শেষ পাঠ
- আলফঁস দোদে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
আলফঁস দোদে (Alphonse Daudet) ঊনবিংশ শতাব্দীর বিখ্যাত ফরাসি ঔপন্যাসিক ও ছোটগল্পকার। ১৮৪০ সালে ফ্রান্সের নিম (Nîmes) শহরে জন্ম। তার ছোটগল্প ‘La Dernière Classe’ (শেষ পাঠ) বিশ্বসাহিত্যে এক অমর সৃষ্টি, যা দেশপ্রেম ও মাতৃভাষার গুরুত্বকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। ১৮৯৭ সালে তিনি পারিতে মৃত্যুবরণ করেন।
সেদিন সকালে স্কুলে যেতে আমার ভীষণ দেরি হয়ে গিয়েছিল আর বকা খাওয়ার ভয়ে বুক কাঁপছিল। তার ওপর আমেল মাস্টারমশাই বলেছিলেন, তিনি ক্রিয়ার বিশেষ রূপ নিয়ে আমাদের প্রশ্ন করবেন, অথচ এ বিষয়ে আমি একেবারে কিচ্ছু জানি না। একমুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো, ক্লাস ফাঁকি দিয়ে মাঠের দিকে দৌড়ে পালিয়ে যাই। কী যে উষ্ণ আর নির্মল ছিল দিনটি!
বনের ধারে পাখিদের শিস শোনা যাচ্ছিল আর করাতকলের পেছনের খোলা মাঠে সামরিক মহড়া করছিল প্রুশীয় সৈন্যরা। এ সবকিছুই আমাকে ব্যাকরণের নিয়মের চেয়ে অনেক বেশি টানছিল; নিজেকে আমি সামলাতে পারলাম আর খুব তাড়াতাড়ি স্কুলের দিকে ছুটে গেলাম। পৌরভবনের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম, খবর সাঁটার ছোট লোহার জালির কাছে বেশ কিছু লোক দাঁড়িয়ে আছে। গত দুই বছর ধরে এখান থেকেই আমরা পেয়েছি যতসব বাজে খবর— যুদ্ধে হেরে যাওয়ার খবর, সৈন্যদের জন্য জিনিসপত্র জোর করে সংগ্রহ করার নির্দেশ আর কমান্ড্যান্টের নানা আদেশ। থামলাম না, শুধু মনে মনে ভাবলাম: ‘আবার কী হলো?’এরপর, আমি যখন দৌড়ে চত্বরটি পার হচ্ছিলাম, তখন শিক্ষানবিশকে নিয়ে সেখানে নোটিস পড়তে থাকা কর্মকার ওয়াখটার আমাকে চিৎকার করে বললেন— ‘এত তাড়াহুড়ো করো না, খোকা; তোমার স্কুলে যাওয়ার অনেক সময় পাবে!’ আমার মনে হলো, তিনি আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন আর আমি হাঁপাতে হাঁপাতে আমেল মাস্টারমশাইয়ের ছোট উঠোনে গিয়ে ঢুকলাম। সাধারণত ক্লাসের শুরুতে বেশ শোরগোল হয়, যা রাস্তা অবধি শোনা যেত— ডেস্ক খোলা বা বন্ধ করার শব্দ, ভালো করে শেখার জন্য কান চেপে ধরে সবাই মিলে খুব জোরে জোরে একসঙ্গে পড়ার শব্দ আর শিক্ষকের বড় রুলারটি টেবিলের ওপর ঠোকার শব্দ— ‘চুপ করো!’ এসব হইচইয়ের ওপর ভরসা করেই আমি সবার চোখকে ফাঁকি দিয়ে নিজের বেঞ্চে গিয়ে বসে পড়ব ভেবেছিলাম; কিন্তু সেদিনই কি না সবকিছু ছিল রবিবারের সকালের মতো একেবারে শান্ত। খোলা জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম, আমার সহপাঠীরা এরই মধ্যে নিজেদের জায়গায় ঠিকঠাক বসে আছে আর আমেল মাস্টারমশাই বগলের নিচে সেই ভয়ংকর লোহার রুলারটি নিয়ে এদিক-ওদিক পায়চারি করছেন। এ নিস্তব্ধতার মধ্যে দরজা খুলে ঢোকা ছাড়া আমার আর কোনো উপায়ই রইল না। ভাবতেই পারো, তখন আমার মুখ লাল হয়ে উঠেছিল আর কী ভয়ই না পেয়েছিলাম! কিন্তু না। আমেল মাস্টারমশাই রাগ না করে আমার দিকে তাকালেন এবং খুব নরম স্বরে বললেন: ‘তাড়াতাড়ি তোমার জায়গায় চলে যাও, আমার ছোট্ট ফ্রাঁৎজ; তোমাকে ছাড়াই আমরা ক্লাস শুরু করতে যাচ্ছিলাম।’ আমি বেঞ্চ টপকে তাড়াতাড়ি নিজের ডেস্কে গিয়ে বসলাম। তখন ভয়টা একটু কাটতে শুরু করলে দেখলাম আমাদের মাস্টারমশাই তার সুন্দর সবুজ কোটটির সঙ্গে ঝালরওয়ালা শার্ট এবং কালো রেশমের কারুকাজ করা টুপিটি পরে আছেন— যে পোশাকগুলো তিনি শুধু স্কুল পরিদর্শনের দিন কিংবা পুরস্কার বিতরণের দিনই পরতেন। এ ছাড়া, গোটা ক্লাসটাই যেন বেশ অস্বাভাবিক ও গম্ভীর হয়ে ছিল। কিন্তু আমাকে সবচেয়ে বেশি অবাক করল, ক্লাসরুমের একেবারে পেছনের দিকে যে বেঞ্চগুলো সাধারণত খালি থাকত, সেখানে গ্রামের লোকজনকে আমাদের মতোই চুপচাপ বসে থাকতে দেখে। সেখানে ছিলেন তিনকোনা টুপি পরা বৃদ্ধ ওজের, প্রাক্তন মেয়র, প্রাক্তন ডাকপিয়ন এবং আরও কয়েকজন। সেসব লোককে দেখাচ্ছিল বিষণ্ণ আর ওজের সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন কিনারা ক্ষয়ে যাওয়া একটি পুরনো বর্ণপরিচয়ের বই। সেটি তিনি হাঁটুর ওপর মেলে ধরে রেখেছিলেন আর তার মোটা চশমাটি বইয়ের পাতার ওপর রাখা ছিল আড়াআড়ি। আমি এসব দেখে যখন অবাক হচ্ছিলাম, তখন আমেল মাস্টারমশাই উঠে গিয়ে তার শিক্ষকের আসনে বসলেন এবং আমাকে যেভাবে স্বাগত জানিয়েছিলেন, সেই একই কোমল ও গম্ভীর স্বরে আমাদের বললেন— ‘ছেলেমেয়েরা, আজই শেষবারের মতো আমি তোমাদের ক্লাস নেব। বার্লিন থেকে আদেশ এসেছে, আলজাস ও লরেইনের স্কুলগুলোতে এখন থেকে শুধু জার্মান ভাষায়ই পড়ানো হবে... নতুন শিক্ষক আগামীকাল আসছেন। আজ তোমাদের ফরাসি ভাষার শেষ পাঠ। আমি চাই, তোমরা খুব মন দিয়ে শোনো।’ এ কয়েকটি কথা আমার পুরো জগৎটিকে ওলটপালট করে দিল। আহা! ওই হতচ্ছাড়ারাই তাহলে পৌরভবনে সেই নোটিসটা সাঁটিয়ে রেখেছিল। আমার ফরাসি ভাষার শেষ পাঠ!...
এক টুকরো চক তুলে নিয়ে তিনি ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে ফিরে গেলেন এবং তার সব শক্তি দিয়ে চাপ দিয়ে যতটা সম্ভব বড় করে লিখলেন— ‘ফ্রান্স দীর্ঘজীবী হোক!’
