বর্ষায় টাঙ্গুয়ার হাওড়ে
মেঘ-বৃষ্টির হাওরে

বর্তমানে টাঙ্গুয়ার হাওরে অর্ধশতাধিক আধুনিক ও বিলাসবহুল হাউজবোট রয়েছে। ছবি: ওয়াটার ইন হাউস বোট কর্তৃপক্ষের সৌজন্যে
একটু আগের তামাটে আকাশটা নিমেষেই রূপ নিল কালোয়। তারপর শুরু ঝুম বৃষ্টি। একটু আগেই তাহিরপুর ঘাট ছেড়ে বিশাল, অতল জলরাশি কেটে চলতে শুরু করেছে হাউজবোট। বোটের কাচের জানালায় বৃষ্টির ফোঁটাদের উথালপাথাল নৃত্য আর ছাদ থেকে টিনের চালে বৃষ্টি পড়ার সেই চেনা ঝমঝম শব্দ!
লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে কিংবা জানালার পাশে এক কাপ ধোঁয়া ওঠা গরম চা হাতে নিয়ে যখন দিগন্তে চোখ যাবে, মনে হবে চারপাশটা রূপকথার কোনো জলরাজ্যে রূপ নিয়েছে। বৃষ্টির অবাধ্য ছাটে দূরের মেঘালয়ের পাহাড়গুলো অস্পষ্ট। মাঝেমধ্যে দূর পাহাড় থেকে ধেয়ে আসে বুনো বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর বোটের গলুইয়ে এসে আছড়ে পড়ে ঢেউ।
বৃষ্টির ছাট একটু কমে এলে, লাইফ জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে যখন হাওরের সেই কাচের মতো স্বচ্ছ ও ঠান্ডা জলে শরীরটা ভাসিয়ে দেবেন, তখন মনে হবে জীবনের সব ক্লান্তি এক নিমেষেই ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে গেছে।
বর্ষার প্রকৃতি ও দর্শনীয় স্থান
বর্ষায় মাইলের পর মাইল বিস্তৃত পানি আর আকাশের যে রূপ টাঙ্গুয়ার হাওড়ে চোখে পড়ে, তা অন্য ঋতুতে কল্পনা করা অসম্ভব।
ভাসমান গ্রাম ও আধা-ডুবন্ত অরণ্য
বর্ষার ঢলে হাওরের মাঝখানের গ্রামগুলো যেন পানির ওপর ভেসে থাকা একেকটি সবুজ ক্ষুদ্র দ্বীপ। এখানকার বড় আকর্ষণ হিজল ও করচের বন, যার অর্ধেকের বেশি এখন পানির নিচে। এই রহস্যময় জলবনের বুক চিরে বোট যখন ধীরলয়ে এগোবে, নিজেকে কোনো রোমাঞ্চকর অভিযানের যাত্রী মনে হবে।
মেঘ-পাহাড়ের খেলা
হাওরের উত্তর সীমান্তে দাঁড়িয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের সারিবদ্ধ আকাশছোঁয়া সবুজ পাহাড়। বর্ষায় মেঘগুলো পাহাড়ের গা বেয়ে এত নিচে নেমে আসে যে, মনে হয় হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে।
ওয়াচ টাওয়ার
হাওরের মাঝখানের এ টাওয়ারে বোট থামিয়ে শান্ত, টলটলে জলে সাঁতার কাটার আনন্দই আলাদা। ওপরে উঠলে পুরো হাওরের চমৎকার প্যানোরামিক দৃশ্য চোখে পড়ে।
নীলাদ্রি লেক
টেকেরঘাটের এ পরিত্যক্ত চুনাপাথরের খনিটি এখন রূপ নিয়েছে এক জাদুকরী হ্রদে। খাড়া টিলা আর সবুজ পাহাড়ের পায়ের কাছে ঘুমিয়ে থাকা এর নীলাভ স্ফটিক জলের কারণে একে বাংলাদেশের ‘কাশ্মীর’ বলেন অনেকে।
