কালের আঙিনায় আধুনিক ‘সামসুল ওয়ারেস স্যার’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বাংলাদেশের স্থাপত্যচর্চায় মডার্নিস্ট ধারার গুরুস্থানীয় স্থপতি সামসুল ওয়ারেস। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান অরো এডিশনস (ORO Editions) থেকে এই প্রথম তার পেশাচর্চার প্রেক্ষাপট, দর্শন, বৈচিত্র্য ও বিস্তৃতিকে ধারণ করে প্রকাশিত হয়েছে মনোগ্রাহী আকৃতির একটি মনোগ্রাফ— SHAMSUL WARES An Architecture of Elemental Modernism।
এটি মানতেই হবে, বাংলাদেশে অসাধারণ মানের ভবনের সংখ্যা দিন দিন বেড়ে চলেছে, যেটার প্রমাণ— প্রায় প্রতি বছরই এ দেশের স্থপতিদের তৈরি স্থাপত্যকর্ম আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচিত ও পুরস্কৃত হওয়ার মধ্যে আছে। শিক্ষিত সমাজে স্থাপত্যশিল্প নিয়ে আগ্রহ ও সচেতনতা বেড়েছে। ফলে স্থাপত্য পড়াশোনার সুযোগ তৈরি করেছে অন্তত ২৮টি বিশ্ববিদ্যালয়। মাত্র তিন দশক আগেও যেখানে স্থাপত্য শিক্ষালয় ছিল মাত্র দুটি। কিন্তু সে অনুপাতে স্থাপত্যকলা নিয়ে লেখালেখির চর্চা কম। বাংলাদেশে গড়ে ওঠা স্থাপত্যভাষার বিশ্লেষণমূলক টেক্সটসমৃদ্ধ বইয়ের সংখ্যা যথেষ্ট নয়। তাই বিশ্ব স্থাপত্যধারায় বাংলাদেশে উৎপাদিত জ্ঞান সংরক্ষণের অপ্রতুল চর্চার বাস্তবতায় এ বইটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী কাজ হিসেবে আমাদের হাতে এসেছে।
স্থপতি হিসেবে সামসুল ওয়ারেসের পেশাজীবন আর স্বাধীন বাংলাদেশের বয়স প্রায় একই। এ অঞ্চলের পথিকৃৎ স্থপতি স্থাপত্যাচার্য মাজহারুল ইসলামের কাছে দীক্ষিত সমসাময়িকদের পাশাপাশি তার নিজস্ব স্থাপত্যযাত্রা শুরু করেছেন, একাধারে স্থাপত্য পরামর্শক ও শিক্ষক দুটি ভূমিকাতে। সহজেই অনুমান করা যায়, শুরুর সেই সময়ে এ দেশে দালানকোঠা ও জনপরিসর তৈরির ক্ষেত্রে স্বতন্ত্র ডিসিপ্লিন হিসেবে স্থাপত্যকলার চর্চা, জনমানসে স্থাপত্যপেশার পরিচিতি ও ক্রমবিকাশে কতটা গুরুত্বপূর্ণ বুনিয়াদি ভূমিকা রেখেছেন তিনি। পেশাচর্চার পাশাপাশি ছয় দশক জুড়ে স্থাপত্যশিক্ষায় নিয়োজিত একজন সত্যিকারের আইকনিক শিক্ষক হিসেবে তিনি সমাদৃত। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যাত্রা শুরু করে দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের স্থাপত্য স্কুলগুলোতে তিনি আজ পর্যন্ত মেন্টরের ভূমিকা পালন করে যাচ্ছেন। স্বাধীন বাংলাদেশের আপামর স্থপতিকুল ‘ওয়ারেস স্যার’ নামক এক বৌদ্ধিক উত্তরাধিকারের প্রাণরসে সমৃদ্ধ হয়েছেন— এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়।
বইটি হাতে নিলে, গুণ বিচারের বিশ্লেষণে যাওয়ার আগেই সম্পাদক আদনান জিল্লুর মুর্শেদের নেতৃত্বে নিয়োজিত কর্মী দলকে যে বিপুল অনুসন্ধান, যাচাই-বাছাই ও অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে জরিপ, ড্রয়িং প্রস্তুত ও মডেল বা অনুকৃতি তৈরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়েছে, সেটি স্পষ্ট হয়। একজন প্রচারবিমুখ ও আত্মনিমগ্ন সৃষ্টিশীল ব্যক্তির সারা জীবনের কাজের দালিলিক সংগ্রহ দুই মলাটের ভেতরে দায়িত্বশীল ও নান্দনিকভাবে উপস্থাপন সহজ কাজ নয়। ছবি ও নকশাসহ ৩৫টি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য প্রকল্পের পরিচিতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এই