শুভ জন্মদিন
অক্ষয় মালবেরি’র ছায়ায় বসে মণীন্দ্র গুপ্তর সঙ্গে কিছুক্ষণ

কবি মণীন্দ্র গুপ্তর সঙ্গে লেখক, ২০১৬ সালে তোলা
কবি মণীন্দ্র গুপ্তকে পড়তে যাওয়া মানে এক ভিনগ্রহে পা রাখা। যে গ্রহে নগর আছে, কিন্তু নাগরিক ক্লান্তি নেই; গ্রাম আছে, কিন্তু গ্রামীণ পলায়ন নেই; আধুনিকতা আছে, কিন্তু তার ভেতরে আছে চিরকালীন এক জীবনের স্পন্দন। বাংলা কবিতার অভিমুখ যখন ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা, হতাশা আর বিচ্ছিন্নতার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই তিনি এসে দাঁড়ালেন যেন— শঙ্খ ঘোষ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, শক্তি চট্টোপাধ্যায়দের বৃত্ত থেকে সম্পূর্ণ সরে গিয়ে এবং দেখালেন, আধুনিক হওয়ার মানে সমকালীনতাকে অস্বীকার করা নয়, বরং তার ভেতরে চিরকালীন আবেদনকে ধরে রাখার চেষ্টাটাও আধুনিকতা হতে পারে। তার কবিতায় ঢেঁকিশাক আর বেতফলের ঘ্রাণ মিশে যায় বহু যুগের ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা স্থাপত্যের মতো। শহরের জঠরে বসেও তিনি নিজেকে ছড়িয়ে দেন সেইসব নিভৃত গ্রামে, যেখানে পুকুরের কালচে জলে ‘চ্যাং বা চ্যাপটামুখ গজাল মাছেরা’ খাবারের খোঁজে মুখ তুলেই ভুস করে জলতরঙ্গ ছড়িয়ে ডুব দেয়।
কিন্তু এই কবি, মণীন্দ্র গুপ্তকে যদি সত্যিই প্রকাশ্য সত্যের মতো জানতে হয়, তবে তার কবিতা ছুঁয়ে যাওয়া যথেষ্ট নয়। পড়তে হবে ‘অক্ষয় মালবেরি’— তিন খণ্ডে বিন্যস্ত সেই আত্মজীবনী, যা বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আত্মস্মৃতি হিসেবে টিকে থাকবে অনন্তকাল। ‘মালবেরি’ তুঁতফলের আরেক নাম। তুঁতফল দেখতে যেমন সুন্দর, নিজের জীবনের প্রথম ভাগকে সেই তুঁতফলের মতো সুন্দর মেনেই হয়তো লেখক এমন নামকরণ করেছেন, সঙ্গে সামনে ‘অক্ষয়’ জুড়ে দিয়ে সেই সময়কে করে দিয়েছেন একদম স্থির— যেন চিরকালের জন্য ধরা পড়ে আছে বরিশালের গৈলা গ্রাম, বরাক উপত্যকার নাগা সাধু, শাক্ত সাধু, বৈষ্ণবী, মগ, মণিপুরীদের জীবনযাত্রা, পালাগায়ক আর কথকঠাকুরের বিলুপ্ত পেশা।
মণীন্দ্র গুপ্ত বলতে গেলে সাধারণ জীবনযাপনই করেছেন। তিনি অভাবনীয় প্রভাবশালী বা জনপ্রিয় কেউ ছিলেন না। তবুও তার আত্মজীবনীতে নিমগ্ন হয়ে যেতে হয় তার লেখার কারণে
মণীন্দ্র গুপ্ত’র জন্ম ১৯২৬ সালে অবিভক্ত ভারতবর্ষের বরিশালের গৈলা গ্রামে। জন্মের দশ মাসের মাথায় মাতৃহারা হন। এই ঘটনা তার কলমে উঠে এসেছে এভাবে: ‘আমাদের চেনাশোনা, ভালোবাসা হবার আগেই মা যখন মারা গেলেন, তখন তার বয়স উনিশ বছর, আর আমার দশ মাস।’ কয়েকটি মাত্র শব্দ, কিন্তু ওটুকুতেই কত না-পাওয়া তিনি বুঝিয়ে দিলেন! এই সংযমই মণীন্দ্র গুপ্তের মহাপৃথিবী। মায়ের মৃত্যুর পর বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করেন, কিন্তু মাতৃস্থানীয় ভূমিকা নেন ঠাকুমা— স্নেহের এক আধার, যার কাছে জমা রয়েছে অবারিত স্নেহ। আত্মজীবনীর প্রথম পর্বের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ত্রিশের দশকের বাংলার গ্রামের অপরূপ সৌন্দর্যের ও নিত্যনৈমিত্তিক জীবনযাপনের অসাধারণ বর্ণনা— বাড়ি-ঘর কেমন হয়, প্রতিবেশী, উৎসব, পূজা, নবান্ন, নৌকা বাইচ— সবকিছুর জলজ্যান্ত চিত্র। এই বইয়ের বর্ণনাগুলো এত বাস্তব যে অবাক হতে হয়— লেখক এতকিছু এত চমৎকারভাবে মনে রাখলেন কী করে!
