ফুটবলের সাহিত্য সাহিত্যের ফুটবল

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
শুরুতে ঈশ্বর স্কুলে যেতেন এবং ক্লাস শুরুর আগপর্যন্ত বন্ধুদের সঙ্গে ফুটবল খেলতেন। যদিও তিনি অনেক কিছু জানতেন; তবুও তিনি সবসময় জানতে চাইতেন ও নতুন কিছু চেষ্টা করতেন। একদিন ঈশ্বর বললেন, আজ আমি অনেক কাজ করেছি, এখন খেলার সময়। ঈশ্বর ও তার বন্ধুরা এরপর ফুটবল খেলতে শুরু করলেন এবং একপর্যায়ে এত জোরে বলে লাথি মারলেন যে, তা পাশের এক বাগানের ঝোপে গিয়ে পড়ল এবং ফেটে গেল। সেই ফেটে যাওয়া থেকেই মহাবিশ্ব এবং আমাদের চারপাশের সবকিছুর উৎপত্তি।
মেক্সিকোর এই আধুনিক ক্রিয়েশনড মিথটা আর সব রূপকথার গল্পের মতো অবিশ্বাস্য হলেও ফুটবল নিয়ে গোটা দুনিয়ার পাগলামিটা ‘অতীব বিশ্বাস’। একটি বল নিয়ে বাইশজনের নিরন্তর ছুটে চলার সঙ্গে বিভিন্ন উত্তেজনায় যুক্ত হয়ে গোটা মাঠ। আর যদি বিশ্বকাপের সময় আসে, গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের জ্বরে আক্রান্ত হয় গোটা দুনিয়া।
কিন্তু যে ফুটবল নিয়ে গোটা দুনিয়া মেতে থাকে, সেই ফুটবল নিয়ে সাহিত্য এত কম কেন? বিশেষত ফুটবল নিয়ে গোটা দুনিয়াতেই খুব কম উপন্যাস পাওয়া যায়। এর কারণটা অবশ্য সহজ। ফুটবল খেলাটা এতটাই উত্তেজনা বয়ে আনে, এর সঙ্গে নানারকমের আবেগ এতটাই ঠাসবুনটে যুক্ত থাকে যে লেখকের পক্ষে তা ভেদ করে কল্পনার বুনন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। তবে উপন্যাস না হলেও গল্পের জন্য ফুটবল এক আদর্শ চারণভূমি। ফুটবল ঘিরে থাকা আবেগ, নানা আঙ্গিকের অনুভূতি এক হৃদয় দোলানো নাগরদোলায় চাপিয়ে দেয়। গল্পকারদের জন্য ফুটবল হয়ে ওঠে স্বর্গীয় ঝরনাধারা, যার সুধায় তিনি পাঠককে মোহমুগ্ধ করেন।
এই কাজটা দুনিয়ায় সবচেয়ে ভালো করতে পারেন এদুয়ার্দো গালিয়ানো। উরুগুয়ের এই রোমান্টিক বিপ্লবী লিখেছিলেন ফুটবল সাহিত্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বই। সকার আন্ডার শ্যাডো অ্যান্ড সান শুধু ফুটবলের গাথা নয়, এ এক কাব্যময় নন্দনের অভিযাত্রা। গালিয়ানো ফুটবলকে দেখেন বঞ্চিত, নিপীড়িত, অবহেলিত মানুষের স্বপ্নের সিঁড়ি হিসেবে, ভাষাহীনের ভাষা আর সব হারানোদের একমাত্র অবলম্বন হিসেবে।
অবশ্য গালিয়ানোর বিপরীত ছিলেন আর্জেন্টাইন হোর্হে লুইস বোর্হেস। তিনি ফুটবলকে অত্যন্ত নিচু চোখে দেখতেন। তার সাহিত্যে ফুটবলকে দেখানো হতো একপাল বোকা ও নিয়ন্ত্রিত মানুষের পাগলামি হিসেবে। তবে তার স্বদেশি রিকার্দো পিগ্লিয়া ফুটবলকে দুর্দান্ত রূপক হিসেবে ব্যবহার করেন। আর্জেন্টিনার সামরিক একনায়কতন্ত্র ও ১৯৭৮ বিশ্বকাপের মধ্যে সংযোগ তার গদ্যে বিদ্যুতের মতো চমকায়।
আর গালিয়ানোর মতোই আরেক সাংবাদিক ও রোমান্টিক ছিলেন ব্রাজিলের নেলসন রদ্রিগেস। তার সাহিত্যে ফুটবল ধরা দিত মিথের মতো। ব্রাজিলের মারাকানার হেরে যাওয়াকে তিনি তুলনা দিয়েছিলেন হিরোশিমার পারমাণবিক বোমার আঘাতের মতো। লাতিনদের তীব্র আবেগ আর রোমান্টিকতা ফুটবল ও ফুটবল সাহিত্যকে অন্য মাত্রা দেয়।
ইউরোপে ফুটবল-সাহিত্য ভিন্ন চরিত্রের। এখানে ফুটবল অনেক সময় শ্রেণি-সংঘাত, জাতীয়তাবাদ ও ব্যক্তিগত অনুসন্ধানের প্রতীক হয়ে ওঠে। নিক হর্নবির ফিভার পিচ আধুনিক ফুটবল-স্মৃতিকথার এক অসামান্য নিদর্শন। বইটির মূলত আত্মজীবনী যেখানে হর্নবি দেখিয়েছেন কীভাবে ফুটবল একজন পুরুষের আবেগ, পরিচয়, পিতা-পুত্র সম্পর্ক, একাকিত্ব ও সামষ্টিক পরিচয়ের ভিত্তি হয়ে ওঠে। ফিভার পিচ তাই শুধু স্মৃতিকথা হয়ে থাকে না, হয়ে ওঠে সামাজিক দলিল। ইংল্যান্ডের শ্রমিকশ্রেণি সংস্কৃতি থেকে ফুটবলে ধীরে ধীরে মধ্যবিত্ত-উচ্চবিত্তের বিনোদনে পরিণত হওয়ার একটি সাক্ষ্য।
