তরাইয়ের রহস্যময় অরণ্য চিতওয়ান

হিমালয়ের সুউচ্চ পর্বতের পাদদেশের সমতল তরাইয়েই ঘুমিয়ে আছে ‘চিতওয়ান’ অরণ্য। ঘুরে এসে লিখেছেন শাফিন মাশফিকুল আলম
স্ত্রী আর তিন বছরের কন্যাসমেত যখন পা রাখলাম প্রকৃতির সেই অন্য রকম স্বর্গে, দুই পাশের প্রকৃতি জানিয়ে দিচ্ছিল আমরা এক ভিন্ন নেপালে পা রেখেছি। নেপালের বাগমতি প্রদেশের এই নিভৃত অরণ্য যেন পাথুরে পাহাড় আর গহিন সবুজের এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণ।
উনবিংশ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত এ অঞ্চলটি মূলত নেপালের রাজপরিবারের শিকারভূমি হিসেবে পরিচিত ছিল।
বনের রোমাঞ্চ ছুঁতে আস্তানা গাড়লাম জঙ্গলের কোলঘেঁষা ‘হোটেল পার্কল্যান্ড’-এ। পোখারা থেকে দীর্ঘ পথের ধকলে স্ত্রী আর মেয়ে ক্লান্তিতে এলিয়ে পড়লেও, আমার শরীরে তখন জঙ্গল দেখার টানটান উত্তেজনা। হোটেলের ঠিক উঠোনেই বুনো এক গণ্ডারকে মহানন্দে ঘুরে বেড়াতে দেখে আমি তো বিস্ময়ে থ।
পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই আমাদের মূল সাফারি শুরু হলো রাপ্তি নদীর তীরে। শিমুল গাছের আস্ত গুঁড়ি খোদাই করে বানানো সরু অথচ স্থির এক ক্যানুতে করে ভেসে চললাম। চারপাশের অদ্ভুত নিস্তব্ধতা আর ভোরের কুয়াশায় প্রকৃতিকে আরও রহস্যময় করে তুলল। পানির সমান্তরালে চলতে চলতে যখন কিছু দূরেই দেখা মিলল দানবীয় সব কুমিরের, বুকের ভেতরটা শিরশির করে উঠল।
নদীর তপ্ত বালুচরে তখন আদিম এক দৃশ্য। একপাশে লম্বা সরু মুখের ঘড়িয়াল রোদ পোহাচ্ছে আর ঠিক তার পাশেই শ্যাওলা ধরা পাথরের মতো নিথর হয়ে ওত পেতে রয়েছে ভয়ংকর মিঠাপানির কুমির। এই ভয়াবহ সুন্দরের সামনে এমনকি আমার মেয়েও বিস্ময়ে চুপ হয়ে গিয়েছিল। রোমাঞ্চে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম আমরা।
ভোরের এই নদী ভ্রমণ মূলত ডানা মেলা পাখিদের দেখার এক অন্যরকম অভিযান। ৬৫০ প্রজাতির পাখির মেলা বসে এই অরণ্যে!
নদীর শান্ত স্রোতে ভেসে যাওয়ার সময় আমাদের মাথার ওপর দিয়ে কখনো উড়ে যাচ্ছিল রঙিন মাছরাঙা, কখনো বা কোলাহলপ্রিয় টিয়ের দল। দেখা মিলল দুষ্প্রাপ্য রেড হেডেড ট্রগন আর দক্ষিণ এশিয়ার অতিবিপন্ন বেঙ্গল ফ্লোরিকানের। গাছের মগডালে গম্ভীর মুখে বসে থাকা বিশালাকার ধনেশ পাখি বা গ্রেট হর্নবিল যেমন চোখে পড়ল, তেমনি ভাগ্য ভালো থাকায় উড়ন্ত অবস্থায় দেখা পেলাম বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা পাখি সারস ক্রেনের।
নদী ভ্রমণ শেষে আমরা পৌঁছালাম ‘এলিফ্যান্ট ব্রিডিং অ্যান্ড ট্রেইনিং সেন্টার’-এ। ১৯৮৪ সালে এশীয় হাতির প্রজনন, পরিচর্যা ও প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে গড়ে তোলা হয় এটি। এখানে ছোট ছোট হাতিশাবকদের চঞ্চলতা আর খুনসুটি দেখে আমাদের মন ভালো হয়ে গেল।
অরণ্যের গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নজরে এলো চিতওয়ানের আসল অহংকার, সেই সুবিশাল একশৃঙ্গ গণ্ডার
লাঞ্চের আয়েশ কাটিয়ে আমরা যখন জিপ সাফারির জন্য প্রস্তুত হলাম, তখনই শুরু হলো অরণ্যের আসল উত্তেজনা। গাইড বাবুর কড়া শাসন, অনুমতি ছাড়া জিপ থেকে এক পা বাইরে রাখা চলবে না। আমাদের সঙ্গে যোগ দিলেন আগের দিনই বন্ধু হয়ে যাওয়া জার্মান পর্যটক নোয়াহ।
ধুলো উড়িয়ে জিপ এগিয়ে চলল মাথা সমান উঁচু এলিফ্যান্ট গ্রাস আর নিবিড় শালবনের ভেতর দিয়ে। শুরুতেই অভ্যর্থনা জানাল একপাল চিতল হরিণ। রোদের ঝিলিক তাদের তামাটে গায়ের সাদা ফোঁটাগুলোতে পড়ে মুক্তোর মতো ঝকমক করছিল। কিছু দূরেই একঝলক দেখা দিয়ে বনের আড়ালে গা ঢাকা দিল লাজুক সাম্বার হরিণ। পথের পাশে বারবার দেখা মিলল পেখম মেলা বুনো ময়ূরের আর ঘাসের বুক চিরে চঞ্চল পায়ে ছুটে চলল বিরল বেঙ্গল ফ্লোরিকান।
অরণ্যের গভীরতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নজরে এলো চিতওয়ানের আসল অহংকার, সেই সুবিশাল একশৃঙ্গ গণ্ডার।
৬৮ প্রজাতির স্তন্যপায়ী বাস করা ৯৫২ বগর্কিলোমিটারের এই সাম্রাজ্যে আসল রাজা একজনই। বেঙ্গল টাইগার। মাটির ওপর টাটকা পায়ের ছাপ আর বানরের সতর্কসংকেত বারবার জানান দিচ্ছিল, রাজা আছে, হয়তো খুব কাছেই!
কীভাবে যাবেন
বিমানে নেপালের কাঠমান্ডু পৌঁছে সেখান থেকে সরাসরি সড়কপথেই যাওয়া যায় চিতওয়ানে। পর্যটকদের জন্য পোখারা থেকেও চিতওয়ান যাওয়ার সরাসরি ট্যুরিস্ট বাস ও প্রাইভেট কারের ব্যবস্থা রয়েছে। দুজনের ট্যুরিস্ট বাসভাড়া ছিল প্রায় ৩ হাজার নেপালি রুপি।
চিতওয়ানে থাকার জন্য আগে থেকেই হোটেল ও সাফারি প্যাকেজ বুক করে রাখা ভালো। আমরা ‘হোটেল পার্কল্যান্ড’-এ দুই রাত তিন দিনের একটি প্যাকেজ নিয়েছিলাম।থাকা, খাওয়া এবং সাফারি ভ্রমণসহ দুজনের মোট খরচ হয়েছিল প্রায় ২৫ হাজার নেপালি রুপি।


