ব্যর্থতার গল্প লিখেই চলছে যুক্তরাষ্ট্র, রেখে যাচ্ছে দগদগে ক্ষত
- যুক্তরাষ্ট্র দাঁড়িয়েছে ভূমিপুত্রদের রক্ত ও কান্নার ওপর
- আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগর—ইউরোপ ও এশিয়ার সংঘাত থেকে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত রেখেছে ওয়াশিংটনকে
- দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সত্যিকার অর্থে ‘সুপার পাওয়ার’ হয়ে ওঠে দেশটি
- দেশে দেশে যুদ্ধে জড়িত ওয়াশিংটন

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় ইরানের একটি স্কুলে নিহত শিশুদের দাফনের করা হয়েছে এসব কবরে।
ব্রিটেনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আট বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর স্বাধীনতা পায় যুক্তরাষ্ট্র। ব্রিটিশরাজের শোষণ ও অতিরিক্ত করের প্রতিবাদে ১৩টি রাজ্য ১৭৭৬ সালের ৪ জুলাই ঘোষণা করে স্বাধীনতা। পরে ১৭৮১ সালে ইয়র্কটাউনের যুদ্ধ জিতে গেলে পরাজয় মেনে নেয় যুক্তরাজ্য।
এর দুবছর পর ১৭৮৩ সালে লন্ডনের সঙ্গে প্যারিস চুক্তির মাধ্যমে জর্জ ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তীতে নানা সময়ে কাছাকাছি থাকা অন্য রাজ্যগুলোকে যুক্ত করে সীমানা ও শক্তি বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন।
বর্তমানে বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ ও লুটের মানসিকতা দেখি আমরা, যা রাষ্ট্রটি গঠনের সময় থেকেই হয় শুরু।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিপুত্র আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে বাইরে থেকে আসা ইউরোপিয়ান সেটেলাররা তৈরি করে বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র।
আমেরিকা আবিষ্কারের পর কলম্বাস যাদের নাম দেন রেড ইন্ডিয়ান।
ইউরোপের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমি আবিষ্কারের পর দলে দলে বসতি স্থাপনকারীরা পাড়ি জমায় এখানে। যুক্তরাষ্ট্রে এসে রেড ইন্ডিয়ানদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ, গণহত্যা, মহামারি ছড়িয়ে ভূমি দখলে নেয় তারা।
১৮৩০ সালের ইন্ডিয়ান রিমুভাল অ্যাক্ট অনুযায়ী পৈতৃক ভিটা থেকে পশ্চিমে সরিয়ে দেওয়া হয় হাজার হাজার আদিবাসীকে। বাস্তুচ্যুত হয়ে নতুন আশ্রয়ের আশায় দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয় রেড ইন্ডিয়ানরা। এতে ক্ষুধা ও ঠান্ডায় মৃত্যু হয় হাজার হাজার মানুষের, যা ইতিহাসে ‘ট্রেইল অব টিয়ারস’ নামে পরিচিত।
এ ছাড়া ‘ইন্ডিয়ান ওয়ারস’ নাম দিয়ে জমি দখলের জন্যে অসংখ্য আদিবাসীকে নির্বিচারে হত্যা করে ইউরোপিয়ান সেটেলাররা।
ইউরোপিয়ানদের নিয়ে আসা গুটিবসন্ত ও হামের মতো মহামারির কারণেও মৃত্যু হয় লাখ লাখ আদিবাসীর। অপরিচিত এসব রোগ প্রতিরোধের কোনো ক্ষমতা ছিল না তাদের।
বিংশ শতাব্দী নাগাদ আমেরিকান আদিবাসীদের জনসংখ্যা কয়েক কোটি থেকে কমে নেমে আসে মাত্র কয়েক লাখে।
এভাবেই ভূমিপুত্রদের রক্ত ও কান্নার ওপর দাঁড়িয়ে গঠন হয় বর্তমান যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের সুপার পাওয়ার হয়ে ওঠা
মাত্র ২৫০ বছরেরও কম সময়ে সাধারণ একটি কোলোনি থেকে বিশ্বের একক পরাশক্তিতে পরিণত হয় যুক্তরাষ্ট্র। এই বিস্ময়কর উত্থানের পেছনে প্রথম কারণটি ছিল ভৌগোলিক সুবিধা।
স্বাধীনতার পর উত্তর আমেরিকা মহাদেশে দ্রুত নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। ১৮০৩ সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে ‘লুইজিয়ানা পারচেজ’-এর মাধ্যমে দেশটির আয়তন রাতারাতি দ্বিগুণ হয়, যা বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ ও কৃষিজমির মালিক করে তাদের। আটলান্টিক ও প্রশান্ত মহাসাগর— এই দুই বিশাল মহাসাগর ইউরোপ ও এশিয়ার সংঘাত থেকে প্রাকৃতিকভাবে সুরক্ষিত রেখেছিল যুক্তরাষ্ট্রকে।