আর আমি, যে কি না ঠিকমতো লিখতেই জানতাম না! তাহলে আমি আর কোনোদিন শিখতে পারব না! তাহলে এখানেই থেমে থাকতে হবে!... এখন অপচয় করে ফেলা সময়টার কথা ভেবে আমার নিজের ওপরই রাগ হচ্ছিল, কত ক্লাস যে ফাঁকি দিয়েছি পাখির বাসা খুঁজতে বেরিয়ে কিংবা সার নদীর বরফে পিছলে বেড়াতে গিয়ে! আমার বইগুলো, যেগুলো একটু আগেও আমার কাছে এত বিরক্তিকর, এত ভারী বলে মনে হতো, আমার ব্যাকরণের বই, আমার পবিত্র ইতিহাসের বই— এখন মনে হচ্ছিল তারা যেন কতদিনের পুরনো বন্ধু, যাদের ছেড়ে যেতে আমার ভীষণ কষ্ট হবে। আমেল মাস্টারমশাইয়ের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। তিনি চলে যাবেন, তাকে আর কোনোদিন দেখতে পাব না, এটা ভাবতেই তার দেওয়া শাস্তি আর রুলারের বাড়ির কথা ভুলে যাচ্ছিলাম। বেচারা মাস্টারমশাই!
এই শেষ ক্লাসটির সম্মানেই তিনি তার রবিবারের সুন্দর পোশাকটি পরেছিলেন আর এখন আমি বুঝতে পারছিলাম, কেন গ্রামের সেই বৃদ্ধ লোকগুলো এসে ক্লাসরুমের পেছনের দিকে বসেছিল। মনে হচ্ছিল, তারা যেন আফসোস করছিল যে, এই স্কুলে আরও বেশি করে আসা হয়নি বলে। একই সঙ্গে, এটা যেন আমাদের মাস্টারমশাইয়ের চল্লিশ বছরের নিষ্ঠাবান সেবার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানানোর একটি উপায় ছিল আর যে মাতৃভূমি আমাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছিল, তার প্রতিও যেন নিজেদের কর্তব্য পালন করে নেওয়া।
এসব কথা ভাবছিলাম, এমন সময় শুনলাম আমার নাম ধরে ডাকা হচ্ছে। এবার আমার পালা পড়েছে পড়া বলার। আহা, যদি সেই বিখ্যাত ব্যাকরণের নিয়মটি একটানা, খুব জোরে, খুব স্পষ্ট করে, একটি ভুলও না করে বলতে পারতাম— তার জন্য আমি কী না দিতে রাজি ছিলাম! কিন্তু প্রথম কয়েকটি শব্দেই আমি জড়িয়ে গেলাম আর বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে অসহায়ভাবে এদিক-ওদিক দুলতে লাগলাম, বুকটা ভার হয়ে ছিল, মাথা তোলার সাহস হচ্ছিল না। শুনতে পেলাম, আমেল মাস্টারমশাই আমাকে বলছেন:
“আমি তোমাকে মোটেও বকব না, আমার ছোট্ট ফ্রাঁৎজ, তোমার যথেষ্ট শাস্তি হয়েছে... এই তো ব্যাপার। প্রতিদিন আমরা নিজেদের বলি— ‘আহা! আমার হাতে তো অনেক সময় আছে। কাল শিখব।’ তারপর দেখতেই পাচ্ছ, কী ঘটে... আহা! আমাদের আলজাসের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্যই ছিল নিজেদের পড়াশোনার কাজটা সবসময় আগামীকালের জন্য ফেলে রাখা। এখন ওই লোকগুলোর তো অধিকার আছেই আমাদের মুখের ওপর বলে দেবার— ‘কী! তোমরা নিজেদের ফরাসি বলে দাবি করতে, অথচ নিজেদের ভাষায় কথা বলতে বা লিখতে জানো না!...’ এ সবকিছুর মধ্যে, আমার বেচারা ফ্রাঁৎজ, সবচেয়ে বেশি দোষ তোমার নয়। নিজেদের দোষারোপ করার মতো কিছু না কিছু আমাদের সবারই আছে।” ‘তোমাদের বাবা-মায়েরা তোমাদের শিক্ষিত করে তুলতে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি। বরং তারা তোমাদের ক্ষেতে কিংবা কারখানায় কাজ করতে পাঠাতে পারলেই বেশি খুশি হতেন, যাতে কয়েকটা পয়সা বেশি উপার্জন করতে পারো। আমার নিজেরও কি কোনো দোষ নেই? আমিও কি তোমাদের অনেক সময় পড়াশোনার বদলে আমার বাগানে জল দিতে পাঠাইনি? আর যখন আমার মাছ ধরতে যাওয়ার ইচ্ছে হয়েছে, তখন তোমাদের ছুটি দিয়ে দিতে কি আমি একটুও দ্বিধা করেছি?...’