লাকমাছড়া
ভারত সীমান্তঘেঁষা এ পাহাড়ি ছড়ায় দেখা মিলবে সবুজ পাহাড়ের খাঁজ থেকে ধেয়ে আসা পাথুরে খালের মোহময় রূপ। এর বরফশীতল পানিতে পা ডুবিয়ে বসলেই সব ক্লান্তি কর্পূরের মতো উড়ে যায়।
যাদুকাটা নদী ও বারেক টিলা
একপাশে আকাশছোঁয়া সবুজ বারেক টিলা, অন্যপাশে বিস্তীর্ণ রুপালি বালুতট ও শান্ত নদীর মায়াবী স্রোত—এমন ত্রিমুখী সঙ্গম খুব কম জায়গায়ই দেখা যায়।
শিমুল বাগান: বসন্তের রক্তিম রূপ ছাপিয়ে বর্ষায় এ বিশাল বাগানটি ধারণ করে গাঢ় সবুজ এক সতেজ রূপ, যা চোখের পলকে মনে প্রশান্তি এনে দেয়।
হাউজবোট ও সাধারণ নৌকার খরচাপাতি
পর্যটকদের স্বাচ্ছন্দ্য, আভিজাত্য আর বাজেটের কথা মাথায় রেখে হাওরে দুই ধরনের নৌযানের ব্যবস্থা রয়েছে:
১. হাউজবোট
বর্তমানে টাঙ্গুয়ার হাওরে সাধারণ হাউজবোটের পাশাপাশি অনেক আধুনিক ও বিলাসবহুল হাউজবোট রয়েছে। ওয়াটার ইন (০১৭২৩২০৪৪৮১), দ্য আর্ক (০১৩৫২৫৪৫০৯৩), দ্য হাওড় সেইল (০১৭১৩৩৮৮৪৯২), দ্য গ্রিন হেভেন (০১৭১৯৫৯১৬১৩), দহিম (০১৬৭৪৯৪৮৬৬৮), বজরা (০১৬১০৫৬৩৯০২), ফ্যান্টাসি (০১৮২৬৮০৮১৫১), চন্দ্রাবতী (০১৮৬৯৬৪৯৮১৭), হিজল (০১৮৭৭৭২২৮৫০), দ্য ক্যাপ্টেন (০১৬০১৩৫১১১৩), কাগজের নৌকা (০১৮২৩৮০০৮০৪), জগৎজ্যোতি (০১৭১২৪৬৯৯৩৫), জলতরঙ্গ (০১৬০১৩১৭৯১৮) এর মধ্যে অন্যতম। দুই দিন এক রাতের প্রিমিয়াম প্যাকেজে কেবিনে থাকা, হাওরের তাজা মাছ, দেশি হাঁসের মাংস, স্থানীয় শুঁটকি ভর্তা ও রাতে বারবিকিউসহ রাজকীয় খাওয়াদাওয়া এবং সব স্পট ঘোরার খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকে।
কেবিনের ধরন (এসি-নন এসি, নন-অ্যাটাচড, অ্যাটাচড বাথ বা বারান্দাসহ প্রিমিয়াম কেবিন) ও হাউজবোটের মান অনুযায়ী প্রতিজন খরচ পড়বে ৫ হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকা। দল বড় হলে পুরো বোট একসঙ্গে বুক করলে খরচ কমে আসে।
২. সাধারণ ইঞ্জিনচালিত নৌকা
যারা কম খরচে, ব্যাকপ্যাকিং বা ট্র্যাডিশনাল স্টাইলে অ্যাডভেঞ্চার করতে চান, তাদের জন্য স্থানীয় ইঞ্জিন নৌকাই সেরা। তবে এতে খাওয়াদাওয়া ও অন্যান্য লজিস্টিকসের ব্যবস্থা নিজেদের করতে হয়। নৌকার আকারভেদে এক রাতের ভাড়া ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা।
টিপস: শুক্র ও শনিবার পর্যটকদের ভিড় বেশি থাকায় নৌকার ভাড়া কিছুটা বাড়তে পারে। সুযোগ থাকলে সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতে ভ্রমণের পরিকল্পনা করুন।
কীভাবে যাবেন?
