৩২ বছর পর জাতীয় গ্রন্থনীতি!

তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বাস্তবায়নের অপেক্ষায় থাকা জাতীয় গ্রন্থনীতি সংশোধন ও কার্যকরের উদ্যোগ নিয়েছে বর্তমান সরকার। এ লক্ষ্যে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের আয়োজনে গত ২০ জুলাই অনুষ্ঠিত হয়েছে একটি মতবিনিময় সভা। এতে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান, লেখক, প্রকাশক, গবেষক এবং গ্রন্থকেন্দ্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা অংশ নেন। সভায় অংশ নেওয়া আটজনের সঙ্গে কথা বলেছে আগামীর সময়। তাদের মধ্যে লেখক, প্রকাশক ও গ্রন্থকেন্দ্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা রয়েছেন। তাদের অভিমত, এবার সরকার আন্তরিকভাবে জাতীয় গ্রন্থনীতি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। তাই দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার অবসান ঘটতে পারে বলে তারা আশাবাদী।
দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের (ইউপিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহরুখ মহিউদ্দিন আগামীর সময়কে বললেন, ‘মতবিনিময় সভায় আমরা আমাদের অভিমত জানিয়েছি। সরকারের দিক থেকে মনে হয়েছে, তারা আন্তরিকভাবেই জাতীয় গ্রন্থনীতি বাস্তবায়ন করতে চায়। ফলে আমরা আশাবাদী।’ অ্যাডর্ন পাবলিকেশন্সের প্রকাশক জাকির হোসেন বলেছেন, ‘উন্মুক্ত এ সভায় বিভিন্ন পক্ষের মানুষ মতামত দিয়েছেন। সরকারের পক্ষ থেকেও লিখিতভাবে মতামত দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে। আশা করি, এবার একটি কার্যকর জাতীয় গ্রন্থনীতি বাস্তবায়িত হবে।’
জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণয়নের উদ্যোগ শুরু হয়েছিল ১৯৯১ সালে। সে বছর জাতীয় গ্রন্থমেলার উদ্বোধন অনুষ্ঠানে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণয়নের ঘোষণা দেন। এরপর ১৯৯২ সালের ৮ আগস্ট একটি কমিটি গঠন করা হয়। কয়েক মাসের পর্যালোচনা শেষে কমিটি ৩৪টি সুপারিশ প্রণয়ন করে। সেই সুপারিশের ভিত্তিতেই ১৯৯৪ সালে দেশের গ্রন্থ উন্নয়ন, প্রকাশনা শিল্পের বিকাশ এবং পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণয়ন ও মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। কিন্তু অনুমোদনের পরও নীতিমালাটি আর বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। দায়িত্ব বণ্টন, বাস্তবায়ন পরিকল্পনা এবং শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অভাবে এটি কার্যত কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
১৯৯৪ সালের জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণয়ন কমিটির আহ্বায়ক ছিলেন গ্রন্থবিশেষজ্ঞ বদিউদ্দিন নাজির। এত বছরেও কেন নীতিটি বাস্তবায়িত হয়নি— এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘যোগ্য নেতৃত্বের অভাব ছিল। যেভাবে নেতৃত্ব দিয়ে কাজটি হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি।’ বর্তমান সরকার আবারও গ্রন্থনীতি সংশোধনের উদ্যোগ নিলেও এ বিষয়ে তার সঙ্গে কোনো আলোচনা হয়নি বলে জানান তিনি। বদিউদ্দিন নাজির বলেছেন, ‘হয়তো আমাকে প্রয়োজন মনে করেননি। প্রয়োজন মনে করলে যোগাযোগ করবেন।’ তবে ‘বাংলাদেশের গ্রন্থ উন্নয়ন’ এবং ‘বাংলাদেশের গ্রন্থ প্রকাশনা’ গ্রন্থে এ বিষয়ে নিজের বিস্তারিত মতামত তুলে ধরেছেন বলেও জানান তিনি। বই দুটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ।