তারপর এক কথা থেকে আরেক কথায় যেতে যেতে, আমেল মাস্টারমশাই আমাদের ফরাসি ভাষা সম্পর্কে বলতে শুরু করলেন। তিনি বললেন, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর ভাষাটি হলো ফরাসি, সবচেয়ে স্পষ্ট, সবচেয়ে দৃঢ় ভাষা; এই ভাষাকে আমাদের নিজেদের মধ্যে ধরে রাখতে হবে, কোনোদিন ভুলে যাওয়া চলবে না। কারণ, কোনো জাতি যখন দাসে পরিণত হয়, তবু যতক্ষণ সে তার ভাষাকে আঁকড়ে ধরে থাকে, ততক্ষণ যেন সে তার কারাগারের চাবিটা নিজের হাতেই ধরে রাখে... তারপর তিনি একটি ব্যাকরণের বই হাতে নিয়ে আমাদের পাঠ পড়ে শোনালেন। আমি অবাক হয়ে দেখলাম, কথাগুলো আমি কী সহজেই বুঝতে পারছি! তিনি যা বলছিলেন, সবকিছুই আমার কাছে একেবারে সহজ, খুবই সহজ মনে হচ্ছিল। আমার মনে হয়, এর আগে আমি কখনো এত মন দিয়ে শুনিনি, আর তিনিও বোধহয় কখনো তার ব্যাখ্যা দেওয়ার সময় এতটা ধৈর্য ধরেননি। মনে হচ্ছিল, চলে যাওয়ার আগে বেচারা মানুষটি তার সমস্ত জ্ঞান আমাদের দিয়ে যেতে চাইছিলেন, একবারেই যেন সবকিছু আমাদের মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে চান। পাঠ শেষ হলে আমরা লিখতে শুরু করলাম। সেদিনের জন্য আমেল মাস্টারমশাই একেবারে নতুন কিছু লেখার নমুনা তৈরি করে এনেছিলেন। সেগুলোর ওপর সুন্দর গোলাকার হাতের অক্ষরে লেখা ছিল— ‘ফ্রান্স, আলজাস, ফ্রান্স, আলজাস।’ আমাদের ডেস্কের সামনে ঝোলানো দণ্ড থেকে ক্লাসরুমের চারপাশে সেগুলো ছোট ছোট পতাকার মতো দুলছিল। দৃশ্যটি দেখার মতো ছিল, প্রত্যেকে কী মন দিয়ে লিখছিল, আর কী নিস্তব্ধতা! কাগজের ওপর কলমের খসখস শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না। একসময় কয়েকটি গুবরে পোকা উড়ে এলো; কিন্তু কেউই সেদিকে নজর দিল না, এমনকি একেবারে ছোটরাও নয়। তারা মন দিয়ে নিজেদের দাগগুলো টানছিল, এমন মনোযোগ আর যত্ন নিয়ে, যেন এটুকুও ফরাসি ভাষার পাঠের অংশ... স্কুলের ছাদের ওপর কবুতরগুলো নিচু স্বরে বাকবাকুম করছিল আর তাদের ডাক শুনতে শুনতে আমি ভাবছিলাম— ‘ওদেরও কি জার্মান ভাষায় গান গাইতে বাধ্য করা হবে?’
