পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে মেঘের রাজ্যে

চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে পাহাড়, মেঘ, সবুজ আর নীল আকাশ // ছবি - লেখক
আকাশ ছুঁয়ে মেঘের বাড়ি ঘুরে এলাম। সেখানে মেঘেরা ডানা মেলে দল বেঁধে ঘুরে বেড়ায়, কখনো ঢেকে দেয় পাহাড়ের গা । বিকালে সূর্যের রঙ উপত্যকায় ছবি আঁকে। সমতলের কোলাহল থেকে বহু দূরে, পাহাড়ের বুক জুড়ে কবিতার মতো সুন্দর সেই জনপদ— মেঘের রাজ্য সাজেক।
শরতের আলোয় সেই রাজ্যেই কাটিয়ে এলাম কিছুটা সময় । শরীর ফিরেছে সমতলে, কিন্তু মন পড়ে আছে সেখানেই। সময় কাটছে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে, যেন নিসর্গের মায়াজালে আটকা পড়ে আছি। চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে পাহাড়, মেঘ, সবুজ আর নীল আকাশ। মনে হয়, এখনো যেন শুয়ে আছি পাহাড়ের বিছানায়।
পাহাড়ের পথে
আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল মৌলভীবাজার থেকে। ট্রেনে করে ফেনী। সেখান থেকে হাইএসে খাগড়াছড়ি। এরপর চাঁদের গাড়িতে সাজেকের পথে। ঘড়ির কাঁটা তখন সকাল ৯টা পেরিয়ে গেছে। চাঁদের গাড়ি ছুটছে খাগড়াছড়ি থেকে দীঘিনালা, সেখান থেকে বাঘাইহাটের দিকে। পাহাড়ি পথ যত এগোচ্ছে, ততই বদলে যাচ্ছে চারপাশের দৃশ্য। সমতলের পরিচিত পৃথিবী যেন ধীরে ধীরে পিছনে পড়ে যাচ্ছে।
বাঘাইহাটে এসে কিছুটা বিরতি। চারদিকে তখন পর্যটকদের চাঁদের গাড়ি ও মোটরসাইকেলের ভিড়। নিরাপত্তার কারণে কাগজপত্র পরীক্ষা করা হলো। আমরা পেঁপে, ডাব আর মিষ্টি লেবু কিনে নিলাম। সামনে দীর্ঘ পাহাড়ি পথ। সঙ্গে পানিও রাখা হলো।
এরপর শুরু হলো পাহাড়ের আরও দুর্গম পথ। নিরাপত্তার ব্যবস্থা সঙ্গে থাকায় গাড়িগুলো একসঙ্গে এগোচ্ছিল। আঁকাবাঁকা রাস্তা কখনো পাহাড়ের গা ঘেঁষে উঠছে, কখনো গভীর খাদ পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। পাহাড়ে রোদ আর মেঘের এক অদ্ভুত লুকোচুরি চলছে। কোথাও শরতের আকাশ পাহাড়ের কোলে নেমে এসেছে, কোথাও পাহাড় যেন আকাশে হেলান দিয়ে ঘুমাচ্ছে।
পথের পাশে পাহাড়ি জনপদ। ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শিশুরা হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছে। তাদের সরল হাসি আর পাহাড়ের নিসর্গ মিলেমিশে তৈরি করছে অন্য রকম এক দৃশ্য।
হঠাৎ আমাদের সহযাত্রী রাজকুমার পাল চিৎকার করে উঠলেন,
‘ওই যে সাজেক ভ্যালির চূড়া!’
