তত্ত্বে ‘থ্রি জিরো’ বাস্তবে কত

শুনতে ভালোই লাগে— দারিদ্র্য আর বেকারত্ব যাবে জাদুঘরে, কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নেমে পরিবেশ হবে নির্মল। যার নাম ‘থ্রি জিরো’ তত্ত্ব। আর এই তত্ত্ব নিয়ে তাত্ত্বিক কথা বলে বিশ্ব জুড়ে আলোচনায় আসেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নেন ড. ইউনূস। তার পরপরই আলোচনায় আসে তার এই ‘থ্রি জিরো’ তত্ত্ব। তিনি দেড় বছর দেশ পরিচালনা শেষে পার হয়েছে আরও মাস ছয়েক। এতদিনে তার সেই তত্ত্বের বাস্তবে অগ্রগতি কতটুকু বা দেশে এই তিন ক্ষেত্রের চিত্রপটে আদৌ কোনো ইতিবাচক বদল এসেছে কি না, তা এক বড় প্রশ্ন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘থ্রি জিরো’ তত্ত্বের বাস্তবায়নে মুহাম্মদ ইউনূস পেয়েছেন ‘জিরো’। কারণ, তিনি তার শাসন আমলে বাংলাদেশে এই তত্ত্বের ন্যূনতম প্রয়োগ করতে পারেননি। বরং দেড় বছরে উল্টো বেড়েছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব আর কার্বন নিঃসরণ।
‘থ্রি জিরো’ (তিন শূন্য) তত্ত্ব সারা বিশ্বেই বহুল আলোচিত। ভবিষ্যতের বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য এর বাস্তবায়ন খুবই জরুরি। অধ্যাপক ইউনূসের সুযোগ ও সামর্থ্য ছিল যে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে থ্রি জিরো তত্ত্বের বাস্তবায়নের একটা মডেল হিসেবে বাংলাদেশকে দাঁড় করানোর কিছু চেষ্টা করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যিনি এই তত্ত্বের ধারক ও বাহক তিনিই হেঁটেছেন উল্টোপথে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা নিয়েই বেশি ব্যস্ত থাকায় তত্ত্বটি বাস্তবায়নের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি বলেও অভিযোগ অনেকের।
থ্রি জিরো তত্ত্ব: ২০১৫ সালের নভেম্বরে জার্মানির বার্লিনে সপ্তম বৈশ্বিক সামাজিক ব্যবসা সম্মেলনের উদ্বোধনী বক্তব্যে ড. ইউনূস তার এই স্বপ্নের কথা তুলে ধরেন। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি পৃথিবীকে যে তিন শূন্যের লক্ষ্য পূরণের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন, সেগুলো হলো শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব ও শূন্য কার্বন নিঃসরণ। এ তিন লক্ষ্য পূরণ হলে জাতিসংঘ-ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন বা এসডিজির লক্ষ্যগুলোও পূরণ হয়ে যাবে বলে অভিমত ইউনূসের।
২০১৭ সালে ‘তিন শূন্যের পৃথিবী’ নিয়ে বই প্রকাশ ছাড়াও বিভিন্ন সময়ে এ নিয়ে বক্তৃতা বিবৃতি দিয়েছেন। ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পর থ্রি-জিরো তত্ত্ব নিয়ে বেশ সোচ্চার হন ড. ইউনূস ও তার সরকারের দায়িত্বশীলরা। কিন্তু দেড় বছরে এ নিয়ে কোনো অগ্রগতি তো দূরের কথা, কোনো উদ্যোগই নেননি তিনি।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিকভাবে ‘থ্রি জিরো’ ধারণা প্রচার করে আসছেন। শ্বেতপত্র প্রকাশ করে এই তিনটি বিষয়ে তৎকালীন সরকারের কার্যক্রম ও অর্জনের হিসাব জনগণের সামনে তুলে ধরার দাবি জানালেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান।
তিনি বলছিলেন, ‘জাতিসংঘের সদস্য দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ক্লিন এনার্জি দিবস পালনে ব্যর্থ হয়েছে। এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে সচেতন করা। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের কার্বন নিঃসরণ কমাতে কার্যকর উদ্যোগ নিতে উৎসাহিত করা। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিব্রত এই কারণে যে, যিনি থ্রি জিরোর ধারক-বাহক, তার নেতৃত্বাধীন সরকারই এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছে।’
শূন্য কার্বন নিঃসরণের ভিত্তি তৈরির মতো কাজ করার সুযোগ থাকলেও অন্তর্বর্তী সরকার সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারেনি বলেও অভিযোগ করলেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তার ভাষ্য, ‘সরকার এমন কোনো উদ্যোগ নিয়েছে কি না, যা পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এগিয়ে নিতে পারত, সে প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর নেই। এই সুযোগ দেশের জনগণ কেন হারাল, তার জবাব অন্তর্বর্তী সরকারকে দিতে হবে।’
