প্রদর্শনী পরিক্রমা
চেনা শরীর, অচেনা সত্তা

দেখা মানেই সবসময় চিনে ফেলা নয়
একটি অবয়বকে সামনে থেকে দেখা আর তাকে চারপাশ থেকে দেখা— এ দুই অভিজ্ঞতার মধ্যে যে দূরত্ব, তাতেই যেন লুকিয়ে আছে ড্রয়িং ও ভাস্কর্যের মৌলিক পার্থক্য। কাগজের সমতলে একটি রেখা যতটুকু জায়গা নেয়, ত্রিমাত্রিক কোনো অবয়ব তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু দাবি করে— আলো, ছায়া, শূন্যস্থান, দৃষ্টির পরিবর্তন এবং চারপাশে ঘুরে দেখার সময়। একদিকে রেখা কোনো শরীরের আভাস তৈরি করে, অন্যদিকে সেই আভাসই যখন ইস্পাতের খণ্ডে জোড়া লাগে, বাঁক নেয় এবং শূন্যতার মধ্যে নিজের জায়গা করে নেয়, তখন তা হয়ে ওঠে একটি পূর্ণাঙ্গ স্থানিক উপস্থিতি।
তৌফিকুর রহমানের কাজের ক্ষেত্রে এ দুই মাধ্যমের দূরত্ব খুব বেশি নয়। তার ড্রয়িংয়ের রেখা যেমন একটি অবয়বকে খুঁজে বেড়ায়, তার ভাস্কর্যও তেমনি ইস্পাতের কঠিন শরীরের ভেতর দিয়ে কোনো অদৃশ্য রূপকে দৃশ্যমান করে তুলতে চায়। সাধারণ চোখ কোনো অবয়বকে দেখেই তার পরিচয় নির্ধারণ করে নিতে চায়— মানুষের মুখ, প্রাণীর শরীর, হাত কিংবা পা। কিন্তু শিল্পীর দৃষ্টি সেই চেনা পরিচিতির জায়গায় এসে থেমে থাকে না; বরং পরিচিত শরীরের ভেতরেই সে খুঁজতে থাকে এমন কিছু, যা এখনো নাম পায়নি। তৌফিকুর রহমানের শিল্পচর্চার কেন্দ্রে থাকা মানুষ ও প্রাণীর অবয়ব তাই শুধু দৃশ্যমান শরীর নয়, চেনা রূপের ভেতর অচেনাকে আবিষ্কারেরও এক নিরন্তর প্রয়াস। তার ড্রয়িংয়ে এ অনুসন্ধান সবচেয়ে আগে ধরা পড়ে রেখার সাবলীল ব্যবহারে। কোনো কোনো রেখা মানুষের মুখ কিংবা শরীরের সীমারেখা তৈরি করে, আবার কোথাও সেই রেখাই ভেঙে গিয়ে যুক্ত হয় প্রাণীর কোনো বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে। চোখ, মুখ কিংবা শরীরের বিচ্ছিন্ন অংশ একে অন্যের সঙ্গে মিশে তৈরি করে সংকর অবয়ব। ফলে রূপটি পরিচিত হয়েও পুরোপুরি স্পষ্ট থাকে না। একটি মুখকে ‘মানুষ’ বলে শনাক্ত করার মুহূর্তেই তার ভেতর অন্য কোনো প্রাণীর উপস্থিতি এসে সেই নিশ্চিতকরণকে নড়বড়ে করে দেয়।
এ অসম্পূর্ণতাই তার রেখার অন্যতম শক্তি। তিনি কোনো অবয়বকে সবসময় তার পূর্ণাঙ্গ চেহারায় উপস্থাপন করেন না। কোথাও একটি চোখ, কোথাও মুখের আভাস, কোথাওবা শরীরের একটি বিচ্ছিন্ন অংশ— বাকিটা যেন দর্শকের কল্পনার ওপর ছেড়ে দেওয়া। ফলে রেখা এখানে শুধু আকৃতি নির্মাণের উপায় নয়, বরং চিন্তার গতিপথ। আঁকার সময় রেখা যেন নিজেই নিজের পথ তৈরি করে নেয়; একটি দৃশ্যমান রূপ থেকে আরেকটি সম্ভাব্য রূপের দিকে এগিয়ে যায়। এ চলাচলের মধ্যেই তৈরি হয় একধরনের অনিশ্চয়তা আর সেই অনিশ্চয়তা দর্শককে আরও গভীরভাবে দেখতে বাধ্য করে। ভাস্কর্যে এসে এ অনুসন্ধান পায় ভিন্ন প্রকৃতির শরীর। তৌফিকুর রহমানের প্রধান উপকরণ ওয়েল্ডেড স্টিল, কঠিন, ভারী এবং আধুনিক শিল্প-প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত একটি