‘লুটিয়াল আগলিজ’ কী, এটি কীভাবে নারীদের প্রভাবিত করে?

ছবিটি এআই দিয়ে তৈরি
পিরিয়ড শুরুর কয়েক দিন আগে হঠাৎ করেই নিজেকে কম সুন্দর মনে করেন অনেক নারী। কারও ত্বক নিস্তেজ দেখায়, কারও মুখ ফুলে যায়, আবার কেউ ভোগেন ক্লান্তি ও মন খারাপের মতো সমস্যায়।
চিকিৎসকদের মতে, লুটিয়াল পর্যায়ে হরমোনের পরিবর্তনের কারণেই এমনটা ঘটে। সামাজিক মাধ্যমে আলোচিত এই অভিজ্ঞতাই এখন পরিচিত ‘লুটিয়াল আগলিজ’ নামে।
সামাজিক মাধ্যম টিকটকে এক ভিডিওতে ক্যামেরার সামনে এক নারী প্রশ্ন করেন, ‘শুধু কি আমারই এমন মনে হয়, নাকি পৃথিবীর সবচেয়ে কুৎসিত মানুষ আমিই?’ ভিডিওটি দেখা হয়েছে ২৪ লাখের বেশি বার। মন্তব্যে অসংখ্য নারী লিখেছেন, তারাও একই অনুভূতির মধ্য দিয়ে যান।
এখন টিকটকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে হাজার হাজার রয়েছে এ ধরনের ভিডিও। সেখানে নারীরা ‘লুটিয়াল আগলিজ’ নামে পরিচিত একটি অভিজ্ঞতার কথা বলছেন। পিরিয়ড শুরুর আগে শরীর ও চেহারায় যে পরিবর্তন আসে এবং যার কারণে অনেক নারী নিজেকে কম আকর্ষণীয় মনে করেন, সেটিকেই অনেকে এই নামে ডাকছেন।
লুটিয়াল ফেজ বা লুটিয়াল পর্যায় হলো পিরিয়ড চক্রের দ্বিতীয়ার্ধ। যখন শরীরে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে চেহারা, শরীর ও মেজাজে নানা পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। এটি ডিম্বস্ফোটনের পর শুরু হয় এবং পিরিয়ড শুরু হওয়ার মাধ্যমে শেষ হয়। এ সময় শরীরে ইস্ট্রোজেন হরমোনের মাত্রা অনেকটা কমে যায়।
চিকিৎসকদের মতে, এই হরমোনগত পরিবর্তনের কারণেই চেহারা, ত্বক, ঘুমসহ নানা পরিবর্তন দেখা দিতে পারে মানসিক অবস্থায়।
নারীস্বাস্থ্য ও হরমোন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ডা. লুইস নিউসন বলেছেন, ‘হরমোন আমাদের ত্বক ও কোলাজেনকে প্রভাবিত করে। তাই অনেকের ত্বক শুষ্ক হয়ে যায়, মুখের উজ্জ্বলতা কমে, ব্রণ দেখা দেয়। পাশাপাশি শরীরে পানি জমে ফোলাভাব তৈরি হতে পারে এবং স্তনের আকৃতিতেও পরিবর্তন আসে।’
ডা. নিউসনের মতে, নারীরা এখন এ নিয়ে আগের তুলনায় বেশি কথা বললেও অনেকেই জানেন না কীভাবে এসব উপসর্গ সামলাতে হবে। এসব নারী সত্যিই কষ্ট পান। এটি তাদের কাজ, সামাজিক জীবন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনকে প্রভাবিত করে।
তিনি আরও বলেছেন, অনেক সময় নারীদের সমস্যাকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এটিকে ‘স্বাভাবিক’ বা ‘শুধু পিএমএস’ বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়, যা ঠিক নয়।
২৫ বছর বয়সী এলেনা স্প্যাভেন জানান, পিরিয়ডের আগের সময়ে তার শরীর খুব বেশি ফেঁপে যায়। তার ভাষ্য, ‘আমার ত্বক নিস্তেজ লাগে, মুখ ক্লান্ত দেখায়। বুক ভারী ও ব্যথাযুক্ত অনুভূত হয়।’
এলেনা আরও বলেছেন, ‘এই সময় আমি খুব ক্লান্ত অনুভব করি এবং কোনো কাজেই আগ্রহ পাই না। মনে হয় আমার মস্তিষ্ক ধীরগতিতে কাজ করছে। আমি বেশি ভুলে যাই, অমনোযোগী হয়ে পড়ি এবং মানুষের সঙ্গে মিশতে ইচ্ছা করে না।’
জামিনে ফিরে ফের
০৪ আগস্ট ২০২৬
