লম্বু খালের রোমাঞ্চ পেরিয়ে ম্রোপাড়ায়

রুইতনপাড়ার জুমঘরে কয়েকটি ম্রো শিশু। ছবি: লেখক
পাহাড়ের বুক চিরে কুয়াশাচ্ছন্ন সবুজের মাঝে এক মায়াবী পাড়া— রুইতন। বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার ৪ নম্বর কুরুপপাতা ইউনিয়নের নির্জন এক পাহাড়ি কোলে যার অবস্থান। এখানে পৌঁছানোর জন্য বেশ কয়েকটি পথ থাকলেও সবচেয়ে রোমাঞ্চকরটি হলো লম্বু খাল ধরে এগিয়ে যাওয়া। অভিযাত্রার শুরুটা হয় আলীকদমের আমতলী ঘাট থেকে। সেখান থেকে নৌকায় চেপে দোল খেতে খেতে পৌঁছাতে হয় দলুঝিরি। সেখান থেকেই শুরু হয় মূল হাঁটা পথ। পথে পাহাড়ি জীবনের চিরচেনা রূপ নিয়ে ভেসে ওঠে তিনটি ভিন্ন পাড়ার মুখ। তবে এই ভ্রমণের আসল রোমাঞ্চ অপেক্ষা করে লম্বু খালে।
সংকীর্ণ এই খাল যতটা সুন্দর, ততটাই ভয়ংকর। পুরো পথের বেশিরভাগই খালের জল মেপে এগোতে হয়। কিছু জায়গায় বুকসমান পানি ভেঙে পথ চলতে হয়। ভরা বর্ষায় পাহাড়ি ঢলে হঠাৎ করেই খালের পানি ফুঁসে ওঠে। খালের দুই পাশে সোজা খাড়া পাহাড়, কোনোমতে উঠে দাঁড়ানোর কিংবা আশ্রয় নেওয়ার মতো তিল পরিমাণ জায়গা নেই।
গত বর্ষার এক দিনে বিপাকে পড়তে হয়েছিল লম্বু খালে। ঢলে ফুঁসে ওঠা খালের পাশে চুপচাপ বসে পানির তীব্রতা কমার প্রহর গুনছিলাম। পানি কিছুটা শান্ত হতেই মনে ভয়ে ভয়ে আবার নামলাম খালে। সূর্য ডুবতে বসেছে, নামছে আঁধার। খালের জল পেরিয়ে দ্রুত পৌঁছাতে হবে পাড়ায়, নইলে আঁধারে পথ হারিয়ে তলিয়ে যাওয়ার ভয়। কোনোমতে শরীর ভিজিয়ে, ধুঁকতে ধুঁকতে চলে এলাম খালের শেষ প্রান্তে। সেখানে জল জমে থাকা এক অপরূপ কুম বা জলাধারে গোসল সেরে পাহাড়ের খাড়া ঢাল বেয়ে উঠতে লাগলাম রুইতনপাড়ার দিকে।
পাড়ার একদম কোল ঘেঁষেই খালের অবস্থান। পাহাড়ের এই ম্রোপাড়াটির মূল পানির উৎস এই লম্বু খালই। খাবারের পানি নেওয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন কাজ— পানির জন্য নেমে আসতে হয় পাড়ার বেশ অনেকটা নিচে, এই খালের তলদেশে।
২৫ থেকে ৩০টি বাঁশ ও ছনের তৈরি ঘর নিয়ে গড়ে উঠেছে রুইতনপাড়া
ম্রোদের রাত যেন খালের সঙ্গে বাঁধা। রাতের অন্ধকারে দাদাদের সঙ্গে টর্চের আলো জ্বেলে খালে নেমে পড়ার অভিজ্ঞতা দুর্দান্ত। সেই আলোয় স্বচ্ছ পানিতে ধরা পড়ে প্রচুর প্রাকৃতিক চিংড়ি ও কাঁকড়া।
২৫ থেকে ৩০টি বাঁশ ও ছনের তৈরি ঘর নিয়ে গড়ে উঠেছে এই প্রাচীন রুইতনপাড়া। বহুদূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন থরে থরে সাজানো পুতুলঘর! পাড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বেশ পুরনো সব ফলগাছ দেখলেই বোঝা যায়, বহু প্রজন্ম ধরে এখানে মানুষ বসবাস করছে। এই পাড়ার প্রতিটি পরিবারই বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। পাড়ায় পা রাখার পর সোজা গন্তব্য থাকে আমার প্রিয় বন্ধুর ঘর।
পাহাড়ি জীবনের সকাল শুরু হয় মোরগের ডাকে। ভোরের আলো ফোটার আগেই নারীদের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যায়। ঘুম থেকে উঠেই তারা পাহাড় ভেঙে নিচে নেমে যান পানি তুলতে। সেখান থেকে ফিরে ঝটপট রান্না ও সকালের খাবার শেষ করে পিঠে থ্রোং (পাহাড়ি ঝুড়ি) বেঁধে দলবেঁধে রওনা হন জুমের পথে।
আমিও বাদ যাইনি। সকালে পেট পুরে খাবার খেয়ে দাদাদের সঙ্গে রওনা হলাম জুমের উদ্দেশে। দুপুরের খাবারের জন্য প্রত্যেকেই মুড়ে নিয়েছি কলাপাতায় রাখা ভাত। পাড়া থেকে কিছুটা দূরের সেই জুমে পৌঁছে দেখি জুমঘর তৈরি হয়ে গেছে। ফসল ঘরে তোলার আগের দিনগুলো পর্যন্ত মানুষ এই জুমে অবস্থান করবে। সারা দিন জুমের হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে সন্ধ্যায় আবার পাড়ায় ফিরে আসা। এরপর খালের ঠান্ডা জলে গোসল সেরে তৃপ্তির সঙ্গে সান্ধ্যকালীন খাবার গ্রহণ। পাহাড়ের মানুষ সাধারণত সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে রাতের খাবার সেরে নেয়।
আধুনিকতার ছোঁয়া এখনো এই পাড়াকে স্পর্শ করেনি। নেই ধান মাড়াইয়ের কোনো আধুনিক মেশিন। তারা কাঠ বা গাছের গুঁড়ি খোদাই করে গর্ত বানিয়ে এবং কাঠের তৈরি বিশেষ ঢেঁকির সাহায্যে হাতেই ধান মাড়াই করেন। শিশুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য রয়েছে ছোট্ট একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রয়োজনীয় বাজারসদাই আর জুমের কষ্টার্জিত ফসল বিক্রি করতে তারা হেঁটে চলে যান কুরুপপাতা বাজারে। কেউ কেউ জুম চাষের পাশাপাশি গরু ও গয়াল পালেন।
যেভাবে যাবেন: প্রথমে বাসে ঢাকা থেকে যেতে হবে আলীকদম উপজেলায়। তারপর অটোরিকশায় পৌঁছাবেন আমতলী ঘাটে। সেখান থেকে নৌকায় এবং হেঁটে রুইতনপাড়ায়।