১৯ শতকের শেষভাগে শিল্প বিপ্লবের শীর্ষে পৌঁছায় আমেরিকা। ১৮৮০-এর দশকের মাঝামাঝি ইস্পাত উৎপাদনে ব্রিটেনকে ছাড়িয়ে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতিতে পরিণত হয় তারা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের দেশগুলোর যখন যুদ্ধে ক্ষতি হচ্ছিল, তখন তাদেরই অস্ত্র ও ঋণ সরবরাহ করে বিশ্ব অর্থনীতিতে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে ওয়াশিংটন।
১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সত্যিকার অর্থে ‘সুপার পাওয়ার’ হিসেবে আবির্ভূত হয় যুক্তরাষ্ট্র। এ সময় ইউরোপ ও এশিয়া ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। তখন আমেরিকার শিল্প অবকাঠামো ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত।
পারমাণবিক অস্ত্রের একমাত্র মালিক হিসেবে ব্রেটন উডস চুক্তির মাধ্যমে ডলারকে বিশ্ব মুদ্রায় রূপান্তর করে তারা।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী কয়েক দশক সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে স্নায়ুযুদ্ধে লিপ্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর ওয়াশিংটন হয়ে ওঠে বিশ্বের একমাত্র ‘হাইপার-পাওয়ার’।
এর পর থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক ঘাঁটি স্থাপন, ন্যাটো গঠন, গোয়েন্দা বাহিনীসহ সরাসরি আগ্রাসনের মাধ্যমে সামরিক প্রভাব বজায় রাখে দেশটি।
তবে প্রায় সব যুদ্ধ থেকেই পরাজয়ের কলঙ্ক নিয়ে ফিরতে হয়েছে মার্কিনিদের। কিন্তু পালানোর আগে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে রেখে গেছে দেশগুলোকে। যে ক্ষত দেশগুলো বয়ে বেড়াচ্ছে এখনো।
আমেরিকার লজ্জা ভিয়েতনাম যুদ্ধ
বিংশ শতাব্দীর অন্যতম রক্তক্ষয়ী সংঘাত ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধ। মূলত উত্তর ভিয়েতনামের রুশপন্থি কমিউনিস্ট শাসন এবং দক্ষিণ ভিয়েতনামের ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমাঘেঁষা সরকারের মধ্যকার আদর্শিক দ্বন্দ্ব থেকে এই যুদ্ধের সূত্রপাত।
ভিয়েতনাম কমিউনিস্টদের দখলে গেলে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্য দেশগুলোতেও সমাজতন্ত্র ছড়িয়ে পড়বে বলে মনে করেছিল যুক্তরাষ্ট্র।
এ আশঙ্কায় যুক্তরাষ্ট্র পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে ১৯৬৫ সালে।
দীর্ঘ এক দশকের এই যুদ্ধে নজিরবিহীন ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হতে হয়েছে পেন্টাগনকে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী এ যুদ্ধে প্রায় ৫৮ হাজারের বেশি মার্কিন সৈন্য নিহত হন এবং আহত হন ৩ লাখের বেশি। অর্থনৈতিকভাবেও চরম ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমেরিকা। যুদ্ধ পরিচালনায় দেশটি তৎকালীন সময়ে প্রায় ব্যয় করে ১৬৮ বিলিয়ন ডলার, যা দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রাস্ফীতি ও ঋণের বোঝা তৈরি করে মার্কিন অর্থনীতিতে।
তবে এর বাইরেও সবচেয়ে বড় ক্ষতি ছিল ‘মনস্তাত্ত্বিক’। বিশ্বের অন্যতম শক্তিশালী সামরিক শক্তি হওয়া সত্ত্বেও গেরিলা যোদ্ধাদের কাছে হেরে আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হয় আমেরিকান বাহিনীর।
দেশের অভ্যন্তরে যুদ্ধবিরোধী গণআন্দোলন মার্কিন সমাজে গভীর বিভাজন সৃষ্টি করে, যা আজও পরিচিত ‘ভিয়েতনাম সিনড্রোম’ নামে।