আলজেরিয়ায় জন্মানো ফরাসি দার্শনিক আলবেয়ার কামু ফুটবল নিয়ে তেমন কিছু না লিখলেও তিনি বলতেন যে, ফুটবল মাঠে গোলকিপার হিসেবে খেলার কারণেই তিনি দুনিয়াটা খুব ভালো দেখতে ও বুঝতে পারতেন।
আরেক নোবেল বিজয়ী জার্মান সাহিত্যিক পিটার হ্যান্ডকে লিখেছিলেন, দ্য গোলিস এংসাইটি অব দ্য পেনাল্টি কিক। হান্ডকে ফুটবলকে ব্যবহার করেছেন অস্তিত্ববাদ ও বিচ্ছিন্নতার রূপক হিসেবে। অন্যদিকে ইতালীয় কবি পিয়েরে পাওলো পাসোলিনি ফুটবলকে মনে করতেন কবিতা।
আর স্পেনীয় কবি রাফায়েল আলবের্তি ফুটবলকে নিয়ে সরাসরি কবিতা লিখেছেন। তার ওডা আ প্লাতকো হাঙ্গেরিয়ান গোলকিপার প্লাতকোর বীরোচিত খেলার প্রতি একটি কবিতা-অঞ্জলি। এটি স্পেনীয় সাহিত্যে প্রথম গুরুত্বপূর্ণ ফুটবল-কবিতা।
আফ্রিকান সাহিত্যে ফুটবল এসেছে উপনিবেশবাদ-পরবর্তী পরিচয় সংকটের সঙ্গে মিলিয়ে। নাইজেরিয়ান লেখক চিনুয়া আচেবে প্রত্যক্ষভাবে ফুটবল নিয়ে না লিখলেও তার উপন্যাসের চরিত্রদের জীবনে ফুটবল একটি সাংস্কৃতিক উপস্থিতি।
সেনেগালের লেখকরা দেখিয়েছেন কীভাবে ফুটবল একটি ঔপনিবেশিক অনুশাসন থেকে জাতীয় গর্বের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। কেনেথ হারমান ও অন্য আফ্রিকান সাহিত্যিকরা দেখিয়েছেন কীভাবে ইউরোপীয় ক্লাবে আফ্রিকান ফুটবলারদের যাওয়া আসলে একটি নতুন ধরনের পরিযানের গল্প, অভিবাসনের গল্প।
বাংলা সাহিত্যে যদি ফুটবলের কথা বলতে হয়, প্রথমেই চলে আসবে মতি নন্দীর কথা। তিনি ক্রীড়া সাহিত্যকে বাংলা ভাষায় মর্যাদাপূর্ণ আসনে বসতে মূল ভূমিকা রেখেছেন। স্ট্রাইকার ও স্টপার ফুটবলবিষয়ক তার সেরা দুটি গল্প। মতি নন্দী দেখিয়েছেন কীভাবে একজন ফুটবলারের জীবন আসলে একটি সামাজিক জীবনচিত্র, দারিদ্র্য, স্বপ্ন, শ্রেণিসংঘাত, ক্লান্তি ও জয়ের মিশেলে তৈরি।
তবে রবীন্দ্রনাথ ছাড়া বাংলা সাহিত্যের কোনো আলোচনাই পূর্ণ হয় না। বাংলা সাহিত্যের রবি ফুটবলের দুনিয়াতেও পা রেখেছিলেন। ১৯৩০ সালের প্রকাশিত ‘সহজ পাঠ’-এর প্রথমভাগের ‘ষষ্ঠপাঠ’-এ তিনি লেখেন— ঐ যে আসে শচী সেন, মনি সেন, বংশী সেন। আর ঐ যে আসে মধু শেঠ আর ক্ষেতু শেঠ। ফুটবল খেলা হবে খুব।’ এই সেনদের মধ্যে মনি সেন ছিলেন মোহনবাগান ক্লাবের প্রথম অধিনায়ক। কবিগুরু মোহনবাগানের সমর্থক ছিলেন।
অন্যদিকে কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের পাঁড় সমর্থক। নিয়মিত মাঠে খেলা দেখতে যাওয়া কবি মোহামেডানের ১৯৩৪ সালে লিগ জয়ের পর লিখেছিলেন— ‘এই ভারতের অবনত শিরে তোমরা পরালে তাজ, সুযোগ পাইলে শক্তিতে মোরা অজেয়, দেখালে আজ! এ কি অভিনব কীর্তি রাখিলে নিরাশাবাদীর দেশে, আঁধার গগনে আশার ঈদের চাঁদ উঠিল যে হেসে!’ নজরুল রচিত ‘শেষ সওগাত’ কাব্যগ্রন্থের কবিতা ‘জোর জমিয়াছে খেলা’ তার এক অনবদ্য সৃষ্টি।
বাংলাদেশে আলাদা করে সেই অর্থে ক্রীড়া সাহিত্য তেমন একটা হয়নি। সাম্প্রতিক লেখকদের মধ্যে ফুটবল নিয়ে সুপাঠ্য উপন্যাস লিখেছেন সুহান রিজওয়ান-পদতলে চমকায় মাটি। তবে বাংলা ভাষায় ক্রীড়া সাংবাদিকরা কাব্যময় বিবরণের পাঠকদের সাহিত্যসুধা পানের সুযোগ করে দেন।




