ক্যান্সারের চিকিৎসা লুকিয়ে আছে হিমশীতল অ্যান্টার্কটিকায়

ডেজার্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের প্রধান গবেষক অ্যালিসন মারে অ্যাসিডিয়ান সিনোইকাম অ্যাডরিয়ানামের নমুনা সংগ্রহ করছেন। ছবি: স্যাম আফুলৌস
হিমশীতল বরফ আর মাইলের পর মাইল বিস্তৃত জনমানবহীন এক রহস্যময় চাদরে ঢাকা মহাদেশ অ্যান্টার্কটিকা। প্রকৃতির এই চরম প্রতিকূল পরিবেশেই এবার সন্ধান মিলেছে মানুষের ইতিহাসের অন্যতম মরণব্যাধি ক্যান্সারের মহৌষধের!
ফ্লোরিডার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা জানিয়েছেন, অ্যান্টার্কটিকার অতল জঠরে লুকিয়ে থাকা এক ক্ষুদ্র সামুদ্রিক জীবের ব্যাকটেরিয়াল টক্সিন বা বিষাক্ত উপাদান ত্বক ক্যান্সারের সবচেয়ে মারাত্মক রূপ 'মেলানোমা' (Melanoma)-র কার্যকর চিকিৎসা হয়ে উঠতে পারে।
ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা (ইউএসএফ), ডেজার্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ডিআরআই) এবং স্ক্রিপস ইনস্টিটিউশন অব ওশেনোগ্রাফি (এসআইও)-র একটি যৌথ গবেষক দল সম্প্রতি এই প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছয় সপ্তাহের এক রোমাঞ্চকর অভিযান শেষ করে ফিরেছেন।
সেখান থেকে তারা 'অ্যাসিডিয়ান' নামের এক ধরনের সামুদ্রিক অমেরুদণ্ডী প্রাণীর নমুনা সংগ্রহ করেছেন, যা মূলত 'সি স্কুইর্ট' নামে পরিচিত।
ইউএসএফ-এর রসায়নের অধ্যাপক বিল বেকার জানান, এই অ্যাসিডিয়ানগুলো শিকারী প্রাণীদের হাত থেকে নিজেদের বাঁচাতে যে টক্সিন তৈরি করে, তা চিকিৎসার কাজে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব।
তাদের দল এরই মধ্যে ল্যাবরেটরিতে গবেষণা করে দেখেছেন যে, এই টক্সিন ইঁদুরের শরীরের মেলানোমা বা ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। সবচেয়ে ভালো খবর হলো, এটি ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করলেও ইঁদুরগুলোকে মেরে ফেলেনি, যার মানে এটির একটি ওষুধের মতো কাজ করার শারীরবৃত্তীয় গুণাগুণ রয়েছে।
তবে ইঁদুরের ওপর আরও বড় পরিসরে পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রাণীর মডেলে পরীক্ষার জন্য এই উপাদানের আরও বেশি পরিমাণের প্রয়োজন। যদি এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তবেই মানুষের ওপর ট্রায়াল শুরু করা সম্ভব হবে।
বেকার অবশ্য স্বীকার করেছেন যে, মানুষের ব্যবহারের জন্য একটি নিরাপদ ও কার্যকর মেলানোমা প্রতিরোধী ওষুধ তৈরি এবং এর অনুমোদনের পথটি বেশ দীর্ঘ, কারণ ওষুধ তৈরির পরও অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত একাধিক ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে পরিচালিত এই অভিযানে ডাইভারদের দল প্রায় ১৩০ ফুট গভীরে আধ ঘণ্টা পর্যন্ত ডুব দিয়ে কাজ করেছেন। এই অভিযানের ডাইভিং সেফটি অফিসার বেন
মেইস্টার জানান, অ্যান্টার্কটিকার মাইনাস তাপমাত্রার পাশাপাশি বরফ, লেপার্ড সিল, সমুদ্রের পরিবর্তনশীল রূপ এবং কখনো কখনো অত্যন্ত কম দৃশ্যমানতার মতো চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করে সবাইকে নিরাপদ রেখে প্রতিটি ডাইভের পরিকল্পনা করতে হয়েছে।
এখন এই টক্সিন নিয়ে ল্যাবরেটরিতে কাজ চলবে, যার কিছু অংশ ডিআরআই এবং এসআইও-র সাথে যৌথভাবে ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
দলটির গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরেই এই টক্সিন মেলানোমার বিরুদ্ধে কার্যকর হতে পারে বলে সন্দেহ করছিলেন। তবে অধ্যাপক বেকার বলেন, এবারের অভিযান থেকে প্রাপ্ত নতুন জ্ঞান মেলানোমা ধ্বংসকারী ব্যাকটেরিয়াপূর্ণ ওই সামুদ্রিক জীবের জীবনপ্রণালী এবং তাদের মধ্যকার পরিবেশগত সম্পর্ক সম্পর্কে তাদের বোঝাপড়াকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই মাঠ পর্যায়ের শিক্ষা তাদের প্রাণী ও মানুষের ওপর ওষুধটির সফল প্রয়োগের ক্ষেত্রে কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয়, তা নির্ধারণে দারুণ সাহায্য করবে।
গবেষকরা এই দীর্ঘ ও কঠিন সফর থেকে অত্যন্ত ক্লান্ত হয়ে ফিরলেও ল্যাবরেটরি পর্যায়ের কাজ নিয়ে বেশ উত্তেজিত। এখন তাদের মূল কাজ হবে ল্যাবে কৃত্রিম উপায়ে এই টক্সিন তৈরি করার উপায় খুঁজে বের করা। কারণ একটি বাস্কেটবলের আকারের অ্যাসিডিয়ান থেকে প্রয়োজনীয় মেটাবোলাইটের মাত্র এক হাজার ভাগের এক ভাগ পাওয়া যায়। অ্যান্টার্কটিকা থেকে হাজার হাজার বাস্কেটবল পরিমাণ অ্যাসিডিয়ান তুলে আনলে সেখানকার পরিবেশ ধ্বংস হয়ে যাবে, তাই ল্যাবে এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি।
১৯৯০ সালে সামুদ্রিক জীববিজ্ঞান ও রসায়ন নিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা বেকার জানান, ফুড অ্যান্ড Drug অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এফডিএ) অনুমোদিত অর্ধেকেরও বেশি ওষুধ প্রাকৃতিক উৎস থেকেই আসে।স্পঞ্জ, কোরাল বা টিউনিকেটের মতো নানা সামুদ্রিক জীব নিয়ে কাজ করলেও মেলানোমা নিরাময়ের এই আবিষ্কারকে তিনি তার ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ সাফল্য হিসেবে দেখছেন।
পেট্রি ডিশ বা গবেষণাগারের পাত্রে ক্যান্সার কোষ ধ্বংস করা সহজ হলেও এর পরের ধাপগুলো পার হওয়া অত্যন্ত কঠিন। তারা ইতিমধ্যে কিছু বড় বাধা পার হতে পেরেছেন, যা তাদের জন্য অত্যন্ত রোমাঞ্চকর এবং এখন তারা পরবর্তী বাধাগুলো পার হওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।