বেড়েছে বেকারত্ব: অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে বন্ধ হয়ে যায় কয়েকশ কারখানা। সংকুচিত হয় বেসরকারি খাতে চাকরির বাজার। পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানেও নিয়োগ ছিল তুলনামূলক কম। ফলে বেকারত্ব কমে শূন্যের দিকে যাওয়া তো দূরের কথা, উল্টো বেকার হয়েছেন কয়েক লাখ মানুষ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ২০২৩ সালে বেকারের সংখ্যা ছিল সাড়ে ২৫ লাখ। পরের বছর ২০২৪ সালে তা বেড়ে ২৭ লাখ হয়েছে। যদিও বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি।
বিবিএসের সংজ্ঞা অনুসারে, কর্মক্ষম জনসংখ্যার মধ্যে যারা সপ্তাহে অন্তত এক ঘণ্টা মজুরি বা পারিবারিক কাজে নিযুক্ত থাকেন, তাদের কর্মে নিয়োজিত ধরা হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের বাস্তবতায় এক ঘণ্টার কাজ জীবিকা নির্বাহের জন্য যুক্তিসংগত নয়। ফলে ওই জরিপেই বলা হয়েছে, প্রায় এক কোটি মানুষ তাদের যোগ্যতা ও সম্ভাব্য কাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ চাকরি পাচ্ছেন না। অর্থাৎ এই মানুষগুলো বেকার। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে বর্তমানে সোয়া ছয় কোটি মানুষ দারিদ্র্যের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছেন। গত দুই বছরে ২০ লাখ মানুষ চাকরি হারিয়েছেন।
বেড়েছে দারিদ্র্যের হারও: বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে দারিদ্র্যের হার ছিল সাড়ে ২০ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এসে তা বেড়ে দাঁড়ায় ২১ দশমিক ২ শতাংশে। দারিদ্র্যের হার আরও বাড়তে পারে বলেও সতর্ক করেছে বিশ্বব্যাংক। আর বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) তথ্য তুলে ধরছে, দেশে দারিদ্র্যের হার বেড়ে এখন ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে পৌঁছেছে। ১ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে যা এসেছে।
অর্থনীতিবিদ ও গবেষক ড. জাহাঙ্গীর আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, ‘অধ্যাপক ইউনূস তার সময়ে নিজের তত্ত্বের সম্পূর্ণ উল্টোপথে হেঁটেছেন। কারণ, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে দরিদ্রতা বেড়ে ১৮ থেকে ২৩ শতাংশ হয়েছে। বহু মানুষ চাকরি খুইয়েছেন। বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়েছিল। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় বেকারত্ব বেড়েছে। এক লাখ কোটি টাকার ওপরে ঋণ করে ঋণগ্রস্ততা বাড়িয়েছে। অন্যদিকে পরিবেশ মোটেও ভালো ছিল না।’
‘১৮ মাস অনেক সময়। এই সময়ে থ্রি জিরো তত্ত্বের বাস্তবায়নে কাজ শুরুর যথেষ্ট সুযোগ ছিল। কারণ, ড. ইউনূসের সরকারে যারা ছিলেন তাদের অনেকেই যোগ্য, দক্ষ। কিন্তু তারা কিছুই করতে পারেননি। কারণ, তারা যতদিন পারছেন ক্ষমতা ভোগদখল করার চেষ্টায় ব্যস্ত ছিলেন,’ যোগ করেন তিনি।
শূন্য কার্বন নিঃসরণ: ‘থ্রি জিরো’ তত্ত্বের অন্যতম উপাদান হলো শূন্য কার্বন নিঃসরণ। সেজন্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি জরুরি। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দেশে সরকারিভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানিভিত্তিক কার্যক্রম ছিল না বললেই চলে। উল্টো বিশেষ ক্ষমতা আইনের আওতায় অনুমোদন পাওয়া বেসরকারি খাতের ৩৭টি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের এলওআই (লেটার অব ইনটেন্ট) বাতিল করা হয়েছে, যার মোট উৎপাদন ক্ষমতা ২ হাজার ৬৬০ মেগাওয়াট। এলওআই বাতিলের পাশাপাশি ক্রয় চুক্তি হয়েছে, কিন্তু নির্মাণ শেষ হয়নি— এমন কিছু সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ নতুন করে নির্ধারণেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়। যার কারণে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ আটকে যায় মাঝ পথে। খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রতিবন্ধকতা না থাকলে এখন অন্তত দুই থেকে আড়াই হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যোগ হতো জাতীয় গ্রিডে।