শেষ পর্যন্ত ১৯৭৫ সালে সায়গনের পতনের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ করে ওয়াশিংটন, যা এক তিক্ত পরাজয়ের অধ্যায় হিসেবে গণ্য হয় আমেরিকার ইতিহাসে।
দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধে এক মানবিক ও পরিবেশগত বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিল ভিয়েতনাম।
এই যুদ্ধে প্রাণ হারান উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের প্রায় ২০ লাখের বেশি সাধারণ মানুষ এবং প্রায় ১১ লাখ সৈন্য।
যুদ্ধের ভয়াবহতায় দেশটির অসংখ্য পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং লাখ লাখ মানুষ বরণ করে পঙ্গুত্ব।
কেবল জীবনহানি নয়, ভিয়েতনামের প্রকৃতি ও অবকাঠামোতেও ক্ষতি হয় অপূরণীয়। মার্কিন বাহিনীর নির্বিচার বোমা বর্ষণ এবং রাসায়নিক অস্ত্র ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’-এর প্রভাবে ধ্বংস হয়ে যায় দেশটির বিশাল বনভূমি ও কৃষিজমি।
এই বিষাক্ত রাসায়নিকের প্রভাবে আজও বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম হচ্ছে ভিয়েতনামে।
দীর্ঘ যুদ্ধের ফলে দেশটির রাস্তাঘাট, সেতু এবং শিল্প-কারখানা সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে পড়ায় কয়েক দশক পিছিয়ে যায় অর্থনীতি।
১৯৭৫ সালে যুদ্ধ শেষ হলেও সেই ধ্বংসলীলার ক্ষত আজও বয়ে বেড়াচ্ছে ভিয়েতনামি সমাজ।
আফগানিস্তান থেকে শূন্য হাতে পলায়ন
২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমেরিকায় আল-কায়েদার সন্ত্রাসী হামলার পর জর্জ ডব্লিউ বুশ আফগানিস্তানে শুরু করেন সামরিক অভিযান।
হামলার পরিকল্পনাকারী ওসামা বিন লাদেনকে ধরা ছিল এই যুদ্ধের মূল লক্ষ্য। একইসঙ্গে মার্কিনিরা চেয়েছিল তালেবান সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে, যারা আশ্রয় দিয়েছিল লাদেনকে।
কিন্তু দীর্ঘ ২০ বছর পর সেই তালেবান সরকারের হাতে ক্ষমতা দিয়েই পালায় মার্কিন বাহিনী।
২০২১ সালের আগস্টে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে এই যুদ্ধের।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এটি ছিল দীর্ঘতম যুদ্ধ।
ব্রাউন ইউনিভার্সিটির তথ্যমতে, এই যুদ্ধে প্রায় ২ হাজার ৪৫৯ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারান এবং আহত হন ২০ হাজারের বেশি।
এ ছাড়া নিহত হন প্রায় ৩ হাজার ৯০০ মার্কিন বেসামরিক ঠিকাদারও।
অর্থনৈতিকভাবেও এটি ছিল এক বিশাল বোঝা। এই যুদ্ধে প্রায় ২.২৬ ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয় করে ওয়াশিংটন।
দুই দশকের এই যুদ্ধে মারা গেছেন অন্তত ৬৬ হাজার বেসামরিক মানুষ এবং প্রায় ৬৯ হাজার আফগান সামরিক ও পুলিশ সদস্য।
যুদ্ধের কারণে দেশটির অর্থনীতি ও অবকাঠামো ভেঙে পড়ে এবং শরণার্থী হিসেবে বিদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় ২৭ লাখ আফগান।
দেশটির অভ্যন্তরেও বাস্তুচ্যুত হয় আরও প্রায় ৪০ লাখ বাসিন্দা।
সর্বপ্রাচীন সভ্যতায় আর ফেরেনি শান্তি
২০০৩ সালের ২০ মার্চ মার্কিন নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনী হামলা চালায় ইরাকে। এই যুদ্ধের প্রধান কারণ হিসেবে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ দাবি করেছেন, ইরাকের কাছে আছে গণবিধ্বংসী অস্ত্র।
এ ছাড়া সাদ্দাম হোসেনের সঙ্গে আল-কায়েদার যোগসাজশ এবং দেওয়া হয় দেশটিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার যুক্তি।
যদিও পরবর্তী সময়ে ইরাকে অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি কোনো গণবিধ্বংসী অস্ত্রের।
দীর্ঘস্থায়ী এই যুদ্ধে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয় ইরাক।
