টিভি-কম্পিউটারের স্ক্রিন কি ঘুম নষ্টের বড় কারণ?

প্রতীকী ছবি
এক দশক ধরে আমাদের মনে গভীরভাবে গেঁথে গেছে একটি ধারণা। তা হলো মোবাইল, টিভি বা কম্পিউটারের স্ক্রিনের আলোই নাকি ঘুমের সবচেয়ে বড় শত্রু। বিশেষ করে ‘নীল আলো’ ঘিরে তৈরি হয়েছে এক ধরনের আতঙ্ক। কিন্তু বাস্তবতা আরও বিস্তৃত ও জটিল। আধুনিক গবেষণা বলছে, সমস্যার মূল কারণ শুধু ফোনের নীল আলোই নয়; বরং এখানে বড় ভূমিকা রাখে আমাদের পুরো জীবনযাপনই।
নীল আলো নিয়ে উদ্বেগের পেছনে রয়েছে কিছু বৈজ্ঞানিক ভিত্তি। মানবদেহের ঘুমের ছন্দ বা সার্কাডিয়ান রিদম মূলত নির্ভর করে আলোর ওপর। চোখে থাকা একটি আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিন ‘মেলানপসিন’ বিশেষভাবে নীল আলোর প্রতি সংবেদনশীল। এটি শরীরকে জানান দেয় কখন জেগে থাকতে হবে আর ঘুমাতে হবে। এ কারণেই ধারণা তৈরি হয়েছে যে স্ক্রিন থেকে আসা নীল আলো ব্যাঘাত ঘটায় ঘুমের।
২০১৪ সালের একটি আলোচিত গবেষণায় দেখা যায়, যারা ঘুমানোর আগে ট্যাবলেট ব্যবহার করেছিলেন, তারা তুলনামূলকভাবে দেরিতে ঘুমিয়েছেন, তাদের শরীরে মেলাটোনিন কম তৈরি হয়েছে এবং পরদিন তারা বেশি ক্লান্ত অনুভব করেছেন। এ গবেষণাই মূলত নীল আলো নিয়ে মানুষের মনে সূচনা করে আতঙ্কের।
কিন্তু পরবর্তী বিশ্লেষণে দেখা গেছে, এ ধরনের গবেষণার পরিবেশ বাস্তব জীবনের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। ল্যাবরেটরিতে অংশগ্রহণকারীদের খুব কম আলোয় রেখে হঠাৎ উজ্জ্বল আলোয় নেওয়া হয়, যা স্বাভাবিক দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বর্তমান গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, স্ক্রিন থেকে আসা আলো আসলে এতটাই কম যে, তা ঘুমের ওপর বড় কোনো প্রভাব ফেলে না। একাধিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, স্ক্রিন ব্যবহারের ফলে ঘুম আসতে দেরি হয় গড়ে মাত্র কয়েক মিনিট। এমনকি একটি গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, সারা দিনে ডিজিটাল ডিভাইস থেকে যে পরিমাণ নীল আলো পাওয়া যায়, তা সূর্যের আলোয় এক মিনিট থাকার সমানও নয়।
এখানেই স্পষ্ট হয় সমস্যার কেন্দ্রবিন্দু অন্য কোথাও। আধুনিক জীবনযাপনে মানুষ দিনে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো পায় না, আবার রাতে কৃত্রিম আলোয় বেশি সময় কাটায়। অনেকেই ঘরের ভেতর একই ধরনের আলোতে দিন-রাত পার করে, ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ ঘড়ি বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। শরীর ঠিকভাবে বুঝতে পারে না কখন জেগে থাকার সময় আর কখন বিশ্রামের সময়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো ঘুমের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো দিনের আলো এবং রাতের অন্ধকারের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য তৈরি করা। সকালে প্রাকৃতিক সূর্যালোকে থাকা, দিনে উজ্জ্বল পরিবেশে কাজ করা এবং সন্ধ্যার পর ধীরে ধীরে আলো কমিয়ে আনা— এই সহজ অভ্যাসগুলোই সঠিকভাবে কাজ করতে সাহায্য করে শরীরের ঘড়িকে। তুলনামূলকভাবে ঘরের আলো খুবই কম শক্তিশালী, যেখানে বাইরের সূর্যালোক হাজার গুণ বেশি উজ্জ্বল। এই পার্থক্যই আমাদের ঘুমের ছন্দ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখে।
অন্যদিকে, স্ক্রিনের সবচেয়ে বড় সমস্যা আলো নয়, বরং এর ভেতরের কনটেন্ট। রাতের বেলা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ভিডিও বা উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়বস্তু মস্তিষ্ককে সক্রিয় করে রাখে, যা ঘুমের পথে বড় বাধা। ফলে সমস্যা প্রযুক্তির আলোয় নয়, বরং প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরনে।
এ ছাড়া ঘুমের আগে নির্দিষ্ট কিছু অভ্যাস বা রুটিন তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। আলো কমিয়ে আনা, ফোনে নাইট মুড ব্যবহার, শান্ত পরিবেশ তৈরি করা বা বই পড়ার মতো কাজগুলো শরীরকে ধীরে ধীরে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করে। এসব অভ্যাস সরাসরি ঘুমের গুণগত মান বদলে না দিলেও মস্তিষ্ককে একটি স্পষ্ট সংকেত দেয়— এখন ঘুমানোর সময়।
সব মিলিয়ে, নীল আলোকে একমাত্র দোষী ভাবার প্রবণতা অনেকটাই অতিরঞ্জিত। বাস্তবে ভালো ঘুমের জন্য প্রয়োজন সঠিক আলো-ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত জীবনযাপন এবং সচেতন স্ক্রিন ব্যবহার। দিনে বেশি আলো, রাতে কম এবং ঘুমের আগে মানসিক প্রশান্তি— এ তিনটিই সুস্থ ঘুমের মূল চাবিকাঠি।
সূত্র: বিবিসি

