ঢাকায় নতুন সিনেমাটিক ক্যামেরার ঝলক

রাজধানী ঢাকায় উন্মোচিত হলো সনির সিনেমাটিক ক্যামেরা ‘এফএক্স ৫’। শক্তিশালী এই ক্যামেরা নিয়ে লিখেছেন ইমরানুর রহমান
রাজধানী ঢাকার ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলের জাঁকজমকপূর্ণ আবহে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি ব্র্যান্ড সনি দেশের চলচ্চিত্র ও ভিডিওগ্রাফি অঙ্গনে হাজির হয়েছে নতুন চমক নিয়ে। ‘লাইটিং দ্য ওয়ে ফরোয়ার্ড’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত সেই আলো ঝলমলে অনুষ্ঠানে দেশের পেশাদার চিত্রগ্রাহক, চলচ্চিত্র নির্মাতা ও গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের উপস্থিতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের বাজারে আনা হলো বহুল প্রতীক্ষিত ফুল ফ্রেম সিনেমা ক্যামেরা ‘সনি এফএক্স ফাইভ’।
ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং বা দৃশ্যভাষার নান্দনিকতাকে পরবর্তী ধাপে নিয়ে যেতে ক্যামেরাটিতে যুক্ত করা হয়েছে সনির সর্বাধুনিক ফুল স্ট্যাকড এক্সমোর আরএস সিএমওএস সেন্সর এবং অত্যন্ত শক্তিশালী বায়োঞ্জ এক্সআর২ প্রসেসিং ইঞ্জিন। পেশাদার সিনেমাটোগ্রাফির জটিল সমীকরণে যারা আলোর তীব্রতা ও অন্ধকারের গভীরতার নিখুঁত রূপান্তর খোঁজেন, তাদের জন্য এতে রয়েছে এস-লগ৩ মোডে ১৫ স্টপেরও বেশি ডায়নামিক রেঞ্জ। ফলে ফ্রেমের সবচেয়ে উজ্জ্বল আলো থেকে শুরু করে অন্ধকারতম অংশের প্রতিটি সূক্ষ্ম টেক্সচার বা তথ্য অক্ষত থাকে। আলো-আঁধারির তীব্র বৈপরীত্যেও যাতে কোনো দৃশ্য নষ্ট না হয়, সেজন্য রাখা হয়েছে তিনটি স্তরের বেস আইএসও— ৮০০, ৪০০০ ও ১২৮০০। একই সঙ্গে পুরো এফএক্স লাইনআপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এতে যুক্ত হয়েছে ডুয়াল গেইন শুটিং মোড, যা খুব কম আলোতেও দানাদার ভাব সম্পূর্ণভাবে দূর করে স্ফটিক-স্বচ্ছ ভিজ্যুয়াল উপহার দেয়।
চলচ্চিত্র নির্মাণের সুযোগকে আরও বিস্তৃত করতে এ ক্যামেরায় প্রথমবারের মতো যোগ করা হয়েছে ওপেন গেট শুটিং সুবিধা। এর মাধ্যমে সেন্সরের সম্পূর্ণ ৩:২ অনুপাত কাজে লাগিয়ে ভিডিও ধারণ করা যায়, যা পোস্ট-প্রোডাকশন বা সম্পাদনার টেবিলে সিনেমা নির্মাতাদের দেবে ফ্লেক্সিবিলিটি। রঙের সূক্ষ্মতম স্তর নিয়ে স্বাধীনভাবে কাজের সুযোগ দিতে এতে সরাসরি ক্যামেরার ভেতরেই সনির নিজস্ব ১৬-বিট এক্স-ওসিএন RAW ফরম্যাটে রেকর্ডিংয়ের সুবিধা রাখা হয়েছে। বিশাল আকৃতির RAW ফাইল প্রক্রিয়াজাতকরণের গতি বাড়াতে এবং স্টোরেজ ব্যবস্থাপনা সহজ করতে সংযুক্ত করা হয়েছে এক্স-ওসিএন সি১ ও সি২ নামের দুটি অত্যাধুনিক নতুন কোডেক। শুধু বড় পর্দা নয়, ধীরগতির ড্রামাটিক ভিজ্যুয়ালের চাহিদাকে মাথায় রেখে ক্যামেরাটি ৫কে রেজল্যুশনে প্রতি সেকেন্ডে ৬০ ফ্রেম, ৪কে রেজল্যুশনে ১২০ ফ্রেম এবং ফুল এইচডিতে চোখধাঁধানো ২৪০ ফ্রেম পর্যন্ত হাই-স্পিড রেকর্ডিং করতে সক্ষম।
আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়ায় ক্যামেরাটির অটোফোকাস সিস্টেমে এনেছে চমক। মানুষের চলাফেরা কিংবা জটিল অঙ্গভঙ্গি নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে এতে ব্যবহৃত হয়েছে ‘হিউম্যান পোজ এস্টিমেশন’ প্রযুক্তি। এর মাধ্যমে আলো স্বল্পতা বা দ্রুতগতির মুভমেন্টের মধ্যেও মানুষের চোখ, মাথা ও শরীরের অবস্থান ট্র্যাক করে ফোকাসকে একদম সঠিক জায়গায় লক করে রাখা যায়। ফ্রেমের রঙের ভারসাম্য অটুট রাখতে কাজ করে অটো ট্রেসিং হোয়াইট ব্যালান্স বা এটিডব্লিউ ব্যবস্থা। ডিপ লার্নিং অ্যালগরিদমের সঙ্গে দৃশ্যমান আলো ও ইনফ্রারেড সেন্সরের সমন্বয়ে এটি চারপাশের আলো-ছায়ার সূক্ষ্মতম পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে ঘরের ভেতরের বা ছায়াচ্ছন্ন অংশের প্রাকৃতিক রঙের টোন নিখুঁতভাবে বজায় রাখে।
চলমান অবস্থায় বা রান-অ্যান্ড-গান শুটিংয়ের ক্ষেত্রে হাতের অতিরিক্ত ঝাঁকুনি দূর করতে এতে রয়েছে ৫-অ্যাকসিস ইন-বডি অপটিক্যাল ইমেজ স্ট্যাবিলাইজেশন, যার রোল কারেকশন রেঞ্জ আগের যেকোনো মডেলের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ শক্তিশালী। দৃশ্য ধারণের যেকোনো প্রতিকূল কোণ থেকে সহজে নিয়ন্ত্রণের সুবিধার্থে যুক্ত করা হয়েছে সাড়ে তিন ইঞ্চি মাপের ৪-অ্যাকসিস মাল্টি-অ্যাঙ্গেল টাচস্ক্রিন মনিটর, যার প্রায় ২৭ লাখ ৬০ হাজার ডটের ডিসপ্লে প্রতিটি ফ্রেমকে করে তোলে জীবন্ত।
ক্যামেরা উন্মোচনের এ আয়োজনে প্রদর্শিত হয়েছে এর জন্য বিশেষভাবে তৈরি দুটি হাই-এন্ড অ্যাকসেসরিজ বা আনুষঙ্গিক যন্ত্র। তীব্র রোদের মধ্যেও নিখুঁত ফ্রেম নির্বাচন ও নজরদারির জন্য রয়েছে খুলে নেওয়ার সুবিধাযুক্ত ০.৫৮ ইঞ্চি আকারের ওএলইডি ভিউফাইন্ডার ‘ডিভিএফ-ইএল১’, যা প্রায় ৭০ লাখ ডটের আল্ট্রা-শার্প রেজল্যুশন সমৃদ্ধ। এর পাশাপাশি উচ্চমানের অডিও রেকর্ডিংয়ের জন্য আনা হয়েছে ‘এক্সএলআর-এইচ২’ হ্যান্ডল ইউনিট। ‘টপ গান: ম্যাভেরিক’ এবং ‘এফ ওয়ান: দ্য মুভি’খ্যাত অস্কারজয়ী চিত্রগ্রাহক ক্লদিও মিরান্দা ক্যামেরাটির কমপ্যাক্ট আকার, হালকা ওজন এবং যেকোনো চরম পরিবেশে অভূতপূর্ব ছবি উপহার দেওয়ার সক্ষমতার প্রশংসা করেছেন। অন্যদিকে কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড ও নেপালের দুর্গম লোকেশনে জটিল প্রকল্পে কাজ করার পর প্রখ্যাত পরিচালক গ্যারেথ এডওয়ার্ডস এটিকে দ্রুতগতির ও চ্যালেঞ্জিং প্রজেক্টের জন্য অন্যতম শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশের ভিজ্যুয়াল নির্মাতাদের জন্য সনি সিঙ্গাপুরের ব্যবস্থাপনায় এফএক্স ফাইভ ক্যামেরার সঙ্গে থাকছে ১৮ মাসের আনুষ্ঠানিক ওয়ারেন্টি সুবিধা। দেশের আধুনিক ভিজ্যুয়াল ইন্ডাস্ট্রির চাহিদাকে প্রাধান্য দিয়ে আনা এ ক্যামেরা পেশাদার সিনেমাটোগ্রাফির পুরনো ফ্রেমগুলোকেই যে এখন নতুন এক নান্দনিক মাত্রায় পৌঁছে দেবে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।









