প্রধানমন্ত্রী
এরা শুধু বিশ্বাসঘাতকই না, এরা জুলুমবাজও

চট্টগ্রামে বিএনপির সাংগঠনিক সভায় বক্তব্য রাখছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ছবি: সংগৃহীত
ইসলামী ব্যাংকের ১০ হাজার কর্মীকে যারা চাকরিচ্যুত করেছে তাদের জুলুমবাজ বলে আখ্যায়িত করলেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
আজ রবিবার রাতে চট্টগ্রাম নগরীর হোটেল রেডিসন ব্লু বে ভিউ অডিটোরিয়ামে নগর উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখছিলেন প্রধানমন্ত্রী।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পরিবর্তনের পর বিপুল সংখ্যক কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়। চাকরি হারানো অধিকাংশই চট্টগ্রামের বাসিন্দা। তারা এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমে অভিযোগ করেছিলেন, জামায়াতে ইসলামীর রোষানলের শিকার হয়ে তারা চাকরি হারিয়েছেন।
এবার হাজারো ব্যাংক কর্মীর সাথে হওয়া অন্যায় নিয়ে কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও। কারও নাম উল্লেখ না করে তিনি বললেন, ‘দশ হাজারের মতো মানুষকে তারা বের করে দিল। তার মানে কত বড় জুলুমবাজ তারা দেখেন। জুলুমবাজ না হলে নিরীহ এতগুলো মানুষকে তারা চাকরিচ্যুত করে? আরে ভাই, ১০ হাজার মানুষকে চাকরিচ্যুত করতে একবার বিবেকেও তো লাগে। ঠিক আছে তুমি তোমার দলের লোক নাও। বুঝলাম। তাই বলে নিরপরাধ নির্দলীয় ১০ হাজার মানুষকে তুমি চাকরিচ্যুত করবে?’
‘কত নারী আছে। তাদের ছোট ছোট বাচ্চা আছে। তাদের কী অবস্থা একবার চিন্তা করে দেখেন। কাজেই এরা শুধু মিথ্যা কথাই বলে না। এরা শুধু বিশ্বাসঘাতকই না। এরা একইসাথে জুলুমবাজও। এই জুলুমবাজদের বিরুদ্ধে আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।’
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলীয় নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতন-নিপীড়নের তথ্য তুলে ধরে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বললেন প্রধানমন্ত্রী। ‘বেগম খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে গ্রামের শেষ কর্মীটা পর্যন্ত অত্যাচার-নির্যাতনের ভেতর দিয়ে গেছে। স্বৈরাচার মানুষকে কথা বলতে দেয়নি। বিপক্ষে কথা বললেই মামলা দিয়েছে। রাতের বেলায় সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তুলে নিয়ে গেছে। আমাদের সালাহউদ্দিন সাহেবকে (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) কী করেছিল আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে। এখানে এমন একজনও কি আছেন যার নামে একটা মিথ্যা মামলা হয়নি।’
‘শুধু বিএনপি কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক দল নয়। সমাজের অনেক জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি, সম্মানীয় ব্যক্তি, যারাই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, যারাই তাদের দুর্নীতি-লুটপাটের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, আমরা দেখেছি কীভাবে তাদের নিগৃহীত হতে হয়েছে।’
‘এখন অনেকে অনেক চটকদার কথা বলছে’— এমন মন্তব্য করে তারেক রহমান বললেন, ‘অনেকে অনেক কথা বলে। আমি কিছু বলি না। একটা কথা আমি খুব দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি। আমাদের নেতাকর্মীরা যদি ১৭ বছর ধরে আন্দোলন ধরে না রাখত, তাহলে পৃথিবীর মানুষ জানতে পারতো না যে এই দেশ কত বড় ফ্যাসিবাদের কবলে পড়েছে। বিএনপির নেতাকর্মীরা গুম-খুন-হত্যার শিকার হয়েছিল বলেই পৃথিবী জানতে পেরেছিল যে এই দেশ কত বড় ফ্যাসিবাদের কবলে পড়েছে।’