কৈশোরে তিনি বেঁচেছিলেন আসামে, নিজের মাতুলালয়ে, মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসেন সেই অঞ্চল থেকেই। এখানে প্রকৃতির বর্ণনার চেয়ে অনেক বেশি আছে মানুষের বর্ণনা— ভিন্ন ভিন্ন মানুষ, আপন-পর, বিভিন্ন বিচিত্র পেশা ও সেই পেশাজীবীদের কথা। এই পর্বে আমরা তাকে মানুষের চরিত্র বিশ্লেষণ ও কাজের কার্যকরণ ব্যাখ্যা করতে দেখি। সংক্ষিপ্তভাবে হলেও নাগা আদিবাসীদের বঞ্চনার কথার সঙ্গে ইংরেজ ঔপনিবেশিকদের জাঁকজমক, ঠাঁটবাটের প্রতি লেখকের বিদ্বেষও প্রকাশ পেয়েছে। তখন তিনি পাঠ্য বইয়ের বাইরে যাবতীয় অপাঠ্য বই, ম্যাগাজিন, ছবির বই, পত্রিকা পড়ছেন, আর আস্তে আস্তে বিমোহিত হচ্ছেন, পরিচয় পাচ্ছেন সম্পূর্ণ নতুন এক জগতের। এই সময়টাই সম্ভবত মণীন্দ্র গুপ্তের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় ছিল। তার পরবর্তী জীবনের যে কবি পরিচয়, তার ভিত স্থাপিত হয়েছিল তখনই। নিঃসঙ্গ এক বালক নিজের আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল সাহিত্য ও চিত্রকলায়। সেখানেই তিনি ডুবে থাকতেন।
মাধ্যমিকের পর কলকাতায় আসেন, যেখানে দিদিমা, দাদু, মাসী ও মামারা নতুন আবাস গড়েছে। এখানে কিন্তু তিনি সেই অবাঞ্চিতই থেকে গিয়েছিলেন। এই ব্যাপারটা তিনি লিখেছেন এভাবে: ‘এদের চোখে যেমন অনুমোদন নেই, মুখেও কিন্তু কোনো কুবাক্য নেই।’ ফলে স্বাভাবিকভাবেই তার আর পড়াশোনা হলো না। আর এই না-ঘটনাই তাকে পাল্টে দিলো। তিনি লিখছেন: ‘আমরা ভাবি ঘটনাই বুঝি মানুষকে পাল্টে দেয়, না-ঘটনাও যে মানুষকে পাল্টায় সে কথা এখন বুঝলাম। যদি আমার স্কুলের পর কলেজ, তারপর চাকরি এসব স্বাভাবিক ঘটনা পর পর ঘটত, তবে হয়তো আমার স্বাভাবিক বিকাশ হতো। কিন্তু তা তো হলো না। আমার ঘটনাগুলো না ঘটে অপমানিত মাথা নিচু করে স্তব্ধ বসে রইল বলে আমি উল্টোপাল্টা লোক হলাম।’ এই স্বীকারোক্তি পড়তে পড়তে পাঠক বালক বা কিশোর মণীন্দ্রকে নিজের সামনে দেখবেন— কীভাবে এক বালক ঘুরে বেড়াচ্ছে গ্রামের কাশফুলের মধ্য দিয়ে, বইয়ের পর বইয়ের ভেতর খুঁজে বেড়াচ্ছে নিজের অস্তিত্ব, কুঁকড়ে যাচ্ছে অনাদরে, আবার নিজের শক্তিতে বলীয়ান হচ্ছে।