সবাই যেন একসঙ্গে জানালার দিকে ঝুঁকে পড়লাম। সত্যিই দূরে দেখা যাচ্ছে পাহাড়ের ওপর সাজেকের নজরকাড়া মায়াবী জনপদ।
পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে
চাঁদের গাড়ি এবার চড়াই ভাঙতে শুরু করল। মনে হলো, আমরা যেন পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে মেঘের রাজ্যে উঠছি। পুলকিত চিত্তে পৌঁছে গেলাম রুইলুই পাড়ায়। আমাদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল পূর্বমুখী একটি কাঠের দোতলা কটেজে। বারান্দা থেকে দূরের পাহাড় দেখা যায়। ভোরে সূর্যোদয় দেখার জন্য জায়গাটি ছিল আদর্শ।
দুপুরের খাবারে ছিল ব্যাম্বু চিকেন, সবজি আর সালাদ। পাহাড়ি পরিবেশে বাঁশে রান্না করা মাংসের স্বাদও যেন আলাদা।
সাজেকে পাহাড় আর মেঘের সৌন্দর্যের মধ্যেও আলাদাভাবে নজর কাড়ে এখানকার মানুষের জীবন ও সংস্কৃতির বৈচিত্র্য। রুইলুই পাড়ার পথে পথে পাহাড়ি মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন, বাঁশ-কাঠের ঘর, ছোট ছোট দোকান আর শিশুদের হাসিমুখ প্রকৃতির সৌন্দর্যের সঙ্গে মিশে আছে। পাহাড়ি নারীদের দোকান সামলাতে দেখলাম। তাদের সহজ-স্বাভাবিক উপস্থিতি সাজেকের নিজস্ব সংস্কৃতির একটি আলাদা আবহ তৈরি করেছে।
কংলাক পাহাড়ের পথে
বিকাল ৪টার দিকে চাঁদের গাড়িতে রওনা হলাম কংলাকের উদ্দেশে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে গাড়ি যত ওপরে উঠছে, চারপাশের দৃশ্য ততই মনোরম হচ্ছে। কংলাক সাজেকের উচ্চতম দর্শনবিন্দু। তার চূড়ার দিকে তাকাতে মাথা প্রায় ষাট ডিগ্রি পেছনে হেলাতে হয়। প্যাঁচানো খাড়া সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে হলো। মনে হলো, মধ্যাকর্ষণকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আমরা উঠে যাচ্ছি পাহাড়ের আরও কাছে। বিকালের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম হয়ে এসেছে। পাহাড়ের গায়ে সোনালি রোদ। দূরের মেঘগুলোও যেন রঙ বদলাতে শুরু করেছে।
কংলাকের সূর্যাস্ত
পশ্চিম আকাশ তখন ধীরে ধীরে রঙ বদলাচ্ছে। হলুদ থেকে কমলা, কমলা থেকে লাল। পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, সূর্য যেন আমাদের চোখের সামনেই ধীরে ধীরে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে চলে যাচ্ছে। একসময় সূর্যের লাল গোলক পাহাড়ের আড়ালে হারিয়ে গেল। চারপাশে নেমে এলো সন্ধ্যার নরম আলো। কংলাকের চূড়া থেকে সেই সূর্যাস্ত দেখা ছিল এক অসাধারণ অনুভূতি! প্রকৃতি যেন দিনের শেষ ছবিটুকু খুব যত্ন করে এঁকে দিল। সূর্য ডোবার পর দূরের মিজোরামের লুসাই পাহাড়ের গায়ে ছড়িয়ে পড়ল সন্ধ্যার মায়াবী আলো। পাহাড়ের রেখাগুলো ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে আসছিল।
মনে পড়ে গেল জীবনানন্দ দাশের কবিতার পঙ্ক্তি—
