তারুণ্য ধরে রাখতে কী খাবেন

বলিরেখা বা চামড়ায় ভাঁজ দূর করতে প্রয়োজন যত্ন ও সঠিক খাদ্যাভ্যাস
আমাদের শরীরের সবচেয়ে বড় এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো ত্বক, যা জন্ম থেকে সারাজীবন আমাদের সঙ্গী হয়ে থাকে। একটি সুস্থ, মসৃণ ও সতেজ ত্বক কেবল দেখতেই সুন্দর নয়, বরং এটি আমাদের সার্বিক স্বাস্থ্য ভালো থাকারও একটি বড় প্রকাশ। তবে বাইরের পরিবেশের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত থাকার কারণে আমাদের ত্বককে প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়। এতদিন ধরে ভাবা হতো যে কেবল সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মিই ত্বকের ক্ষতির প্রধান কারণ। তবে আধুনিক গবেষণায় চর্মরোগ বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে এটি পুরোপুরি সঠিক নয়। সূর্যের দৃশ্যমান আলো, ইনফ্রারেড রেডিয়েশন, এমনকি পরিবেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও অতিরিক্ত বায়ুদূষণও আমাদের ত্বককে দ্রুত নষ্ট করে ফেলে। এর পাশাপাশি বয়স বাড়ার সাথে সাথে আমাদের শরীরে ‘কোলাজেন’ নামক বিশেষ প্রোটিনের পরিমাণ প্রাকৃতিকভাবেই কমতে থাকে। এই কোলাজেনই মূলত ত্বককে টানটান ও সুগঠিত রাখতে সাহায্য করে। তাই এটি কমে গেলে ত্বকে ঢিলেভাব আসে এবং বলিরেখা বা চামড়ায় ভাঁজ পড়তে শুরু করে। তবে আশার কথা হলো, সঠিক খাদ্যাভ্যাস বজায় রেখে আমরা ত্বকের এই বুড়িয়ে যাওয়া অনেকটাই ধীর করে দিতে পারি।
প্রথমত, ত্বককে ভেতরের পুষ্টি দিয়ে তরুণ রাখতে রঙিন ফলমূল ও শাকসবজির কোনো বিকল্প নেই। গাজর, ক্যাপসিকাম এবং টমেটোর মতো সবজিতে 'ক্যারোটিনয়েড' নামক এক ধরনের শক্তিশালী উপাদান থাকে, যার মধ্যে লুটিন, লাইকোপেন ও বিটা-ক্যারোটিন অন্তর্ভুক্ত। যখন আমরা নিয়মিত এসব রঙিন খাবার খাই, তখন এই উপকারী উপাদানগুলো আমাদের শরীরের চর্বি বা ফ্যাট টিস্যুতে জমা হয়। বিজ্ঞানীরা জানান, প্রতিদিন নিয়মিত ক্যারোটিনয়েড-সমৃদ্ধ খাবার খেলে তা আমাদের শরীরে সারা বছরের জন্য প্রাকৃতিকভাবে ২ থেকে ৩ মাত্রার একটি বেসলাইন সান প্রোটেকশন ও সুরক্ষা তৈরি করে দেয়। এর একটি সহজ উপায় হলো, টমেটো বা গাজর কাঁচা বা সালাদ হিসেবে খাওয়ার সময় সামান্য অলিভ অয়েল বা সরিষার তেলের মতো স্বাস্থ্যকর ফ্যাট মিশিয়ে নেওয়া, যা শরীরে এই উপাদানগুলো দ্রুত শোষণে সাহায্য করে। বিটা-ক্যারোটিন শরীরে গিয়ে ভিটামিন এ-তে রূপান্তরিত হয়, যা ত্বকের নতুন কোষ তৈরিতে এবং চামড়াকে স্থিতিস্থাপক রাখতে 'হায়ালুরোনিক অ্যাসিড' উৎপাদনে সাহায্য করে। তবে মনে রাখা দরকার, খাবার খাওয়া শুরু করার সাথে সাথেই রাতারাতি জাদু দেখা যাবে না; এসব খাবারের দৃশ্যমান ভালো ফলাফল ত্বকে ফুটে উঠতে অন্তত ৮ থেকে ১০ সপ্তাহ নিয়মিত খেয়ে যেতে হয়।