উপাদান। কিন্তু তার হাতে ইস্পাত শুধু শক্তির প্রতীক হয়ে থাকে না। কাটিং, বাঁকানো ও ওয়েল্ডিংয়ের মধ্য দিয়ে তা ধারণ করে জীবন্ত অবয়বের অনুভূতি। ধাতুর জোড়, খসখসে পৃষ্ঠ, অসমতলতা এবং নির্মাণপ্রক্রিয়ার দৃশ্যমান চিহ্নগুলো আড়াল করার কোনো চেষ্টা তার মধ্যে নেই; বরং এগুলোই ভাস্কর্যের নিজস্ব ভাষার অংশ হয়ে ওঠে। কঠিন ধাতুর ভেতর দিয়ে কোমল কিংবা জীবন্ত কোনো সত্তার আভাস তৈরি করার এ বৈপরীত্য তার কাজকে এক স্বতন্ত্র মাত্রা দেয়।
প্রদর্শনীতে দেখা একটি প্রাণী-অবয়বের ভাস্কর্যে এ বৈশিষ্ট্যটি বিশেষভাবে লক্ষ করা যায়। চারপেয়ে প্রাণীর পরিচিত কাঠামো সেখানে উপস্থিত থাকলেও মাথা, স্তন ও মুখের গঠনে তৈরি হয়েছে অস্বাভাবিক এক বিন্যাস। ফলে প্রথম দেখায় দেহটি পরিচিত কোনো প্রাণীর কথা মনে করালেও কিছুক্ষণ তাকালে তার পরিচয় আর ততটা নিশ্চিত থাকে না। মুখের গড়ন ও অভিব্যক্তি তাকে নিছক প্রাণীর অনুকরণে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং সেখানে মানুষের সঙ্গে প্রাণীর বৈশিষ্ট্য মিলেমিশে অন্য এক সত্তার ইঙ্গিত তৈরি করে। অন্য একটি মুখাবয়বধর্মী ভাস্কর্যে মানুষের মুখের উপস্থিতি স্পষ্ট হলেও ধাতুর খণ্ড, জোড় এবং অসম্পূর্ণ পৃষ্ঠ সেই পরিচিত মুখকে বদলে দেয়। পরিচিত শরীর তখন হয়ে ওঠে অপরিচিত এক অস্তিত্বের সম্ভাবনা। এখানেই ড্রয়িং ও ভাস্কর্যের মধ্যে তার কাজের অন্তর্গত সম্পর্কটি আরও স্পষ্ট হয়। ড্রয়িংয়ে যে অনুসন্ধান একটি রেখার গতিতে শুরু হয়, ভাস্কর্যে তা ইস্পাতের শরীর পেয়ে স্থানিক হয়ে ওঠে। একটিতে রূপ তৈরি হয় সমতলের ওপর, অন্যটিতে রূপের চারপাশে তৈরি হয় শূন্যতা। কিন্তু উভয়ের ভেতরেই কাজ করে একই প্রবণতা— দৃশ্যমানের মধ্য থেকে অদৃশ্যকে খুঁজে বের করা।
তৌফিকুরের কাজ দর্শককে কোনো নির্দিষ্ট উত্তর দিয়ে থামিয়ে দেয় না। তার অবয়বগুলোকে একটি মাত্র পরিচয় বা অর্থের মধ্যে আটকে রাখার সুযোগ নেই। অসম্পূর্ণতা, সংকরতা এবং অনির্দিষ্টতার মধ্য দিয়ে তিনি দর্শকের জন্য একটি খোলা পরিসর তৈরি করেন; যেখানে প্রত্যেকে নিজের দেখা, অভিজ্ঞতা ও কল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে রূপটির অর্থ নির্মাণ করতে পারেন। এ কারণেই তার শিল্পে মানুষ ও প্রাণী শুধু বিষয়বস্তু নয়, তারা হয়ে ওঠে পরিচয়, অস্তিত্ব এবং আমাদের দেখার অভ্যাসকে নতুন করে ভাবার উপলক্ষ। তার শিল্প আমাদের শেখায়— দেখা মানেই সবসময় চিনে ফেলা নয়। কখনো কখনো আরও গভীরভাবে দেখার অর্থ হলো পরিচিতির নিশ্চয়তা থেকে সরে এসে সেই রূপের ভেতর লুকিয়ে থাকা অজানার সামনে দাঁড়ানো।
তৌফিকুর রহমানের ‘রেখা গড়ন স্থিতি’ (Line from Balance) শীর্ষক প্রদর্শনীটি ২৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত লালমাটিয়ার কলাকেন্দ্রে চলবে। কিউরেটর হিসেবে আছেন ওয়াকিলুর রহমান। প্রদর্শনী বিকাল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত উন্মুক্ত।



