ডেঙ্গু নাকি মৌসুমি ভাইরাল জ্বর, বুঝবেন কীভাবে?

ছবি- এআই দিয়ে তৈরি
বর্ষাকাল যেমন গরম থেকে কিছুটা স্বস্তি আনে, তেমনি প্রতি বছর এই সময় বাড়তে থাকে জ্বর, সর্দি-কাশি ও বিভিন্ন সংক্রমণের প্রকোপ। জ্বর এলেই অনেকের মনে কাজ করে ডেঙ্গুর আতঙ্ক। প্লাটিলেট নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন কেউ, আবার শরীরের তাপমাত্রা সামান্য বাড়লেই গুরুতর অসুখের আশঙ্কা করতে শুরু করেন অনেকে।
কিন্তু বর্ষাকালে পরিবারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, হঠাৎ হওয়া জ্বরটি সাধারণ মৌসুমি ভাইরাল সংক্রমণ নাকি ডেঙ্গুর প্রাথমিক লক্ষণ, তা বোঝা। কারণ রোগ দুটির শুরুতে উপসর্গ প্রায় একই রকম দেখা যায়। বিশেষ করে প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় বৈশিষ্ট্য দেখে ধরনের পার্থক্য করা কঠিন। চিকিৎসকদের মতে, এই সময়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। উপসর্গ ভুলভাবে মূল্যায়ন করলে যেমন ডেঙ্গুর চিকিৎসায় দেরি হতে পারে, তেমনি অযথা আতঙ্কিত হয়ে অনেকে ছুটে যান হাসপাতালে।
এ কারণেই বিশেষজ্ঞরা গুরুত্ব দিচ্ছেন ‘৪৮ ঘণ্টার জ্বর’ রীতির ওপর।
প্রথম ৪৮ ঘণ্টা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
সাধারণ ঋতুভিত্তিক ভাইরাসজনিত সংক্রমণ হোক বা মশাবাহিত ডেঙ্গু ভাইরাস, কোনো জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলেই রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রথমে একই ধরনের প্রতিরক্ষা শুরু করে। এ সময় শরীরে পাইরোজেন নামের কিছু পদার্থ নিঃসৃত হয়, যা মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে জ্বরের সৃষ্টি করে।
সমস্যা হলো, এই প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া সব ধরনের সংক্রমণের ক্ষেত্রেই প্রায় একই রকম হয়। ফলে জ্বর শুরুর প্রথম দুই দিনে শুধু উপসর্গ দেখে এটি সাধারণ ভাইরাল জ্বর নাকি ডেঙ্গু, তা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন।
জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল ভাইরোলজিতে প্রকাশিত একটি গবেষণা পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, প্রথম ৪৮ ঘণ্টায় ডেঙ্গু জ্বরের উপসর্গ অনেক সময় সাধারণ ভাইরাসজনিত সংক্রমণের মতোই দেখায়। তাই ডেঙ্গুপ্রবণ এলাকায় এ সময় রোগীকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা বা প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করানো জরুরি।
তবে ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ার পর সাধারণ ভাইরাল জ্বর ও ডেঙ্গুর গতিপথ আলাদা হতে শুরু করে।
ভাইরাল জ্বর ও ডেঙ্গুর মধ্যে আসল পার্থক্য কোথায়?
সাধারণ ভাইরাল জ্বর সাধারণত বিশ্রাম, পর্যাপ্ত পানি পান ও সাধারণ চিকিৎসায় কয়েক দিনের মধ্যে সেরে যায়। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে প্রয়োজন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। কারণ হঠাৎ জটিল রূপ নিতে পারে এই জ্বর।
যদি ৪৮ ঘণ্টা পরও জ্বর উচ্চমাত্রায় থাকে এবং নিয়মিত প্যারাসিটামল সেবনের পরও না কমে, তাহলে দ্রুত রক্ত পরীক্ষা করানো উচিত।
উপসর্গ শুরুর প্রথম এক থেকে চার দিনের মধ্যে ডেঙ্গু এনএস১ অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করলে ভাইরাস শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। পাশাপাশি সিবিসি বা সম্পূর্ণ রক্ত পরীক্ষা করালে প্লাটিলেট ও রক্তের ঘনত্ব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
জ্বর কমে গেলেই কি বিপদ কেটে যায়?
অনেকেই মনে করেন জ্বর নেমে গেলে রোগ সেরে যাচ্ছে। কিন্তু ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে এটি সবসময় সত্য নয়।
চিকিৎসকদের মতে, ডেঙ্গুর সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময় অনেক ক্ষেত্রে শুরু হয় জ্বর কমে যাওয়ার পর। সাধারণত তৃতীয় থেকে পঞ্চম দিনের মধ্যে শরীরের রক্তনালি থেকে তরল বেরিয়ে যেতে পারে। ঘন হয়ে যেতে পারে রক্ত। প্লাটিলেট দ্রুত কমতে শুরু করতে পারে।
পিএলওএস নেগলেক্টেড ট্রপিক্যাল ডিজিজেসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ডেঙ্গুর গুরুতর জটিলতা যেমন শরীরে তরল জমা হওয়া বা অভ্যন্তরীণ রক্তক্ষরণ সাধারণত জ্বর কমে যাওয়ার পরের এই পর্যায়েই দেখা দেয়।
বাড়িতে কী করবেন?
জ্বর হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শুধু প্যারাসিটামল ব্যবহার করা উচিত। আইবুপ্রোফেন, অ্যাসপিরিন বা ডাইক্লোফেনাকের মতো প্রদাহনাশক ওষুধ এড়িয়ে চলতে হবে। কারণ এগুলো রক্ত পাতলা করে এবং ডেঙ্গু হলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
পর্যাপ্ত পানি পান করার পাশাপাশি ওরাল স্যালাইন, ডাবের পানি, লেবুর শরবত বা ইলেকট্রোলাইটসমৃদ্ধ তরল পান করা উপকারী।
হাসপাতালে যাবেন কখন?
১। বারবার বমি হলে
২। মাড়ি বা নাক দিয়ে রক্ত পড়তে শুরু করলে
৩। তীব্র পেটব্যথা শুরু হলে
৪। অস্বাভাবিক ঝিমুনি বা দুর্বলতা দেখা দিলে
৫। শ্বাসকষ্ট হলে
৬। হঠাৎ অত্যধিক ক্লান্তি হলে
আতঙ্ক নয়, প্রয়োজন সচেতনতা
বর্ষাকালে জ্বর মানেই ডেঙ্গু নয়। আবার সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে অবহেলা করাও ঠিক নয়। জ্বরের সময়কাল, উপসর্গের পরিবর্তন এবং শরীরের প্রতিক্রিয়া খেয়াল রাখা জরুরি।
চিকিৎসকদের মতে, ৪৮ ঘণ্টার নিয়ম মেনে চললে অনেক ক্ষেত্রেই ডেঙ্গু ও সাধারণ ভাইরাল জ্বরের মধ্যে প্রাথমিক পার্থক্য বোঝা সম্ভব হয়। তাই আতঙ্কিত না হয়ে প্রথম ৪৮ ঘণ্টা সতর্ক পর্যবেক্ষণে থাকুন। প্রয়োজন হলে পরীক্ষা করান এবং সময়মতো চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। এতে বর্ষার মৌসুমে জ্বর নিয়ে অযথা উদ্বেগ কমবে, আবার এড়ানো যাবে গুরুতর ঝুঁকিও।