ফলমূলের মধ্যে আম এবং লেবুজাতীয় ফল ত্বকের যত্নে চমৎকার ভূমিকা পালন করে। আমে থাকা ক্যারোটিনয়েড ও অন্যান্য অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বয়সের ছাপ দূর করতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, বয়স্ক নারীরা নির্দিষ্ট মেয়াদে সপ্তাহে কয়েকদিন পরিমিত পরিমাণে (যেমন এক কাপ বা ৮৫ গ্রামের মতো) আম খাওয়ার ফলে তাদের মুখের বিদ্যমান বলিরেখা কমেছে এবং নতুন করে ভাঁজ পড়া রোধ হয়েছে। আম ও লেবুতে থাকা প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন সি সরাসরি কোলাজেন তৈরিতে সাহায্য করে, ত্বকের ভেতরের পানির ভারসাম্য বজায় রাখে এবং মেছতা বা কালো দাগ দূর করে। তবে আমের ক্ষেত্রে একটি বিষয় সতর্ক থাকা প্রয়োজন–অতিরিক্ত আম খেলে এতে থাকা প্রাকৃতিক চিনির কারণে উল্টো ত্বকের ক্ষতি হতে পারে এবং বলিরেখা বেড়ে যেতে পারে। তাই আম খেতে হবে পরিমিত পরিমাণে।
দ্বিতীয়ত, ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা ধরে রাখতে এবং ত্বককে নরম রাখতে স্বাস্থ্যকর ফ্যাট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় কাঠবাদাম, পেস্তাবাদাম, চিনা বাদাম এবং বিভিন্ন ধরনের বীজ রাখা উচিত। বাদামে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন ই এবং ওমেগা-৬ ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। ভিটামিন ই ত্বককে ভেতর থেকে শুষ্ক হতে দেয় না এবং যেকোনো ক্ষতের নিরাময় দ্রুত করতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, একটানা কয়েক সপ্তাহ নিয়মিত কাঠবাদাম খেলে ত্বকের সূক্ষ্ম বলিরেখা অনেকাংশে কমে আসে। অন্যদিকে সামুদ্রিক তৈলাক্ত মাছ, যেমন–স্যামন, সার্ডিন বা ম্যাকারেল থেকে আমরা পাই ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড। এটি ত্বকের অতিরিক্ত সংবেদনশীলতা কমায়, রোদ লেগে ত্বক লাল হয়ে যাওয়া বা জ্বালাপোড়া করা থেকে রক্ষা করে এবং ত্বকের ভেতরের প্রদাহ বা ফোলাভাব দূর করতে সাহায্য করে।
তৃতীয়ত, আমাদের ত্বকের সৌন্দর্য বহুলাংশে নির্ভর করে আমাদের পেটের বা অন্ত্রের স্বাস্থ্যের ওপর। বিজ্ঞানীরা একে বলেন 'গাট-স্কিন এক্সিস' বা পেট ও ত্বকের মধ্যকার নিবিড় সম্পর্ক। আমরা যখন বৈচিত্র্যময় শাকসবজি, ফলমূল ও বাদাম খাই, তখন আমাদের পেটে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলো পুষ্টি পায়। এছাড়াও ফারমেন্টেড বা গাজানো খাবার, যেমন–টক দই খেলে পেটের ভালো ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা অনেক বৃদ্ধি পায়। পেট ভেতর থেকে পরিষ্কার ও সুস্থ থাকলে তা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়, মানসিক চাপ কমায়, ঘুম ভালো করে এবং ফলস্বরূপ সোরাইসিস বা অ্যালার্জির মতো জটিল চর্মরোগের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়।
তবে, কেবল খাবার খেয়ে ষাট বছর বয়সে ত্রিশ বছরের তরুণ রূপ ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়, সঠিক পুষ্টি সচেতনতা আমাদের ত্বককে দীর্ঘদিন সুস্থ, সুন্দর, সতেজ ও লাবণ্যময় রাখতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে। প্রতিদিনের খাবারে রঙিন সবজি, পরিমিত ফল, বাদাম, তৈলাক্ত মাছ ও টক দই রাখার পাশাপাশি দিনের বেলা ঘরের বাইরে বের হওয়ার সময় নিয়ম করে ভালো সানস্ক্রিন ব্যবহার করা অত্যন্ত প্রয়োজন।
সূত্রঃ বিবিসি