এরপর তিনি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, যদিও সম্মুখ সমরে লড়তে হয়নি তাকে। সামরিক বাহিনীতে এত শৃঙ্খলা, অনুশাসনের মধ্যেও তিনি পরিবার খুঁজে পেয়েছিলেন। ২২ বছর বয়সে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সামনে রেখে সামরিক বাহিনী থেকে অবসর নেওয়ার মধ্য দিয়ে তৃতীয় পর্ব ও বইয়ের সমাপ্তি ঘটে। ‘অক্ষয় মালবেরি’ শুধু আত্মজীবনী নয়, এটি এক অনন্য সাহিত্যকর্ম। তিন খণ্ডে লেখা আত্মজীবনীটি প্রথমবার এক মলাটে প্রকাশিত হয়েছিল অবভাস প্রকাশনী থেকে, ২০০৯ সালের অক্টোবরে। প্রচ্ছদ ও ভেতরের সব অলংকরণ মণীন্দ্র গুপ্ত নিজেই করেছেন। সাধারণ ঘটনাই একজন জাত কবির চোখে অসাধারণ হয়ে ধরা দেয়।
আর তার কবিতা? এখানেই মণীন্দ্র গুপ্ত সবচেয়ে বেশি অপ্রতিরোধ্য। ‘বিড়ালী’ কবিতাটার কথা মনে পড়ল, তিনি লিখেছেন— ‘বেড়ালটা সকাল থেকে কাঁদছে / কাল থেকে ওর বাচ্চাটা নিখোঁজ। / আমি রাতের বেলা রামকৃষ্ণ কথামৃত পাঠ করছিলাম, / সে শান্তির আশায় এসে দুই থাবা জোড় করে বসল। / কিন্তু হল না। / একটু পরেই সে মিউমিউ করে আবার কাঁদতে লাগল… / আর পুত্রশোক আগুনের মতো ঘিরে ধরল / রামকৃষ্ণদেবকে।”
খুব সাধারণ একটি দৃশ্য— সন্তানহারা এক বেড়ালের হাহাকার— মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছে যায় মহাজাগতিক ব্যাপ্তি নিয়ে পাঠকের সংবেদনের কাছে। যে রামকৃষ্ণ আলোর পথ দেখান, তিনিও নশ্বর জগতের যন্ত্রণার বাইরে নন। মণীন্দ্র গুপ্ত মনে করিয়ে দেন, প্রজ্ঞা মানে শোকের বিনাশ নয়, শোককে প্রজ্ঞার শিখায় চিনে নেওয়া।
‘বিধবা’ কবিতায় তিনি লেখেন: ‘তুলোর বালিশ অনেকদিন নেই, সোঁদালের ফুল রোদে শুকিয়ে / খোলে ভরে নিয়েছি। / সেই বালিশে শুয়ে দুপুরে তন্দ্রা মতো এল…’ অতি সাধারণ পর্যবেক্ষণে অসাধারণ সৌন্দর্য। সোঁদাল ফুলের বীজ জ্যান্ত হয়ে শিকড় চারিয়ে দেয় স্বপ্নের ভেতর। জ্যান্ত ও মরার এই সহাবস্থান কেবল গ্রামবাংলার লোকায়ত বিশ্বাসেই সম্ভব। কবিতার শেষে এসে বিধবা বলে ওঠেন: ‘স্বামীপুত খেয়ে বসে আছি। অনাথা বিধবা। জ্যান্ত মরা সবই খাই।’ এই নির্মম স্বীকৃতিতে যে শোক আর প্রজ্ঞা একাকার, তা মণীন্দ্র গুপ্ত ছাড়া ক’জন লিখতে পারেন?