‘আমরা জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলন করেছি। অন্যান্য রাজনৈতিক দলও ছিল। আন্দোলনের এক পর্যায়ে সফল হয়েছি। জনগণের আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানের রূপ নিয়েছে। ফ্যাসিবাদ এই দেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছে।’
ফ্যাসিবাদ চলে যাওয়ার পরও চক্রান্ত থেমে নেই বলে নেতাকর্মীদের সতর্ক করলেন প্রধানমন্ত্রী। বললেন, ‘লন্ডন থেকেই আপনাদের বলেছিলাম চক্রান্ত শেষ হয়ে যায়নি। তখন হয়তো আপনারা আমার কথা বিশ্বাস করেননি। এই চট্টগ্রামের মাটিতে দাঁড়িয়ে ৮৬ সালে ফ্যাসিবাদ কি বলেছিল? বলেছিল — যে নির্বাচনে যাবে, সে হবে জাতীয় বেইমান। কিন্তু মিটিং শেষ হতে না হতেই পরদিন কিন্তু খেলে দিল। আরেক স্বৈরাচারের অধীনে নির্বাচনে চলে গেল।’
সেদিন তাদের সঙ্গে কারা নির্বাচনে যোগ দিয়েছিল, জানতে চান প্রধানমন্ত্রী। নেতাকর্মীরা সমস্বরে জবাব দেন, জামায়াত-সিপিবি। এ সময় ‘গুপ্ত, গুপ্ত’ স্লোগান ওঠে।
তারেক রহমান বললেন, ‘সেদিন গণতন্ত্রের বুকে ছুরি মেরে ওই স্বৈরাচার-ফ্যাসিবাদের সাথে গুপ্ত বাহিনী চলে গিয়েছিল নির্বাচনে। শুধু ৮৬ সালেই না। ৯৬ সালেও মুখে মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে একসাথে আন্দোলন করেছিল। মনে আছে? এখন যেমন এই গুপ্ত বাহিনী সংসদের ভিতরে একরকম কথা বলে। বাইরে এসে আবার আরেক রকম কথা বলে। ৯৬ সালেও তেমন ফ্যাসিবাদের সাথে এক হয়ে গিয়েছিল। আবার যখন এক-এগারো হলো, দেখেন তাদের ভূমিকা একই। অর্থাৎ বার বার তারা গণতন্ত্রের বুকে ছুরি মারে।’
‘আমাদের সতর্ক হতে হবে। নির্বাচনের সময় আমরা দেখেছি কীভাবে তারা মিথ্যা কথা দিয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করতে চেয়েছে। মানুষকে ধোঁকা দিয়েছে। বিশেষ করে নারীদের কীসের যেন একটা টিকিট দিয়ে ধোঁকা দিয়েছিল। বাংলাদেশের মানুষ কিন্তু ভুল করেনি সেদিন। মানুষ দেখেছে যে তারা ৮৬ সালে ভুল করেছে। ৯৬ সালে ভুল করেছে। এক-এগারোর সময় ভুল করেছে।’
বিরোধী দলের প্রতি ইঙ্গিত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা ১৭ বছর রাজপথে ছিলাম। তাদের দেখেছিলেন রাজপথে? দেখেননি। তার মানে তখন কিন্তু বিভিন্নভাবে এরা তলে তলে ঠিকই ওদের সাথে খাতির রাখত। ফ্যাসিবাদের সাথে সম্পর্ক রাখত। এটা চরম সত্য। এসব ভুলে গেলে চলবে না।’
নেতাকর্মীরা সবাই বিএনপি নামের এক পরিবারের সদস্য উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বললেন, ‘আমরা সবাই বিএনপি পরিবারের সন্তান। যদি জনগণের মাঝে আস্থা ধরে রাখতে হয়, তাহলে আমাদের প্রত্যেককে বিএনপি বলেন, যুবদল বলেন, ছাত্রদল বলেন, স্বেচ্ছাসেবক দল বলেন, মহিলা দল বলেন, আইনজীবী ফোরাম বলেন, কৃষক দল বলেন, যেই দলই বলেন না কেন, শ্রমিক দল, তাঁতী দল, প্রত্যেক নেতাকর্মীকে সতর্ক হতে হবে। সঠিকভাবে আমাদের কাজ করতে হবে।’
‘গণতান্ত্রিক চর্চা দলের ভেতরে করতে হবে। কাউন্সিলের কাজগুলো করে ফেলতে হবে। সামনে সিটি কর্পোরেশন হোক, পৌরসভা নির্বাচন হোক অর্থাৎ লোকাল নির্বাচন বলতে যা আমরা বুঝি, এই নির্বাচনগুলো কিন্তু আমাদের ফেস করতে হবে। সেজন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু করেন কীভাবে আপনারা আগামী লোকাল ইলেকশনগুলো ফেস করবেন।’
এ সভায় সভাপতিত্ব করেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক ও সংসদ সদস্য এরশাদ উল্লাহ। এতে আরও বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির দুই সদস্য অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।