‘পেয়ে গেছি; দেখেছি আকাশে দূরে কড়ির মতন সাদা মেঘের পাহাড়
সূর্যের রাঙা ঘোড়া; পক্ষীরাজের মতো কমলা রঙের পাখা
রাতের কুয়াশা ছিঁড়ে।’
সত্যিই, এখানে প্রকৃতি যেন জীবন্ত কবিতা।
এই কবিতা ছেড়ে কোথাও যেতে ইচ্ছা করে না।
তারাভরা রাত ও ফানুস
কংলাক থেকে ফিরে আমরা হেলিপ্যাডের কাছে কিছুক্ষণ বসেছিলাম। দলের সন্তোষদা ও গুরুপদ গান ধরলেন। পাহাড়ের নীরবতার মধ্যে গান আর আড্ডায় জমে উঠল আসর। একসময় চোখ গেল আকাশের দিকে। অগণিত তারার মেলা সেখানে। দূরে দু-একটি ফানুস উড়ছে। চারপাশে তখন পাহাড়ি মানুষের ছোট ছোট দোকান। চাকমা ও ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের মানুষের দোকানগুলোয় পর্যটকদের আনাগোনা। একটি দোকানে বাঁশের নলের ভেতর তৈরি ‘বাঁশের চা’ খেলাম। চা বানিয়ে দিলেন একজন চাকমা তরুণী। দুধ, চিনি আর লিকার মিশিয়ে তৈরি সেই চায়ের স্বাদ বেশ মনে ধরল। রাত বাড়তে থাকল। দ্রুত কটেজে ফিরলাম। হালকা বৃষ্টি নামল। জানালার পাশ দিয়ে মেঘ চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল, আমরা বুঝি পাহাড়ের ওপর নয়, মেঘের ভেলায় শুয়ে আছি।
ভোরে মেঘের সমুদ্র
ভোর হওয়ার আগেই ঘুম ভাঙল। বাইরে তাকিয়ে দেখি, চারপাশে শুধু মেঘ আর মেঘ। নিচের উপত্যকা যেন বিশাল সাদা সমুদ্র। পাহাড়ের চূড়াগুলো সেই সমুদ্রের মধ্যে দ্বীপের মতো ভেসে আছে। কিছুক্ষণ পর পুব আকাশে আলো ফুটতে শুরু করল। প্রথমে হালকা বেগুনি, তারপর গোলাপি। পাহাড়ের রেখায় সূর্য উঁকি দিল। তার সোনালি আভা মেঘের গায়ে নতুন আলপনা এঁকে দিল।
সূর্যের আলো যত বাড়তে লাগল, মেঘগুলোও যেন পাহাড়ের কোল ছেড়ে জেগে উঠল। একেকটি মেঘের দল ধীরে ধীরে ওপরে উঠছে, ছড়িয়ে পড়ছে সাজেকের আকাশ জুড়ে। কখনো পাহাড়ের মাথায় গালিচার মতো, কখনো আকাশের বুকে সাদা পালকের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে ইচ্ছামতো। সাজেকের আকাশ যেন তখন মেঘের নিজস্ব ক্যানভাস। সূর্যের আলো আর মেঘের খেলায় মুহূর্তে মুহূর্তে বদলে যাচ্ছে তার রঙ ও রূপ। সে যেন ক্ষণে ক্ষণে রূপ বদল করে পর্যটকদের চমকে দিতে ভালোবাসে।
আমরা হাঁটতে বের হলাম। পথের দুপাশে পাহাড়, মাথার ওপর মেঘ। সেই দুষ্টু মেঘ খুব কাছ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। আসলে ভোরের সাজেক যেন এক টুকরো স্বর্গীয় উদ্যান। যেদিকেই তাকাই না কেন, তার নিরাভরণ সৌন্দর্য চোখ ঝলসে দেয়!
সাজেকে আমাদের অবস্থান ছিল কম-বেশি ২২ ঘণ্টার মতো। অথচ এই অল্প সময়েই পাহাড়, মেঘ আর প্রকৃতির সঙ্গে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন তৈরি হয়ে গেল। ফিরতে ইচ্ছে করছিল না, তবু ফিরতে হলো। গাড়ি যখন পাহাড়ি পথ বেয়ে নিচে নামছিল, মনে হচ্ছিল শরীরটা শুধু ফিরে যাচ্ছে, মনটা যেন রয়ে গেল সেই মেঘের রাজ্যে।