মনোগ্রাফে, যেগুলোর মধ্যে এমন সব ভবনের নকশা রয়েছে, যা কখনো নির্মিত হয়নি; আবার বেশ কিছু ভবন পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ভেঙে ফেলা হয়েছে। প্রজেক্ট ক্যাটালগ অংশে আরও ১৭৮টি প্রকল্পের ন্যূনতম তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করে ভবিষ্যতে অনুসন্ধান সম্পূর্ণ করা সম্ভব হবে। আরও রয়েছে স্বয়ং সামসুল ওয়ারেসের সঙ্গে সম্পাদকের সাক্ষাৎকার এবং বিভিন্ন সময়ে তার ছাত্র ও পরে সহপেশাজীবী স্থপতিদের সাক্ষাৎকার, যেখানে উঠে এসেছে পরবর্তী প্রজন্মের স্থাপত্যচর্চা ও শিক্ষকতায় ওয়ারেস স্যারের অমোচনীয় প্রভাবের ব্যক্তিগত অনুধাবন।
সারা বিশ্বে স্থপতিদের মনোগ্রাফ সচরাচর যেমন হয়ে থাকে, এ প্রকাশনাটি তেমন একটি স্থাপত্যকর্ম পরিচিতিমূলক সংকলন শুধু নয়। আমার মতে, অন্তত দুটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে এটি একটি অনন্য প্রকাশনা। প্রথমটি হলো, স্থাপত্য পাঠ এখানে প্রেক্ষাপটেরও পাঠ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। সামসুল ওয়ারেসের ডিজাইন করা প্রকল্পগুলোর বিশদ পরিচিতি অংশের আগে একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধে স্থপতি ও শিক্ষক হিসেবে তার পেশাজীবনের বৈশিষ্ট্য ও ক্রমবিকাশের গল্পটি সমসাময়িক বাংলাদেশের রাজনৈতিক, সামাজিক পরিস্থিতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য ঘটনাগুলোর প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছেন অধ্যাপক আদনান জিল্লুর মোর্শেদ। এরপর পরিচিতি অংশে প্রকল্পগুলোকে দশক অনুযায়ী ক্রমানুসারে সাজানো হয়েছে ওই দশকগুলোতে বিশ্ব-রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও বিশ্ব-স্থাপত্যের প্রধান প্রবণতাগুলোর পরিচিতিসহ।
দ্বিতীয় অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, বহুস্বরের উপস্থিতি নিশ্চিতের পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। এখানে স্থাপত্য প্রকল্পগুলোর পরিচিতি লিখেছেন বিভিন্ন প্রজন্মের স্থপতি পেশাজীবী, শিক্ষক ও গবেষক। শুধু তা-ই নয়, স্থাপত্যবিষয়ক লেখালেখিতে তরুণ লেখকদের উৎসাহিত ও দক্ষ করে তুলতে একটি আন্তঃশাস্ত্রীয় কর্মশালা আয়োজন করে স্থাপত্য ডিসিপ্লিনের বাইরের তরুণ লেখকের লেখা অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এ ধরনের কর্মশালার ফলে একটি দ্বিমুখী আদান-প্রদান সম্ভব হয়েছে, যার সুফল হলো শাস্ত্রকেন্দ্রিক ডিসকোর্সের বাইরে স্থাপত্যকলা-সমঝদারির বিস্তার; অন্যদিকে, অর্থপূর্ণ ও যথার্থ স্থাপত্য সৃষ্টিতে প্রয়োজনীয় user-end-perspective বা জনদৃষ্টিকোণভিত্তিক অনুধাবন জোরালো হওয়া।
অন্তত ৯ বছর দীর্ঘ প্রচেষ্টার ফসল এই মনোগ্রাফ। এতে ঠাঁই পাওয়া ওয়ারেস স্যারের স্বল্প-প্রচারিত বিচিত্র ধরনের স্থাপত্য নকশাগুলো তরুণ প্রজন্মের স্থপতিদের নিঃসন্দেহে বিস্মিত করবে। বাংলাদেশে আধুনিক ধারার স্থাপত্যের ইতিহাস, দর্শন ও চর্চাবিষয়ক গবেষণায় ও নতুন জ্ঞান উৎপাদনে এই বই ভূমিকা রাখবে। একই সঙ্গে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থপতিদের কাজ নিয়েও এ ধরনের মনোগ্রাফ রচনার ক্ষেত্রে এই প্রকাশনার অভিজ্ঞতা মূল্যবান দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।






