দুই চাকায় মালয়েশিয়া ১০
নেনাসি টু মার্সিং- ১০৬ কিলোমিটার

নেনাসি-মার্সিং- ১০৬ কিলোমিটার রাস্তা পেরিয়ে হোমস্টে
থাইল্যান্ড সীমান্ত ঘেঁষা পাদাং বেসার থেকে তিতিওয়াংসা পর্বতমালা ও কোটা বাহরু হয়ে জোহর বাহরু—দুই চাকায় ১২০০ কিলোমিটার পাড়ি দিচ্ছেন এভারেস্টজয়ী বাবর আলী। তার প্রতিদিনের ভ্রমণগল্প দুই চাকায় মালয়েশিয়া।
নিকটের বাড়িগুলো থেকে মালয় ভাষার কিচিরমিচির শুনছি বিছানায় শুয়ে শুয়ে। একটু বাদেই অতি আগ্রহ নিয়ে চ্যালেট-এর বারান্দায় গিয়ে বসলাম। সকাল হতে দেখাটা আমার সব সময়ের পছন্দের কাজ। পুরোদিনের দৌড়ঝাঁপে নামার আগে নিজের সাথে কিছুটা সময় সুস্থির অবস্থায় পাওয়া যায়। সকালে দৌড়াতে বা হাঁটতে বেরোনোর অনেক উপকারী দিক থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে এই নিজের সাথে সময় কাটানোটাই আমার পছন্দের। এর লোভেই বিছানানন্দ ছেড়ে বেরোই সকালে।
চ্যালেট-এর বারান্দায় বসে আশেপাশের বাড়ির কচিকাঁচাদের দেখছি; নানান বিষয়ে খুনশুটি চলছে ওদের। এসব দেখে চকিতে ছোটবেলায় ফেরত গেলাম। ছোটবেলার কথা আজকাল মনেই পড়ে না। কালেভদ্রে মনে পড়লে ধন্দ লাগে। আসলেই কিছু বছর আগে আমার ছোটবেলা ছিল নাকি সেসব গতজন্মের স্মৃতি? স্মৃতি বিচরণ করতে আমার ভালোই লাগে। কিন্তু বর্তমানের চাপে পিষ্ট হয়ে সব কেমন যেন ধোঁয়াশার মতো লাগে এখন।
আটটা পঁচিশ নাগাদ সাইকেলে। অল্প এগিয়েই সুংগাই বেবার নদী। ের দুপাশে বেশ ঘন বন।
আজকের পথটা সরল বিস্তৃতির নয়। কিছুদূর পর পর মোহনীয় সব মোচড়। বাঁক ঘুরলেই বন আরেকটু কাছের হয়ে ধরা দেয়। চলতি পথে অচেনা অনেকেই হর্ন দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে হাত নাড়ায়। এই জীবনে তাদের সাথে আর দেখা হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ। কিন্তু একটা ভালোলাগার বিনিময় হয়। সমুদ্র থেকে পথ ভুলে লোকালয়ে ঢুকে পড়া খালগুলো বেশ মনোমুগ্ধকর। শ্বাসমূল উঁচিয়ে রাখা গাছ দেখতে দেখতে প্যাডেলে চাপ বাড়ে। চলতি পথে ছোটখাট ক্যাম্পুং পড়ছে। বাসিন্দারা বাড়ির সামনের উঠোনে অলকানন্দা বা রঙ্গন লাগিয়ে নিজেদের সুরুচির ছাপ রেখেছে।
আর মাঝে মাঝেই চোখে পড়ছে শস্য সংরক্ষণের উঁচু সব সাইলো। উল্টোদিক থেকে অনেকগুলো বোঝাই ট্রাক একে একে অতিক্রম করে গেল। অল্প এগোতেই বসতি হয়ে গেল অতি পাতলা। অনেকক্ষণ বাদে বাদে একটা-দুটো বাড়ি দেখা যায়।
পথে পড়ল সেকোলাহ মারচং জায়া; মালয়রা স্কুলকে বলে সেকোলাহ। মালয় ভাষা, যা অফিশিয়ালি বাহাসা মেলায়ু নামে পরিচিত, সেটির আলাদা জাবি লিপি থাকলেও বর্তমানে লেখা হয় রোমান লিপিতে। ইংরেজি, জার্মান বা অন্যান্য জনপ্রিয় ভাষাগুলোর মতো মালয় ভাষা রোমান বা লাতিন লিপিতে লেখা হয় বলে রাস্তার ধারের সাইনবোর্ড বা রেস্তোরাঁর মেনু পড়তে খুব বেশি বেগ পেতে হয় না। কিছুটা এগিয়ে বিশাল এক উদাং বা চিংড়ির হ্যাচারি। মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলে এসেই উদাং শব্দটা শিখে নিয়েছি আমি। এদিকের খাবারে চিংড়ির গুঁড়ো ব্যবহারের প্রবণতা বেশি। কোভিডের ৩য় টিকা দেবার পর থেকে চিংড়ি বা কাঁকড়ার মতো খোলসওয়ালা