প্রযুক্তিগত পরিবর্তন, ডিজিটাল প্রকাশনার বিস্তার এবং ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’-এর বাস্তবতায় জাতীয় গ্রন্থনীতিকে যুগোপযোগী করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল ২০১০ সালেও। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে প্রণীত হয় জাতীয় গ্রন্থনীতি (সংশোধিত) ২০১৪। কিন্তু সেই খসড়াও শেষ পর্যন্ত অনুমোদন বা বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ২০১৪ সালের সংশোধিত খসড়া প্রণয়ন উপকমিটির আহ্বায়ক গবেষক মফিদুল হক আগামীর সময়কে বললেন, ‘তখন যে খসড়াটি হয়েছিল, এখন অনেক কিছুই বদলে গেছে। ফলে সেটিকে হালনাগাদ করে সময়োপযোগী করা প্রয়োজন। বর্তমান সরকার জাতীয় গ্রন্থনীতি সংশোধন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে, এটি ইতিবাচক। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো একটি যুগোপযোগী নীতিমালা বাস্তবায়ন করা।’ জাতীয় গ্রন্থনীতি (সংশোধিত) ২০১৪-এর ভূমিকায় বইকে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ নির্মাণের অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, একটি জাতির উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অন্যতম পূর্বশর্ত মানবসম্পদের বিকাশ। আর সেই বিকাশের সবচেয়ে কার্যকর উপাদানগুলোর একটি হলো গ্রন্থ। মানবসভ্যতার অগ্রগতি, সৃজনশীলতার বিকাশ এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানের উৎকর্ষে যুগে যুগে বই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে। নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে কাগজে মুদ্রিত বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক, অনলাইন বই ও ডিজিটাল বইয়ের ব্যবহার বাড়লেও শিক্ষা, গবেষণা এবং জ্ঞান বিনিময়ে বইয়ের গুরুত্ব কমেনি।
বিশ্বব্যাপী গ্রন্থ উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে ইউনেসকো ১৯৭২ সালকে আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ ঘোষণা করে এবং ‘বই সবার জন্য’ স্লোগান প্রচার করে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের উদ্যোগে ১৯৭২ সালের ২০ থেকে ২৬ ডিসেম্বর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে প্রথম জাতীয় গ্রন্থমেলা ও বিভিন্ন সেমিনারের আয়োজন করা হয়। পরে ১৯৮২ সালে লন্ডনে ইউনেসকোর উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস ফর বুকসে ‘রিডিং সোসাইটি’ গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। পরে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার অংশ হিসেবে জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণয়ন এবং গ্রন্থ উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গঠনের আহ্বান জানানো হয়। সেই আন্তর্জাতিক উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশে ১৯৯৪ সালে জাতীয় গ্রন্থনীতি প্রণয়ন ও অনুমোদিত হয়। বাংলাদেশে গ্রন্থ উন্নয়নের প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাসও দীর্ঘ। ইউনেসকোর সহযোগিতায় ১৯৬০ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা বিভাগের প্রজ্ঞাপনে প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যাশনাল বুক সেন্টার অব পাকিস্তান। এর একটি শাখা ছিল ঢাকায়। স্বাধীনতার পর এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র, বাংলাদেশ। পরে ১৯৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটির নাম হয় জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। বর্তমানে এটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। ২০১১ সালে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় জাতীয় গ্রন্থনীতি সংশোধনের উদ্যোগ নেয়। সে সময় ইউনেসকোর সুপারিশ অনুযায়ী ‘বাংলাদেশ গ্রন্থ উন্নয়ন পরিষদ’ নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগও শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ৩২ বছর পর জাতীয় গ্রন্থনীতি আবার আলোচনায় এসেছে। এবারও উদ্যোগটি কাগজে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের প্রকাশনা শিল্প, পাঠাভ্যাস ও জ্ঞানচর্চার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে— এখন সেই প্রশ্নের উত্তরই খুঁজছেন লেখক, প্রকাশক এবং গ্রন্থসংশ্লিষ্টরা।