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের প্রজনন ও মলিকুলার জেনেটিকসের সহযোগী অধ্যাপক ডা. হেলেন ও’নিল জানান, পিরিয়ডের আগে ইস্ট্রোজেন কমে গেলে প্রোজেস্টেরনের প্রভাব বেড়ে যায়। এতে ত্বকে তেল উৎপাদন বাড়ে। একই সঙ্গে শরীরে বেশি তরল জমে থাকায় মুখ ফোলা দেখাতে পারে, পুরো শরীরে ফোলাভাব আসে এবং স্পর্শকাতর হয়ে পড়ে স্তন।
৩০ বছর বয়সী ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হেনরিয়েটা জানান, লুটিয়াল পর্যায়ে তিনি খুব সহজেই বিরক্ত হয়ে যান। তিনি বলেরছেন, ‘আমার শান্ত স্বভাবের সঙ্গীর ওপরও তখন অকারণে রাগ হয়। পরে বুঝতে পারি, হয়তো আমি লুটিয়াল পর্যায়ে আছি।’
বন্ধুদের সঙ্গেও তার আচরণ বদলে যায়। কখনো অতিরিক্ত ব্যক্তিগত কথা বলে ফেলেন, আবার কখনো সবার কাছ থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। পরে এ জন্য অনুশোচনা হয়।
হেনরিয়েটা জানান, এই সময় তিনি হতাশা, মানসিক অস্থিরতা এবং আত্মবিশ্বাসের অভাবে ভোগেন। অনেক পুরোনো বিব্রতকর স্মৃতি হঠাৎ মনে পড়ে যায়। কখনো ঝাপসা দেখা, কথোপকথনের সময় সাধারণ শব্দ মনে না পড়া কিংবা কাজে মনোযোগ ধরে রাখতে না পারার মতো সমস্যাও হয়।
তার মতে, এ বিষয়ে সচেতনতা এখনও খুব কম। পিরিয়ড শুরু হলে তিনি স্বস্তি অনুভব করেন।
৩৬ বছর বয়সী উদ্যোক্তা শার্লট ডডসও একই অভিজ্ঞতার কথা জানান। তিনি জানান, তার মুখে ব্রণ ওঠে, শরীর ফেঁপে যায় এবং মনোযোগ কমে যায়। নিজের ব্যবসা পরিচালনার সময় এসব পরিবর্তন তার আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দেয়। তবে তিনি বলেছেন, ‘আমি স্বনিযুক্ত। তাই শুধু হরমোনের পরিবর্তনের কারণে কাজ বন্ধ রাখা সম্ভব নয়।’
কীভাবে উপসর্গ কিছুটা কমানো যায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, লুটিয়াল পর্যায় সম্পর্কে সচেতন হওয়াই প্রথম পদক্ষেপ। এটি একটি স্বাভাবিক এবং সাময়িক শারীরবৃত্তীয় পর্যায়, যা সময়ের সঙ্গে শেষ হয়ে যায়। এ সময় কিছু অভ্যাস উপসর্গ কমাতে সহায়ক হতে পারে। যেমন—
• পুষ্টিকর খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত পানি পান করা
• অতিরিক্ত লবণ ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা
• নিয়মিত হালকা ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করা
• অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া, যাতে প্রদাহ না বাড়ে
• উপসর্গ খুব বেশি হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া
ডা. নিউসন বলেছেন, ‘যদি একাধিকবার চিকিৎসকের কাছে গিয়েও সন্তোষজনক সমাধান না পান, তাহলে অন্য বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। এসব উপসর্গ অনেক সময় নিজে থেকেই দূর হয় না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, লুটিয়াল পর্যায়ের পরিবর্তন বাস্তব এবং এটি অনেক নারীর দৈনন্দিন জীবন, কাজ ও মানসিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলে। তাই এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো এবং প্রয়োজনে চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
সূত্র: বিবিসি