মাছে আমার অ্যালার্জি। বাঁচার তাগিদেই শব্দটা শিখে নিতে হয়েছে। গোলপাতায় ছাওয়া পাড়ের সুংগাই মেরচুং নদী থেকে কিছুটা এগিয়ে ক্যাম্পুং মারচাং। পথে প্রচুর বানর। অনেকেই সবাইকে কাঁচকলা দেখিয়ে হেলেদুলে রাস্তা পার হয়। আরো কিছুক্ষণ প্যাডেল মেরে এশিয়ার সেইলফিশের রাজধানীখ্যাত রম্পিন জেলায় পা রাখলাম। এটি অবশ্য MD2 আনারসের জন্যও প্রসিদ্ধ। টানা চালিয়ে ক্যাম্পুং চনডং এর কাছে মসজিদ আল ইমান-এ থামা। এই মসজিদের স্থাপত্যশৈলী অন্য মসজিদগুলোর থেকে বেশ আলাদা। কাঠের ভিতের উপর মাটি থেকে বেশ উঁচুতে অবস্থান এই মসজিদের। মালয়েশিয়ায় আমার দেখা প্রথম মসজিদ, যেটাতে কোন গম্বুজ বা মিনার নেই। তবে এই মসজিদ সংলগ্ন একটা পড়ার স্থান আর ডাইনিং হল আছে। বেশ কয়েকজন নারী-পুরুষ বসে নানান কিছু পড়ছেন। এখানের ওয়াটার স্টেশনে ঠান্ডা এবং গরম পানি ছাড়াও অ্যালকালাইন পানির ব্যবস্থাও আছে। ভরপেট পানি পান করে ফের সাইকেলে। কিছুটা এগিয়েই বিশাল এক চিংড়ির ভাষ্কর্য। ১১টা নাগাদ পৌঁছে গেলাম রম্পিন। মূল শহর বাইপাস করে সুংগাই পনটিয়ান নদী পেরিয়ে ছোট্ট একটা পথপার্শ্বের দোকানে থামলাম। ততক্ষণে ঘড়ির কাঁটায় এগারোটা পেরিয়ে গেছে। পাউ, কলা আর নারকেল দিয়ে বানানো কলাপাতায় মোড়ানো পিঠা দিয়ে সারা হলো সকালের নাশতা। খেতে বেশ লাগল। অবশ্য অনেকে বলে আমার নাকি অতি সামান্য জিনিসও অসামান্য লাগে। আমার কাছে অবশ্য দোষের কিছু মনে হয় না ব্যাপারটা। আবার সাইকেলে চড়ে বসা। রাস্তার ধারের গাছে অসংখ্য আলোকলতা। এদের খুব আরাম। মূলের ঝামেলা নেই, কিন্তু সুন্দর গাছে গাছে বিচরণ করে। হাওয়ায় ভেসে ছড়িয়ে পড়ে দূরে, আরো দূরে। দুই-তিনটা ক্যাম্পুং পড়ল পথে। এরপরে শুরু হলো । একটা নাগাদ পথে পড়ল এন্ডাউ নদী। নদীর ওপারের শহরের নামও নদীর নামেই। এখান থেকেই আমাদের এই পথরেখার শেষ প্রদেশ এর শুরু। আরব বণিকদের দেওয়া এই নামের অর্থ মূল্যবান রত্ন। সত্যিকার অর্থেই জোহর মালয়েশিয়ান অর্থনীতির জহরত। এন্ডাউ ছাড়াতেই রাস্তায় প্রচুর পরিমাণে সরীসৃপের মৃতদেহ। গুইসাপ, সাপ, গিরগিটি ইত্যাদি প্রাণী চাকার নিচে পিষ্ট হয়ে পড়ে আছে পথের পাশে। একটা গুইসাপ দেখলাম মোটামুটি কুমিরের সাইজের! দুপুর থেকে সূর্য যেন তেতে উঠেছে; তীব্র গরম। আমি নিশ্চিত মালয়েশিয়ার লোকেরা কেউ নরকে গেলে ওখানে বসে কাঁপতেও পারে! এ বিষয়ে একটা পুরোনো কৌতুক মনে পড়ে গেল। পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের মুলতান বিখ্যাত এর ভয়াবহ গরমের কারণে। মুলতানে ৪৫-৫০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা নৈমিত্তিক ঘটনা। মুলতানের এক লোককে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল তাপমাত্রা যখন ৪৫ ডিগ্রিতে উঠে, তখন তোমরা কী করো? লোকটি ঝটপট উত্তর দিলো, 'আমরা তখন এসির সামনে বসি।' প্রশ্নকর্তা ফের জানতে চাইলেন, 'তাহলে তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রিতে গেলে কী করো?' -তখন আমরা এসিটা চালু করে দিই!