ও চিন্তক। তার মতো একজন মানুষের কবরও যখন স্থায়ী সংরক্ষণের নিশ্চয়তা পায় না, তখন প্রশ্ন জাগে— রাষ্ট্র কি তার উজ্জ্বল সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে যথাযথ মর্যাদায় ধারণ করতে প্রস্তুত? নাকি জীবনের মতো মৃত্যুর পরও স্মৃতি ও স্বীকৃতির ওপর ছায়া ফেলে রাখে মতাদর্শের বিভাজন?