মাঝে মাঝে, যখন খাতা থেকে চোখ তুলে তাকাচ্ছিলাম, দেখছিলাম আমেল মাস্টারমশাই শিক্ষকের আসনে একেবারে স্থির হয়ে বসে আছেন আর চারপাশের জিনিসগুলোর দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছেন, যেন দৃষ্টি জুড়ে তার পুরো ছোট্ট স্কুলঘরটাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাইছেন... ভেবে দেখো! চল্লিশ বছর ধরে তিনি একই জায়গায় ছিলেন, সামনে সেই একই উঠোন আর তার সেই একই ক্লাসঘর। শুধু বেঞ্চ আর ডেস্কগুলো ব্যবহারে মসৃণ হয়ে গিয়েছিল; উঠোনের আখরোট গাছগুলো বড় হয়ে উঠেছিল, আর যে হপ লতাটা তিনি নিজ হাতে লাগিয়েছিলেন, তা এখন জানালা বেয়ে একেবারে ছাদ পর্যন্ত পেঁচিয়ে উঠেছে। এসব কিছু ছেড়ে চলে যাওয়া বেচারা মানুষটির জন্য কতটাই না হৃদয়বিদারক হতে পারে! আর ওপরে নিজেদের ঘরে তার বোন যখন এদিক-ওদিক আনাগোনা করে বাক্সপ্যাঁটরা বন্ধ করছিলেন, সেই আওয়াজও তাকে শুনতে হচ্ছিল! কারণ পরদিনই তাদের চলে যেতে হবে, চিরদিনের জন্য এ দেশ ছেড়ে। তা সত্ত্বেও, আমাদের ক্লাসটি শেষ করে নেওয়ার মতো সাহস তিনি হারাননি। লেখা পাঠের পর হলো ইতিহাসের পাঠ; তারপর ছোটরা সবাই মিলে একসঙ্গে উচ্চারণ করতে শুরু করল— ‘BA BE BI BO BU’। ক্লাসরুমের একেবারে পেছনে বৃদ্ধ ওজের চশমা পরে নিয়েছিলেন এবং দুহাতে তার বর্ণপরিচয়ের বইটি ধরে ছোটদের সঙ্গে সঙ্গে অক্ষরগুলো বানান করে পড়ছিলেন। বোঝাই যাচ্ছিল, তিনিও খুব মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করছেন; আবেগে তার গলা কাঁপছিল। তাকে এভাবে পড়তে দেখে এত অদ্ভুত লাগছিল যে, আমাদের সবারই একসঙ্গে হাসতে আর কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। আহা! এই শেষ ক্লাসটির কথা আমি কোনোদিন ভুলব না... হঠাৎ গির্জার ঘড়িতে দুপুর বারোটা বাজল, তারপর বেজে উঠল অ্যাঞ্জেলুসের ঘণ্টাধ্বনি। ঠিক সেই সময়ই মহড়া থেকে ফিরে আসা প্রুশীয় সৈন্যদের তূর্যধ্বনি বেজে উঠল আমাদের জানালার নিচে... আমেল মাস্টারমশাই শিক্ষকের আসনে উঠে দাঁড়ালেন, মুখ একেবারে ফ্যাকাশে। তাকে এর আগে কোনোদিন এত লম্বা বলে মনে হয়নি আমার। ‘বন্ধুরা,’ তিনি বললেন, ‘বন্ধুরা, আমি... আমি...’ কিন্তু কী যেন তার গলা চেপে ধরেছিল। তিনি আর কথাটা শেষ করতে পারলেন না। এক টুকরো চক তুলে নিয়ে তিনি ব্ল্যাকবোর্ডের দিকে ফিরে গেলেন এবং তার সব শক্তি দিয়ে চাপ দিয়ে যতটা সম্ভব বড় করে লিখলেন— ‘ফ্রান্স দীর্ঘজীবী হোক!’
তারপর মাথাটা দেয়ালে ঠেকিয়ে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। একটি কথাও নয়, শুধু হাতের ইশারায় আমাদের জানালেন— ‘পাঠ শেষ... তোমরা চলে যাও।’