ঢাকার ফকিরাপুল বা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে শ্যামলী, হানিফ বা এনা পরিবহনের বাসে সরাসরি সুনামগঞ্জ শহর (ভাড়া ৬৫০-৭৫৫ টাকা, সময় প্রায় ৭ ঘণ্টা)। সুনামগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে নেমে সুরমা নদীর বড় ব্রিজের গোড়া থেকে শেয়ারিং বা রিজার্ভ লেগুনা, সিএনজি কিংবা মোটরবাইকে সরাসরি তাহিরপুর ঘাট (সময় প্রায় দেড় ঘণ্টা)।
লাক্সারি হাউজবোট বুক করা থাকলে যাত্রার আগেই জেনে নিন সেটি সুনামগঞ্জের সাহেব বাড়ি ঘাট থেকে ছাড়বে নাকি তাহিরপুর থেকে। সাহেব বাড়ি ঘাট থেকে ছাড়লে সরাসরি সুনামগঞ্জ শহর থেকেই বোটে উঠে পড়া যায়, আলাদা করে তাহিরপুর যাওয়ার ঝামেলা থাকে না।
হাওরের আদি রসনা
হাউজবোটে সব দায়িত্ব বোটের স্টাফদের। নৌকা ভাড়া সকরলে তাহিরপুর বাজার থেকে চাল, ডাল, সবজি কিনে নৌকায় তুলতে হবে। হাওরের জেলেদের নৌকা থেকে জ্যান্ত মাছ কিনে মাঝিকে দিয়ে বা লোকাল বাবুর্চি ভাড়া করে রান্না করিয়ে নেওয়া যায়। জলের ওপর ভাসমান নৌকায় রান্নার সুবাস ক্ষুধা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।
এ ছাড়া তাহিরপুর এবং টেকেরঘাট বাজারে বেশ কিছু ভালোমানের স্থানীয় হোটেল রয়েছে। সেখানে খুব সস্তায় ২০-৩০ প্রজাতির হাওরের মাছ ও হাঁসের মাংসের পদ পাওয়া যায়।
জেনে রাখুন
সুন্দরবনের পর টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক ‘রামসার সাইট’। পরিযায়ী পাখি ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্লাস্টিকের বোতল, চিপসের প্যাকেট বা কোনো ময়লা হাওরের পানিতে ফেলা যাবে না। সব আবর্জনা বোটের ডাস্টবিনে জমা রাখুন।
হাওরের পানি শান্ত হলেও এর গভীরতা অনেক এবং নিচে অদৃশ্য স্রোত থাকে। তাই সাঁতার জানুন আর না জানুন, বোটে থাকা অবস্থায় কিংবা পানিতে নামার সময় অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট পরা বাধ্যতামূলক।
বর্ষায় হুট করে তীব্র ঝড় বা বজ্রপাত শুরু হতে পারে। তাই ভ্রমণের আগে আবহাওয়ার পূর্বাভাস জেনে নিন। আকাশে মেঘ ডাকলে বা বজ্রপাতের শঙ্কা তৈরি হলে বোটের ছাদে না থেকে দ্রুত নিচে আশ্রয় নিন। বড় বন্যা বা ঝড়ের পূর্বাভাস থাকলে ভ্রমণ স্থগিত করুন।
মোবাইল, ক্যামেরা সুরক্ষার জন্য ওয়াটারপ্রুফ ড্রাইলক ব্যাগ, রোদ-বৃষ্টির জন্য ছাতা বা রেইনকোট এবং রাতে শীতল বাতাসের জন্য একটি চাদর বা পাতলা কাঁথা সঙ্গে রাখুন।
বর্ষায় তবে আর দেরি কেন? ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন টাঙ্গুয়ার পথে!