‘আমার বাবা’ কবিতার সেই বিখ্যাত পঙক্তি: ‘আমার বাবা একদিন বসে ছিলেন সূর্যাস্তবেলায়, / তার কিছু করার ছিল না। / সেই দৃশ্য, সেই সন্ধ্যা থেকে / আমার উপর, উত্তরাধিকারসূত্রে, / সবচেয়ে নিরাশা চাপিয়ে রেখে গেছে।’ ‘বসে থাকা’ আর ‘কিছু করার ছিল না’— এই দুটি অতি সাধারণ অবস্থার মধ্য দিয়ে জীবনের এক বিশাল শূন্যতা উন্মোচিত হয়। ‘উত্তরাধিকার’ ও ‘নিরাশা’ শব্দ দুটির বৈপরীত্য বাবার অলস বসে থাকার দৃশ্যকে বংশগত অভিশাপের মতো পাঠকের মনে গেঁথে দেয়। এমন শবসংযমই মণীন্দ্র গুপ্তের মহাপৃথিবী।
‘নীল’ কবিতাটা পড়েছেন? তিনি লিখেছেন: ‘বৃদ্ধ কুকুরের চোখের মতো বিষাদগ্রস্ত হয়ে গেছে আমার পুংস্ত্ব / অবলুণ্ঠিত শরীর বহুদিন হল নীরব অপমানের কাছে আত্মসমর্পিত।’ এখানে কবি পুরুষত্বের ক্ষয় আর আত্মসমর্পণের নীরব যন্ত্রণাকে এমন এক বস্তুগত চিত্রে ধরেছেন, যা পড়লে শরীরের ভেতর দিয়ে একটা ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যায়। মণীন্দ্র গুপ্তের কবিতায় যৌনতা বা দেহচেতনা কখনোই সরাসরি উচ্চারিত হয় না— সেটা থাকে নীরব অপমানের মতো, যেনও ভেজা পাতার নিচে চাপা পড়া অস্তিত্বহীন কোনো অস্তিত্ব।
তিনি ২০১০ সালে রবীন্দ্র পুরস্কার আর ২০১১ সালে ‘বনে আজ কনচের্তো’ কাব্যগ্রন্থের জন্য সাহিত্য আকাদেমি লাভ করেন। কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘নীল পাথরের আকাশ’ (১৯৬৯), ‘মৌপোকাদের গ্রাম’, ‘লাল স্কুলবাড়ি’, ‘ছত্রপলাশ চৈত্যে দিনশেষে’, ‘শরৎমেঘ ও কাশফুলের বন্ধু’, ‘চাঁদের ওপিঠ’, ‘টুং টাং শব্দ নিঃশব্দ’। সম্পাদনা করেছেন ‘পরমা’ পত্রিকা। ৭০-এর দশকে কবি রঞ্জিত সিংহের সঙ্গে যৌথভাবে সম্পাদনা করেছেন ‘এক বছরের শ্রেষ্ঠ কবিতা’-র মতো সংকলন। হাজার বছরের বাংলা কবিতা ঘেঁটে সংকলন করেছেন তিন খণ্ডে ‘আবহমান বাংলা কবিতা’।
মণীন্দ্র গুপ্ত বলতে গেলে সাধারণ জীবনযাপনই করেছেন। তিনি অভাবনীয় প্রভাবশালী বা জনপ্রিয় কেউ ছিলেন না। তবুও তার আত্মজীবনীতে নিমগ্ন হয়ে যেতে হয় তার লেখার কারণে। ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি কলকাতায় তার প্রয়াণে আমরা হারিয়েছি বাংলা সাহিত্যের অখণ্ড চৈতন্য সত্তাকে। কিন্তু তিনি রেখে গেছেন ‘অক্ষয় মালবেরি’— যেখানে তার শৈশব, কৈশোর, তারুণ্য চিরকালের জন্য স্থির হয়ে আছে তুঁতফলের মতো সুন্দর হয়ে। রেখে গেছেন এমন কবিতা, যা পড়লে মনে হয় জীবনানন্দের কবিতা নতুন ফ্লেভারে পুনর্নির্মিত হয়েছে। রেখে গেছেন সেই দর্শন— সব হারিয়েও কীভাবে উলঙ্গ বসে চাঁদ দেখতে হয়।
একালের তরুণ কবিদের প্রতি আমার অনুরোধ থাকবে মণীন্দ্র গুপ্তকে পড়ার, অতিরিক্ত কথার ফুলঝুরি আর নাগরিক বিচ্ছিন্নতার মেকি প্রদর্শনের যুগে তিনি সত্যিই এক আশ্রয়। ‘অক্ষয় মালবেরি’ পড়া মানে স্পর্শ করা কিংবা গন্ধ শুঁকে নেওয়া— এক ফেলে আসা সময়ের, এক নির্মোহ জীবনের, এক অখণ্ড চৈতন্যের। একটা সময় এই পড়ে এত মুগ্ধ হয়েছিলাম যে এর পিডিএফ আমি জনে জনে ফেরি করে বেরিয়েছি। ‘অক্ষয় মালবেরি’ পড়ুন, ডুবে যান মণীন্দ্র গুপ্তের সেই মায়াময়, স্নিগ্ধ জগতে, যেখানে সাধারণ জীবনই হয়ে ওঠে অসাধারণ, যেখানে প্রত্যেকটা মুহূর্ত হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে পৃথিবীর রূপ-রস-গন্ধ-বর্ণের কোনো ভেদাভেদ থাকে না।
এমন নিজস্ব পৃথিবী কজনই বা তৈরি করতে পারেন!






