মস্তিষ্কের ক্ষমতা দুর্বল করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আছে বাঁচার উপায়

ছবি: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), বিশেষ করে বড় ভাষা মডেল (এলএলএম) যেমন চ্যাটজিপিটি, গুগল জেমিনাই বা ক্লাউডি যত বেশি আমাদের দৈনন্দিন কাজের অংশ হয়ে উঠছে, ততই গবেষকদের মধ্যে একটি বড় উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে- এই ‘মানসিক আউটসোর্সিং’ বা চিন্তা-ভাবনা এআইয়ের ওপর ছেড়ে দেওয়ার অভ্যাস আমাদের মস্তিষ্কের ক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে কি না?
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবেষক নাটালিয়া কোস্মিনা যখন এমআইটি-তে ইন্টার্ন নিয়োগের জন্য আবেদনপত্রগুলো দেখছিলেন, তখন তিনি একটি অস্বাভাবিক বিষয় লক্ষ্য করেন।
আবেদনপত্রগুলো অনেকটাই একই ধরনের, অত্যন্ত পরিপাটি ও দীর্ঘ, এবং শুরুতেই হঠাৎ করে তার গবেষণার সঙ্গে দূরবর্তী ও কৃত্রিমভাবে যুক্ত ব্যাখ্যা দেওয়া থাকত। তার কাছে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, অনেক আবেদনকারীই এগুলো লেখার জন্য এআই ব্যবহার করছেন।
একই সময়ে ক্লাসরুমে তিনি আরেকটি পরিবর্তন লক্ষ্য করেন, আগের তুলনায় শিক্ষার্থীরা তথ্য দ্রুত ভুলে যাচ্ছে। এর ফলে তার মনে সন্দেহ তৈরি হয় যে, এআই ব্যবহারের ফলে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানগত ক্ষমতা প্রভাবিত হচ্ছে কি না।
এ বিষয়টি গভীরভাবে বুঝতে তিনি ও এমআইটি মিডিয়া ল্যাবের সহকর্মীরা একটি গবেষণা করেন। সেখানে ৫৪ জন শিক্ষার্থীকে তিনটি দলে ভাগ করা হয়। একদল চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করে প্রবন্ধ লেখে, একদল শুধু গুগল সার্চ ব্যবহার করে (এআই-জেনারেটেড সারাংশ ছাড়া), আরেকদল কোনো প্রযুক্তি ব্যবহার না করে নিজের চিন্তা দিয়ে লেখে। তাদের মস্তিষ্কের তরঙ্গ (ব্রেন ওয়েভ) লেখার সময় মাপা হয়।
প্রবন্ধের বিষয়গুলো ছিল তুলনামূলকভাবে সাধারণ- যেমন সুখ, আনুগত্য বা দৈনন্দিন জীবনের সিদ্ধান্ত।
গবেষণার ফলাফল এখনো পিয়ার-রিভিউ জার্নালে প্রকাশ হয়নি, তবে কোস্মিনার ভাষায় এটি ছিল বেশ চমকপ্রদ। যারা নিজের চিন্তা ব্যবহার করে লিখেছে, তাদের মস্তিষ্কে ব্যাপক কার্যকলাপ দেখা যায়- যেন “মস্তিষ্ক জ্বলে উঠেছে”। গুগল ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রেও ভিজ্যুয়াল প্রসেসিং অংশে শক্তিশালী কার্যকলাপ ছিল। কিন্তু চ্যাটজিপিটি ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল; প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস দেখা যায়।
তার মতে, “মস্তিষ্ক ঘুমিয়ে পড়েনি, কিন্তু সৃজনশীলতা ও তথ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত অংশগুলোতে সক্রিয়তা অনেক কমে গিয়েছিল।”
এআই ব্যবহারকারীরা শুধু কম মানসিক প্রচেষ্টাই করেননি, তাদের স্মৃতিশক্তিতেও প্রভাব দেখা যায়। প্রবন্ধ জমা দেওয়ার পর তারা নিজেদের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিতে পারেনি এবং অনেকেই বলেছে, লেখাটির ওপর তাদের নিজের মালিকানার অনুভূতিও নেই।
অন্যান্য গবেষণাও একই ধরনের ইঙ্গিত দিয়েছে- এআই ব্যবহারের ফলে মানুষ তথ্য মনে রাখা ও পুনরুদ্ধারে দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়া ইউনিভার্সিটির এক গবেষণায় ‘কগনিটিভ স্যারেন্ডার’ নামের একটি ধারণা উঠে এসেছে। এর মানে হলো, মানুষ এআই-এর দেওয়া তথ্য প্রায় প্রশ্ন না করেই মেনে নেয় এবং নিজের যুক্তিবোধকে পাশ কাটিয়ে দেয়।
শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয়, বাস্তব জীবনেও একই ধরনের প্রভাব দেখা গেছে। একটি বহুজাতিক গবেষণায় দেখা যায়, যেসব চিকিৎসক তিন মাস ধরে কোলন ক্যান্সার শনাক্ত করতে এআই টুল ব্যবহার করেছিলেন, পরে সেই সহায়তা ছাড়াই টিউমার শনাক্ত করার দক্ষতা কিছুটা কমে যায়।
কোস্মিনা আরও বলেন, এআই ব্যবহারে শিক্ষার্থীদের লেখায় সৃজনশীলতার অভাব দেখা গেছে। তাদের প্রবন্ধগুলো খুবই মিলেমিশে যাওয়া, একঘেয়ে এবং গভীরতাহীন ছিল। শিক্ষকরা এমনকি সন্দেহ করেছিলেন যে সবাই হয়তো একসঙ্গে বসে একই ধরনের লেখা তৈরি করেছে।
গবেষণার চার মাস পর একই শিক্ষার্থীদের আবার এআই ছাড়া প্রবন্ধ লিখতে দেওয়া হলে দেখা যায়, যারা আগে চ্যাটজিপিটি ব্যবহার করেছিল তাদের মস্তিষ্কের সংযোগ (নিউরাল কানেক্টিভিটি) তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এটি ইঙ্গিত দিতে পারে যে আগেরবার তারা যথেষ্ট গভীরভাবে বিষয়টি প্রক্রিয়াকরণ করেনি।
অন্যদিকে কম্পিউটেশনাল নিউরোসায়েন্টিস্ট ভিভিয়েন মিংও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক পূর্বাভাস (যেমন তেলের দাম) অনুমান করাতে গিয়ে দেখেন, বেশিরভাগই সরাসরি এআই-এর উত্তর কপি করেছে। তাদের মস্তিষ্কে গামা ওয়েভ কার্যকলাপ খুব কম ছিল, যা মানসিক প্রচেষ্টার একটি সূচক।
তার মতে, “গভীরভাবে চিন্তা করা আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা যদি এটি ব্যবহার না করি, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।”
তবে একটি ছোট অংশ- প্রায় ১০ শতাংশেরও কম; এআইকে শুধু তথ্য সংগ্রহের টুল হিসেবে ব্যবহার করে নিজেরা বিশ্লেষণ করেছে। তারা তুলনামূলকভাবে বেশি সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পেরেছে এবং তাদের মস্তিষ্কেও বেশি সক্রিয়তা দেখা গেছে।
প্রায় দুই দশক আগে মিং ধারণা দিয়েছিলেন যে, অতিরিক্ত গুগল ম্যাপ নির্ভরতা মানুষের স্মৃতি দুর্বল করতে পারে। পরবর্তীতে কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, জিপিএস ব্যবহারের সঙ্গে মানুষের স্থানিক স্মৃতি দুর্বল হওয়ার সম্পর্ক থাকতে পারে।
এই সব গবেষণা মিলিয়ে গবেষকরা বলছেন, মস্তিষ্ক যত বেশি সক্রিয় থাকে, তা তত বেশি সুস্থ ও সুরক্ষিত থাকে। তাই এআই যদি অতিরিক্ত নির্ভরতার জায়গা হয়ে যায়, তাহলে তা শুধু সৃজনশীলতা নয়, দীর্ঘমেয়াদে জ্ঞানগত স্বাস্থ্যের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে- এমনকি ডিমেনশিয়ার ঝুঁকির সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যদিও এটি এখনো নিশ্চিত নয়।
এই পরিস্থিতিতে গবেষকরা ‘হাইব্রিড ইন্টেলিজেন্স’ ধারণার কথা বলছেন- যেখানে মানুষ ও এআই একসঙ্গে কাজ করবে, কিন্তু মানুষ আগে চিন্তা করবে, পরে টুল ব্যবহার করবে।
কোস্মিনা পরামর্শ দেন, প্রথমে কোনো বিষয় এআই ছাড়া শেখা উচিত, তারপর সেটি যাচাই বা গভীর করার জন্য এআই ব্যবহার করা যেতে পারে।
ভিভিয়েন মিং একটি কৌশল হিসেবে ‘নেমেসিস প্রম্পট’ ব্যবহার করার কথা বলেন, যেখানে এআই-কে নিজের “প্রতিপক্ষ” হিসেবে ধরে আপনার চিন্তার ভুলগুলো কঠোরভাবে দেখাতে বলা হয়, যাতে আপনি নিজের যুক্তিকে আরও শক্তিশালী করতে পারেন।
আরেকটি পদ্ধতি হলো ‘প্রোডাকটিভ ফ্রিকশন’- এআইকে শুধু উত্তর না দিয়ে প্রশ্ন করতে বলা, যাতে ব্যবহারকারী নিজেই চিন্তা করতে বাধ্য হয়।
সবশেষে গবেষকদের মূল বার্তা হলো- এআই আমাদের শক্তিশালী টুল হতে পারে, কিন্তু যদি আমরা অতিরিক্তভাবে চিন্তা করা বন্ধ করে দিই, তাহলে সেই সুবিধাই দীর্ঘমেয়াদে আমাদের মানসিক সক্ষমতার জন্য ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে।