জানতে চাইলে অন্তর্বর্তী সরকারের তিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান আগামীর সময়কে বলছিলেন, “মূলত দুই কারণে কাজটি হয়নি। এক, ‘মেগা প্রজেক্টে’ (বড় প্রকল্প) আসক্তি। অধিকাংশ ব্যবসায়ী ও রাজনীতিবিদরা ছোট প্রকল্প চান না। দ্বিতীয়ত, বিদ্যুৎ বিভাগের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীদের অনাগ্রহ।”
‘তবে এখন হবে। কারণ জ্বালানি সংকট। গ্যাস সরবরাহ কমছে। বাড়ছে আমদানিনির্ভরতা। নবায়নযোগ্য জ্বালানি ছাড়া তো কোনো উপায় নেই। তা ছাড়া এসব কাজ করতে সময়ও লাগে,’ যোগ করেন ইউনূস সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এই উপদেষ্টা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্ব জুড়ে জীবাশ্ম জ্বালানির উৎপাদন কমছে। এর দাম বেশি আবার পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ক্ষতিকর। অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিবেশবান্ধব। এর দামও দিনে দিনে কমছে। এসব বিবেচনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষ করে সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝোঁকে বিভিন্ন দেশ। কিন্তু বাংলাদেশে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরেই এ খাত অবহেলিত।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালাইসিসের (আইইএফএ) জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম আগামীর সময়কে বলছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকার আগের অনুমোদন পাওয়া সব এলওআই বাতিল না করে যেসব কেন্দ্রের অগ্রগতি ভালো, সেগুলোর ‘রিভিউ’ করতে পারত। আলোচনার মাধ্যমে এর দাম পর্যালোচনার সুযোগ ছিল। তাতেও এতদিনে কিছু সৌরবিদ্যুৎ পাওয়া যেত। আর ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে এত তড়িঘড়ি করা না হলে এখন অন্তত একটা ভালো ফল পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।
ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতের বিষয়ে তার পরামর্শ হলো— সরকারের এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের আগে পরীক্ষামূলক কিছু প্রকল্প করার দরকার ছিল। তাতে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া সহজ হতো।
খানিকটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বাংলাদেশ টেকসই ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি সমিতির (বিএসআরইএ) সভাপতি মো. মোস্তফা আল মাহমুদ বলছিলেন, জোর করে চাপিয়ে দিয়ে তড়িঘড়ি করে নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ করা সম্ভব নয়।
তার অভিযোগ, অন্তর্বর্তী সরকার চেয়েছিল সৌরবিদ্যুৎ কার্যক্রম ধ্বংস হয়ে যাক। তারা এ বিষয়ে অভিজ্ঞদের কোনো পরামর্শ নেয়নি। বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে সব ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছিল। যার কারণে প্রায় দুই বছরে সৌরবিদ্যুৎ থেকে সরকারিভাবে কোনো বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়নি।
‘থ্রি-জিরো তত্ত্ব ড. ইউনূসের এক ধরনের স্টান্টবাজি— এমন অভিযোগ তুলে মাহমুদ বলছিলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের উন্নয়ন না হওয়ার পেছনে আরেকটি বড় কারণ আমলাদের অজ্ঞতা ও অনীহা।
সেই আমলাদের দিয়ে আগামী পাঁচ বছরে বর্তমান সরকার ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্য নিয়েছে, তা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেটি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এই ব্যবসায়ী। অন্তর্বর্তী সরকারের খসড়া জ্বালানি ও বিদ্যুৎ মহাপরিকল্পনা (ইপিএসএমপি ২০২৫) নিয়েও তীব্র আপত্তি রয়েছে পরিবেশবাদীদের। তারা বলছেন, এই পরিকল্পনা মূলত জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর। এতে এমন কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই, যার মাধ্যমে বাংলাদেশ পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে কার্যকরভাবে উত্তরণ ঘটাতে পারবে।




