আর্দ্র আবহাওয়ায় চুলের ফ্রিজি ভাব নিয়ন্ত্রণ করবেন যেভাবে

ফ্রিজি ভাব কমাতে দামি প্রসাধনীই একমাত্র সমাধান নয়; চুল পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে শুকানো ও সাজানোর পদ্ধতিতেও আনতে হবে কিছু পরিবর্তন; ছবি: এআই
যত্ন করে চুল আঁচড়ানো, প্রয়োজনমতো সিরাম লাগানো সবই যেন বৃথা হয়ে যায় আর্দ্র আবহাওয়ায়। কিছুক্ষণ পরই চুল হয়ে ওঠে এলোমেলো, রুক্ষ ও ফুলে থাকে। বিশেষ করে বর্ষা কিংবা বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে এই সমস্যা আরও প্রকট হয়। চুলের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ধরে রাখতে তখন প্রয়োজন বাড়তি যত্নের। তবে ফ্রিজি ভাব কমাতে দামি প্রসাধনীই একমাত্র সমাধান নয়; চুল পরিষ্কার করা থেকে শুরু করে শুকানো ও সাজানোর পদ্ধতিতেও আনতে হবে কিছু পরিবর্তন।
আর্দ্রতায় চুল ফুলে ওঠে কেন?
চুলের বাইরের স্তরকে বলা হয় কিউটিকল। এই স্তর চুলের ভেতরের অংশকে সুরক্ষা দেয়। বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে চুলের গঠন অনুযায়ী তা বাতাস থেকে জলীয় বাষ্প শোষণ করতে পারে। এতে চুলের গোছার গঠন ও বিন্যাসে পরিবর্তন আসে। ফলে চুল ফুলে ওঠে, এলোমেলো দেখায় এবং ফ্রিজি ভাব তৈরি হয়। কোঁকড়া, ঢেউখেলানো, শুষ্ক ও রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তিত চুলে এ সমস্যা বেশি চোখে পড়তে পারে। চুলের স্বাভাবিক আর্দ্রতা বজায় রাখা এবং ঘর্ষণ কমানো ফ্রিজি ভাব নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ উপায়।
শ্যাম্পু বাছাইয়ে সতর্কতা
চুল পরিষ্কার রাখতে শ্যাম্পু জরুরি হলেও অতিরিক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার কিংবা চুলের ধরন অনুযায়ী উপযুক্ত পণ্য বেছে না নিলে চুল আরও শুষ্ক হয়ে যেতে পারে। তাই মাথার ত্বকের প্রয়োজন অনুযায়ী মৃদু শ্যাম্পু ব্যবহার করা ভালো। মাথার ত্বক তৈলাক্ত হলে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। অন্যদিকে চুলের দৈর্ঘ্য ও আগা অতিরিক্ত শুষ্ক হলে সেগুলোতে ঘন ঘন শ্যাম্পু প্রয়োগ না করাই ভালো। শ্যাম্পু করার সময় মূলত মাথার ত্বক পরিষ্কার করতে হবে। চুলের দৈর্ঘ্যে জোরে ঘষাঘষি না করে পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে। শ্যাম্পুর পর কন্ডিশনার ব্যবহার করলে চুলের জট কমে, নরম থাকে এবং আঁচড়ানোর সময় ভেঙে যাওয়ার আশঙ্কা কমে।
কন্ডিশনার ও সিরাম কতটা কার্যকর?