বিভিন্ন তথ্যমতে, এ যুদ্ধে প্রাণ হারান প্রায় ২ থেকে ৫ লাখ বেসামরিক মানুষ। সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় দেশটির অবকাঠামো। কয়েক লাখ মানুষ হয় বাস্তুচ্যুত। সবচেয়ে প্রাচীন মেসোপোটেমিয়ান সভ্যতার অনেক নির্দশন হয় ধ্বংস।
যুদ্ধ শেষ হলেও দেশটিতে আর আসেনি স্থিতিশীলতা। অস্থিরতার সুযোগে হয়েছে আইএসআইএসের মতো উগ্রবাদী গোষ্ঠীর উত্থান।
এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়ক্ষতি হয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। নিহত হন প্রায় ৪ হাজার ৫০০ মার্কিন সেনা এবং আহত হন ৩২ হাজারের বেশি।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই যুদ্ধও ছিল অত্যন্ত ব্যয়বহুল। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, এই যুদ্ধের পেছনে ব্যয় হয়েছে মার্কিন সরকারের প্রায় ২ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি।
আন্তর্জাতিক মহলে ওয়াশিংটনের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে এ যুদ্ধ। স্বাধীন দেশে এই সামরিক হস্তক্ষেপের বৈধতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে সৃষ্টি হয় তীব্র বিতর্ক।
ইউক্রেনে যুক্তরাষ্ট্রের ‘প্রক্সি যুদ্ধ’
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাশিয়া পূর্ণ মাত্রায় হামলা চালায় ইউক্রেনে। ক্রেমলিনের অভিযোগ, গত কয়েক দশক ধরে আমেরিকা বাড়িয়েছে ন্যাটোর সীমানা। এই সামরিক জোটের সীমানা প্রায় পৌঁছে গেছে রাশিয়ার দোরগোড়ায়, যা মস্কোর জাতীয় নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি।
মস্কোর দাবি, ২০০৮ থেকে ইউক্রেনকে ন্যাটোতে অন্তর্ভুক্ত করার চূড়ান্ত উসকানি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুদ্ধের শুরু থেকেই ইউক্রেনকে বিলিয়ন ডলারের অত্যাধুনিক অস্ত্র, গোয়েন্দা তথ্য এবং সামরিক প্রশিক্ষণ দিয়ে আসছে ওয়াশিংটন।
রাশিয়ার দাবি, এর মাধ্যমে আমেরিকা মূলত একটি ‘প্রক্সি যুদ্ধ’ চালাচ্ছে মস্কোর বিরুদ্ধে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনকে ব্যবহার করে দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের মাধ্যমে রাশিয়ার অর্থনীতি ও সামরিক শক্তিকে নিঃশেষ করে দেওয়াই আমেরিকার মূল লক্ষ্য। আর এতে প্রাণ যাচ্ছে বেসামরিক ইউক্রেনিয়ানদের। এ ছাড়া ইতোমধ্যে মস্কোর কাছে ভৌগোলিক সীমানার ১০ ভাগের বেশি হারিয়েছে কিয়েভ।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পশ্চিমা বিশ্লেষকদের অনুমান অনুযায়ী, এ যুদ্ধে ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীর হতাহতের সংখ্যা প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখের মধ্যে।
তবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এক বিবৃতিতে উল্লেখ করেন, যুদ্ধে নিহত হয়েছে প্রায় ৫৫ হাজার সৈন্য।
জাতিসংঘের তথ্যমতে, ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত কমপক্ষে ১৫ হাজার ১৭২ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আহত ৪১ হাজার ৩৭৮ জন ইউক্রেনিয়ান। ধারণা করা হয়, আসল সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে কয়েক কোটি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন। হয়েছেন অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক শরণার্থী।
বর্তমানে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের দীর্ঘতম রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পরিণত হয়েছে ইউক্রেন সংঘাত।
আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে মাদুরোকে অপহরণ