হঠাৎ করে শুরু হলো আপহিল। জায়গার নাম ফেল্ডা এন্ডাউ৷ মালয়েশিয়ার ফেডারেল ল্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি-কে ফেল্ডা বলা হয়। এই সংস্থা দরিদ্র কিন্তু শারীরিকভাবে সক্ষম মালয়দেরকে জমির জোগান দেয়। এসব জমিতে মূলত পাম আর রাবার করে নিজেদের আর্থিক অবস্থার আমূল পরিবর্তন করতে পারে মালয়রা। একে গলদঘর্ম হয়ে চড়াই ভাঙছি তার উপর একদম হঠাৎ করেই শুরু হলো ঝুম বৃষ্টি। এজন্যই লোকে বলে, খোঁড়ার পা-ই গর্তে পড়ে! অন্যদিন বৃষ্টি আসার আগে জানান দেয়, সতর্ক করে; রাস্তার লোকেদের সরে যাওয়ার সুযোগ দেয়। আজ এসবের কিছুই হলো না। একেবারে গামলা-ঢালা বর্ষণ যাকে বলে! দুই মিনিটেই পুরো গা ভিজে চপ চপ করতে শুরু করেছে। জুতার অবস্থা শোচনীয়। মিনিট কুড়ি পর বৃষ্টি ধরে আসতেই এক জায়গায় থেমে জুতা থেকে একগাদা পানি বের করে নিলাম। একের পর এক । খানিকটা কষ্টই হচ্ছে। এই আপহিল-ডাউনহিলের ব্যাপারটা আমাদের ধর্তব্যের মধ্যে ছিল না। এখন সিলেবাসের বাইরে আসা প্রশ্নের মতো মনে হচ্ছে ব্যাপারটাকে। দুপাশে এখন বেশ ঘন বন। মাঝে মাঝে প্রমাণ সাইজের কিছু বানর দেখা যাচ্ছে। আজকে শাখামৃগের দল শাখায় না ঝুলে রাস্তাতে চলে আসছে বেশি। প্যাডেল মেরেই যাচ্ছি; কে যেন এক অদৃশ্য দড়ি বেঁধে দিয়ে বলেছে, 'চলতে থাক! চলতে থাক!' চলতে আমার খারাপ লাগে না। পথে চলার লোভেই আসা। লম্বা পথে চলার ক্লান্তি থাকবেই। তবে সেটা সারতেও বেশি সময় লাগবে না। চলতে থাকলে পথ একসময় না একসময় ফুরোবেই। রাস্তার পাশে ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকা নিশ্চল বাড়িঘর হতে চাইনি কখনো। মা বলে আমার মাথায় নাকি অনেক পোকা। এজন্যই এসব পাহাড় চড়া, লম্বা হাঁটা বা সাইকেল চালানোর কুবুদ্ধি মাথা থেকে বেরোয়। আমার কাছে জীবন মানে জগতের দিকে কৌতূহলী চোখে তাকানো। সে লোভেই আসা। নইলে এসব কাজের কোন জাগতিক মূল্য নেই। তথাকথিত ভ্যালিড কোন কারণও নেই। নিজের আনন্দের তাগিদেই আসা। রবি কবির ভাষায়- 'শিখর হইতে শিখরে ছুটিব, ভূধর হইতে ভূধরে লুটিব।' এই করেই জীবন যদি যায়, যাক না!চড়াই-উতরাই পর্ব শেষে পৌঁছালাম টেংলু। জুমন ভাই খিদেয় কাহিল। এক মহিলা দাতো (গোত্র-প্রধান) এর দোকানে গুছিয়ে বসলাম। জুমন ভাই নাসি আইয়াম (ভাত-মুরগি) নিল। আমি স্যান্ডউইচের দিকে হাত বাড়ালাম। ভাতের খিদে নেই আমার। আমার পাত দেখেই জুমন ভাই ফের বলে বসল, 'তোর জন্ম হওয়া উচিত ছিল ইউরোপে। ভুলে বাংলাদেশে জন্মাইছিস। ভাত পাইলে কেউ এসব খায়?' আমি ভাত না খেলেই উনি এই কথা বলে। এমনিতে আমি দিনে একবারই ভাত খাই। আমার পরিবারের সবাই অবশ্য তা-ই করে। আমার বাবা কুয়েত থেকে পাকাপাকিভাবে দেশে ফেরার পর ওনার ডায়বেটিস ধরা পড়ে। ডাইনিং-এ বসে রাতের খাবার সময়ে ওনার রুটির প্লেটের সামনে আমরা ভাত নিয়ে বসলে আব্বু মন খারাপ করত। সেই থেকে রাতে আমরাও ভাত এড়িয়ে চলছি গত সাত বছরের বেশি সময় ধরে। বিল দিতে গিয়ে দেখি নারী দাতো এর ক্যাশ টেবিলে নানান দেশের টাকা কাচ-চাপা দেওয়া। এর মধ্যে জ্বলজ্বল করছে বাংলাদেশের ৫০ আর ১০০ টাকার নোটও। হোমস্টে-তে পৌঁছে জুমন ভাই স্মার্টওয়াচ দেখে জানান দিলেন, মালয়েশিয়ার পথঘাটের ধুলো মেখে ইতোমধ্যে আমরা পেরিয়ে গেছি ১০১৫ কিলোমিটারের বেশি পথ।