ফ্রিজি ভাব নিয়ন্ত্রণে কন্ডিশনার বেশ কার্যকর। এটি চুলের বাইরের স্তর মসৃণ রাখতে সাহায্য করে। চুলের মাঝের অংশ থেকে আগা পর্যন্ত কন্ডিশনার লাগানো যেতে পারে। মাথার ত্বকে অতিরিক্ত কন্ডিশনার ব্যবহার না করাই ভালো, বিশেষ করে মাথার ত্বক তৈলাক্ত হলে। চুল ধোয়ার পর প্রয়োজন
অনুযায়ী লিভ-ইন কন্ডিশনার বা অল্প পরিমাণ অ্যান্টি-ফ্রিজ সিরাম ব্যবহার করা যায়। এসব পণ্য চুলের ওপর একটি মসৃণ আবরণ তৈরি করে আর্দ্রতার প্রভাব ও ঘর্ষণ কমাতে সাহায্য করতে পারে। তবে সব পণ্য সবার চুলে একইভাবে কাজ করে না। পাতলা চুলে ভারী তেল বা সিরাম বেশি
ব্যবহার করলে চুল চিটচিটে দেখাতে পারে। তাই অল্প পরিমাণ দিয়ে শুরু করাই ভালো।
ভেজা চুল শুকানোর সঠিক পদ্ধতি
চুল ভেজা অবস্থায় তুলনামূলক বেশি নাজুক থাকে। এ সময় তোয়ালে দিয়ে জোরে ঘষলে চুলের বাইরের স্তরে ঘর্ষণ বাড়ে এবং চুল ভেঙে যাওয়া বা ফ্রিজি ভাব বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই সাধারণ তোয়ালের বদলে নরম মাইক্রোফাইবার তোয়ালে বা পরিষ্কার সুতির কাপড় দিয়ে আলতোভাবে পানি শুষে নেওয়া ভালো। চুল শুকানোর সময় সম্ভব হলে স্বাভাবিকভাবে শুকাতে দেওয়া যায়। হেয়ার ড্রায়ার ব্যবহার করলে কম তাপমাত্রা বেছে নেওয়া এবং তাপ থেকে সুরক্ষা দেয় এমন পণ্য ব্যবহার করা উচিত। অতিরিক্ত তাপ চুলকে শুষ্ক ও ভঙ্গুর করে তুলতে পারে।
বারবার চুল আঁচড়ানো নয়
আর্দ্র আবহাওয়ায় চুল শুকিয়ে যাওয়ার পর বারবার আঁচড়ালে, বিশেষ করে ঢেউখেলানো বা কোঁকড়া চুলে, ফ্রিজি ভাব আরও বেড়ে যেতে পারে। চুলের ধরন অনুযায়ী চওড়া দাঁতের চিরুনি ব্যবহার করা ভালো। কোঁকড়া চুল ভেজা অবস্থায় কন্ডিশনার লাগানো থাকলে আলতোভাবে জট ছাড়ানো যেতে পারে। চুলে বারবার হাত দেওয়া, শক্ত করে বেঁধে রাখা কিংবা রুক্ষ কাপড়ের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘর্ষণও এড়িয়ে চলা উচিত। ঘুমানোর সময় মসৃণ কাপড়ের বালিশের কভার ব্যবহার করলে চুলের ঘর্ষণ কিছুটা কমতে পারে।
ঘরোয়া যত্নে কী করা যায়?
চুলের ফ্রিজি ভাব কমাতে নিয়মিত পরিচর্যার বিকল্প নেই। তবে সব ঘরোয়া উপাদান সবার চুলের জন্য উপযোগী নয়। অতিরিক্ত লেবুর রস, বেকিং সোডা বা অপরীক্ষিত মিশ্রণ চুল ও মাথার ত্বকে ব্যবহার করলে শুষ্কতা কিংবা জ্বালাপোড়া তৈরি হতে পারে। তাই এসব উপাদান ব্যবহার না করাই নিরাপদ।
চুলে তেল ব্যবহার করলে তা চুলের শুষ্কতা ও ঘর্ষণ কমাতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু তেল বাতাসের আর্দ্রতা পুরোপুরি ঠেকাতে পারে না। চুলের ধরন অনুযায়ী অল্প পরিমাণ তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। মাথার ত্বকেচুলকানি, লালচে ভাব বা খুশকির সমস্যা থাকলে অতিরিক্ত তেল ব্যবহার না করে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
বাইরে যাওয়ার আগে ছোট্ট প্রস্তুতি
আর্দ্র আবহাওয়ায় বাইরে বের হওয়ার আগে চুলের ধরন অনুযায়ী অল্প লিভ-ইন কন্ডিশনার বা অ্যান্টি-ফ্রিজ সিরাম ব্যবহার করা যেতে পারে। বৃষ্টিতে ভিজে গেলে সুযোগমতো চুল পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুয়ে নেওয়া এবং আলতোভাবে শুকিয়ে নেওয়া ভালো। চুলে জট তৈরি হলে জোরে টানাটানি না করে ধীরে ধীরে ছাড়াতে হবে। মনে রাখতে হবে, আর্দ্র আবহাওয়ায় চুলের স্বাভাবিক গঠন পুরোপুরি অপরিবর্তিত রাখা সব সময় সম্ভব নয়। তবে সঠিক শ্যাম্পু, কন্ডিশনার, কোমলভাবে চুল শুকানো এবং অতিরিক্ত তাপ এড়িয়ে চলার মতো অভ্যাস ফ্রিজি ভাব অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে। চুলের ধরন বুঝে নিয়মিত যত্নই এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর উপায়।