২০২৬ সালের ৩ জানুয়ারি ভোরে মার্কিন স্পেশাল ডেল্টা ফোর্স ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে চালায় বিশেষ অভিযান। তারা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে নিজ বাসভবন থেকে সস্ত্রীক অপহরণ করে নিয়ে আসে যুক্তরাষ্ট্রে। মাদক ও সন্ত্রাসবাদের মামলায় তাকে দেখানো হয় গ্রেপ্তার।
একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশের শীর্ষ নেতাকে অপহরণের ঘটনাটি আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
এ বিষয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞ প্রফেসর মার্ক ওয়েলারের মত, মাদুরোকে আটকের এই সামরিক অভিযান ভেনেজুয়েলার সার্বভৌমত্ব এবং জাতিসংঘ সনদের স্পষ্ট লঙ্ঘন।
তিনি যুক্তি দেন, একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টকে বলপূর্বক তুলে আনা কোনোভাবেই ‘আইন প্রয়োগকারী অভিযান’ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। এটি আন্তর্জাতিক আইনের একটি মূল স্তম্ভ অর্থাৎ ‘অন্য রাষ্ট্রের ওপর বল প্রয়োগের নিষেধাজ্ঞা’ নীতিকে অবজ্ঞা করার শামিল।
বার্কলে ল স্কুলের প্রফেসর সায়রা মোহাম্মদের মতে, এই অভিযান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার অন্যতম ভিত্তি—জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদ—লঙ্ঘন করেছে।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, এই ঘটনা রাষ্ট্রপ্রধানদের যে আন্তর্জাতিক আইনি সুরক্ষা বা ব্যক্তিগত দায়মুক্তি থাকে, তাকেও ফেলেছে গুরুতরভাবে প্রশ্নের মুখে।
ইরানের চোরাবালিতে আটকা ওয়াশিংটন
সর্বশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারি ভোরে ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এতে নিহত হন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা।
জবাবে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে থাকা মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় পাল্টা হামলা করে তেহরান।
পাশাপাশি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয় ইরান। ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ মার্চের শুরুতে তেহরানের পক্ষে যুদ্ধে যোগ দিলে লেবাননে নির্বিচার হামলা চালায় ইসরায়েল।
আমেরিকার হামলায় নিহত হয়েছেন স্কুল শিক্ষার্থী, নারী-শিশুসহ প্রায় ২০০০ বেসামরিক ইরানি। অন্যদিকে ইসরায়েলের লেবাননে নির্বিচার হামলায় এখন পর্যন্ত নিহত হয়েছে আড়াই হাজারের অধিক বেসামরিক লেবানিজ।
আক্রমণ চালানোর কারণ হিসেবে কখনো ইরানের শাসনব্যবস্থায় পরিবর্তন আবার কখনো দেশটিকে পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে না দেওয়ার যুক্তি দেয় ওয়াশিংটন। ৪০ দিনের যুদ্ধেও লক্ষ্য পূরণ হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের। উল্টো পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় গত বুধবার হয়েছে সাময়িক যুদ্ধবিরতি।
ইসলামাবাদে শুক্রবার স্থায়ী চুক্তির জন্য বসে দুপক্ষের শীর্ষ নেতৃত্ব। যদিও তা গেছে ভেস্তে। এখন আবার ট্রাম্প ইরানের অর্থনীতিকে ধ্বংস করতে দিয়েছেন ইরানের নিয়ন্ত্রণে থাকা হরমুজ অবরোধের ঘোষণা।
যদিও ইসরায়েল ছাড়া মিত্র কাউকে পাশে পাচ্ছেন না ট্রাম্প। অবরোধের পাল্টা কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।
বিশ্লেষকদের মত, ইসরায়েলের যুদ্ধ নিজ কাঁধে টেনে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। মধ্যপ্রাচ্যকে আবারও রক্তাক্ত করেছে অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধের মাধ্যমে।
ইরানের সক্ষমতা যাচাই করতে না পারায় বড় আকারের অস্বস্তি ও সংঘাতের চোরাবালিতে আটকে গেছে ওয়াশিংটন।






