গরম পানি ছাড়াই তৈরি হলো খাঁটি এসপ্রেসো কফি

সংগৃহীত ছবি
সকালবেলা এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কড়া এসপ্রেসো কফি না হলে
অনেকেরই দিন শুরু হয় না। কিন্তু যদি বলা হয়, এবার কফি বানাতে আর
ফুটন্ত গরম পানির কোনো প্রয়োজন নেই? সাধারণ ঘরের তাপমাত্রার
ঠাণ্ডা পানি দিয়েই বানানো যাবে একদম আসল এসপ্রেসোর মতো কড়া ও সুস্বাদু কফি!
শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও, বিজ্ঞানের এক নতুন আবিষ্কার এটিকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অবস্থিত ‘ইউনিভার্সিটি অব নিউ সাউথ ওয়েলস’-এর একদল বিজ্ঞানী গরম পানি ছাড়াই হুবহু আসল এসপ্রেসোর স্বাদ ও গুণের কফি তৈরি করতে সফল হয়েছেন। আর এই ম্যাজিকটি করা হয়েছে কোনো রাসায়নিক ছাড়াই, স্রেফ ‘আল্ট্রাসাউন্ড’ বা উচ্চ-কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করে!
কফি বানানোর চিরন্তন নিয়ম যেভাবে ভাঙল
সাধারণত এসপ্রেসো কফি বানাতে হলে কফি মেশিনে উচ্চ চাপে ফুটন্ত গরম পানি (প্রায় ৯০ থেকে ৯৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস) কফি গুঁড়োর ভেতর দিয়ে পার করতে হয়। গরম পানির তাপে কফির ভেতরের চমৎকার সুগন্ধ, তেল ও ক্যাফেইন বাইরে নিয়ে আসে।
কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ড. ফ্রান্সিসকো ট্রুজিলোর নেতৃত্বাধীন গবেষক দল এই গরম পানির জায়গায় ব্যবহার করেছেন শব্দতরঙ্গ। মানুষের কানের শ্রবণসীমার বাইরে যে উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দ থাকে, তাকে আল্ট্রাসাউন্ড বা অতিশব্দ বলে। বিজ্ঞানীরা সাধারণ একটি এসপ্রেসো মেশিনের কফি বাস্কেটের পাশে ‘ট্রান্সডিউসার’ নামের একটি ছোট ধাতব যন্ত্র যুক্ত করে দেন। এই যন্ত্রটি খুব দ্রুত কাঁপতে পারে।
ভেতরের বিজ্ঞান: কীভাবে কাজ করে এই প্রযুক্তি?
দশম শ্রেণীর বিজ্ঞানের ভাষায় বলতে গেলে, এখানে কাজ করেছে পদার্থবিজ্ঞানের ‘অ্যাকোস্টিক ক্যাভিটেশন’ বা শব্দজনিত বুদবুদ প্রক্রিয়া।
যখন ওই ধাতব যন্ত্রটির কারণে কফি গুঁড়ো ও পানির মিশ্রণের ভেতর দিয়ে তীব্র শব্দতরঙ্গ প্রবাহিত হয়, তখন পানির ভেতরে কোটি কোটি অতি ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মাইক্রোস্কোপিক বুদবুদ তৈরি হয়। এই বুদবুদগুলো চোখের পলকে তৈরি হয় এবং প্রচণ্ড গতিতে ফেটে যায়। বুদবুদগুলো যখন ফেটে যায়, তখন সেখানে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র শকওয়েভ বা ধাক্কা তৈরি হয়। এই ধাক্কার কারণে কফি দানার কোষগুলো ভেঙে যায় এবং তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা সমস্ত স্বাদ, সুগন্ধি তেল এবং ক্যাফেইন মুহূর্তের মধ্যে সাধারণ পানিতেই গলে বের হয়ে আসে।
মানুষ কি আসল-নকল ধরতে পেরেছে?
বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে কফি বানিয়েই ক্ষান্ত হননি, তারা এর একটি বাস্তব পরীক্ষাও করেছেন। প্রায় ১০০ জন নিয়মিত কফিপ্রেমীকে ডেকে চোখ বেধে পরীক্ষা (ব্লাইন্ড টেস্ট) করানো হয়। তাদেরকে দুই ধরনের কফিই খেতে দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কোনটা কীভাবে বানানো তা জানানো হয়নি।
ফলাফল ছিল চমকপ্রদ! কফিপ্রেমীরা সাধারণ গরম পানিতে বানানো এসপ্রেসো এবং এই শব্দতরঙ্গ দিয়ে বানানো এসপ্রেসোর মধ্যে কোনো তফাতই খুঁজে পাননি। কফির সুঘ্রাণ, স্বাদ, তিতকুটে ভাব এবং সামগ্রিক ভালোলাগার দিক থেকে দুটি কফিই সমান নম্বর পেয়েছে। গবেষকদের মতে, আড়াই থেকে তিন মিনিট হচ্ছে এই কফি বানানোর একদম সঠিক সময়।
পরিবেশ ও ব্যবসার জন্য কেন এটি বড় সুখবর
গবেষকদের মতে, এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি পরিবেশবান্ধব এবং সাশ্রয়ী। কফি মেশিনে পানি গরম করতে প্রচুর বিদ্যুৎ খরচ হয়। কিন্তু শব্দতরঙ্গ ব্যবহারে পানি গরম করার ঝামেলা না থাকায় বিদ্যুৎ খরচ প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাবে।
তাছাড়া, বর্তমানে বাজারে যে কোল্ড ব্রু (ঠাণ্ডা কফি) পাওয়া যায়, তা তৈরি করতে কফি গুঁড়োকে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। কিন্তু এই আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে মাত্র কয়েক মিনিটেই কড়া কোল্ড ব্রু বা কোল্ড কফির নির্যাস তৈরি করা সম্ভব। ফলে বোতলজাত কফি কোম্পানিগুলোর সময় এবং খরচ দুটোই বাঁচবে।
সূত্র: জার্নাল অব ফুড ইঞ্জিনিয়ারিং ও সায়েন্স অ্যালার্ট


