আগুনের পৃথিবীতে প্রাণের পদচিহ্ন

তপ্ত কড়াইয়ে কি আমরা জীবনের স্পন্দন কল্পনা করতে পারি? কিন্তু প্রাণের ক্ষেত্রে পৃথিবীতে হয়েছিল সেটাই। লিখেছেন শুভ রহমান
আজ থেকে প্রায় ৩৫০ কোটি বছর আগের পৃথিবী কেমন ছিল, তা কল্পনা করাও সাধারণ মানুষের পক্ষে কঠিন। চারদিকে ফুটন্ত লাভার স্রোত, আকাশে বিষাক্ত গ্যাসের মেঘ, বাতাসে কোনো মুক্ত অক্সিজেন নেই এবং সমুদ্রগুলো পূর্ণ ছিল তপ্ত লোহা ও সিলিকায়। চরম উত্তাপ আর অগ্ন্যুৎপাতের এমন নরকতুল্য পরিবেশেও যে পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব ছিল এবং আদিম অণুজীবরা চমৎকারভাবে টিকে ছিল— তার এক অবিস্মরণীয় ও অকাট্য প্রমাণ উন্মোচন করেছেন বিজ্ঞানীরা।
ভারতের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জিএসআই-এর ভূতত্ত্ববিদ ড. ত্রিশ্রোতা চৌধুরী ও তাঁর আন্তর্জাতিক গবেষক দল ঝাড়খন্ডের প্রাচীন ‘সিংভুম ক্র্যাটন’ অঞ্চলের এক বিশেষ পাথরের স্তরে এই প্রাচীন জীবনের প্রমাণ আবিষ্কার করেছেন। পৃথিবীর আদিমতম ভূত্বকের এই অংশের সিলিকাযুক্ত স্তরীভূত পাথরে অত্যন্ত সূক্ষ্ম কার্বনের আস্তরণ খুঁজে পান তারা। গবেষণায় ধরা পড়ে, এই পাতলা স্তরগুলো আসলে কোটি কোটি বছর আগের এককোষী ব্যাকটেরিয়াদের গড়ে তোলা পিচ্ছিল কলোনি বা মাইক্রোবিয়াল ম্যাটের জীবাশ্ম।
এই কার্বন যেকোনো সাধারণ আগ্নেয়গিরির ছাই বা অজৈব পদার্থ নয়, তা প্রমাণে বিজ্ঞানীরা লেজার ও আইসোটোপ বিশ্লেষণ ব্যবহার করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, এতে হালকা কার্বন-১২ আইসোটোপের ঘনত্ব অনেক বেশি। জীবন্ত অণুজীব খাদ্য গ্রহণ ও শক্তি উৎপাদনের জৈবিক প্রক্রিয়ায় সবসময় এই হালকা কার্বন গ্রহণ করে, যা নিশ্চিত করে যে উপাদানটি একসময় জীবিত প্রাণীরই অংশ ছিল।
এই গবেষণার সবচেয়ে রোমাঞ্চকর বিষয় হলো এর সময়কাল নির্ণয় পদ্ধতি। কার্বনের স্তরের ভেতরেই আটকে ছিল আণুবীক্ষণিক ‘জিরকন’ নামে বিশেষ স্ফটিক। জিরকনকে ভূতত্ত্বের ‘টাইম ক্যাপসুল’ বলা হয়, কারণ এর ভেতরে থাকা ইউরেনিয়াম অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট নিয়মে তেজস্ক্রিয়ভাবে ক্ষয় হয়ে সিসায় পরিণত হয়। এই স্ফটিকগুলো ছিল আগ্নেয়গিরির সদ্যজাত সুচালো কণা, যা প্রমাণ করে যে পাথরটি তৈরি হওয়ার সময়েই এগুলো ভেতরে আটকে পড়েছিল। ফলে ইউরেনিয়াম ও সিসার অনুপাত মেপে বিজ্ঞানীরা এই জীবাশ্মের বয়স নির্ধারণ করেছেন প্রায় ৩৪৯ কোটি ৭০ লাখ বছর। সাধারণত জীবাশ্মের বয়স আশপাশের পাথর দেখে পরোক্ষভাবে ধারণা করা হয়। কিন্তু বিজ্ঞানের ইতিহাসে এবারই প্রথম জীবাশ্মের স্তরে থাকা উপাদান থেকে সরাসরি ও নির্ভুলভাবে জীবনের বয়স মাপা সম্ভব হলো। এই আবিষ্কার বিজ্ঞানীদের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে— পৃথিবীর বুকে প্রাণ কোনো শান্ত বা অনুকূল পরিবেশে ধীরে ধীরে জেগে ওঠেনি; বরং সৃষ্টির সূচনালগ্নে চরম বৈরী আগ্নেয় পরিবেশের মধ্যেও নিজেকে খাপ খাইয়ে নিয়ে জীবনের জয়যাত্রা শুরু করেছিল।






