কংক্রিটের থেকেও শক্ত যে বরফ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির কাঠের মণ্ডযুক্ত বরফ দিয়ে বিমানবাহী রণতরী তৈরির এক অভিনব পরীক্ষা চালিয়েছিল। ‘পাইক্রিট’ নামের সেই উপাদানটি কংক্রিটের মতো শক্ত হলেও তা জমাট রাখা ছিল বেশ কঠিন। পরবর্তীতে খরচ বৃদ্ধি এবং উন্নত বিকল্প পাওয়ায় সেই প্রকল্প বাতিল করা হয়। তবে সম্প্রতি ইসরায়েলের হিব্রু ইউনিভার্সিটি অব জেরুজালেমের একদল গবেষক সেই পুরোনো ধারণাকেই নতুন রূপ দিয়ে তৈরি করেছেন ‘বায়োপাইক্রিট’।
এই নতুন উপাদানে সাধারণ বরফের সাথে উদ্ভিদভিত্তিক ক্রিস্টাল ও বিশেষ প্রোটিন যুক্ত করা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ বরফের তুলনায় এটি ১০ গুণ বেশি শক্তিশালী এবং ভেঙে যাওয়ার আগে প্রায় ৭০ গুণ বেশি শক্তি শোষণ করতে সক্ষম। গবেষণার এই ফলাফল ‘কলোয়েডস অ্যান্ড সারফেসেস বি: বায়োইনটারফেসেস’ নামক জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষকদের লক্ষ্য যুদ্ধজাহাজ তৈরি নয়, বরং আর্কটিক ও অ্যান্টার্কটিকের মতো চরম ঠান্ডার দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে পরিবেশবান্ধব নির্মাণকাজে এর ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রচলিত কংক্রিট বা স্টিলের বদলে বরফ এবং উদ্ভিদভিত্তিক সেলুলোজ দিয়ে তৈরি হওয়ায় এই উপাদানের কার্বন ফুটপ্রিন্ট অত্যন্ত কম এবং এটি সম্পূর্ণ বায়োডিপেডেবল। নির্মাণশিল্প যখন বিশ্বজুড়ে মারাত্মক পরিবেশদূষণের জন্য দায়ী, তখন এমন টেকসই উপাদান এক নতুন বিপ্লব ঘটাতে পারে।
ঐতিহাসিক পাইক্রিটে কাঠের মণ্ড ব্যবহার করা হলেও বায়োপাইক্রিটে ব্যবহার করা হয়েছে ‘সেলুলোজ ন্যানোক্রিস্টাল’। উদ্ভিদের প্রধান গাঠনিক উপাদান এই সেলুলোজ ন্যানোক্রিস্টাল বরফের ভেতর ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র রিইনফোর্সমেন্ট হিসেবে কাজ করে, যা ফাটল ছড়াতে বাধা দেয়। এছাড়া গবেষকরা ‘সিবিএমথ্রিএ-এএফপিথ্রি’ নামের একটি বিশেষ প্রোটিন ব্যবহার করেছেন। এটি আঠার মতো কাজ করে সেলুলোজ ন্যানোক্রিস্টাল ও বরফকে দৃঢ়ভাবে একসাথে বেঁধে রাখে।
হিব্রু ইউনিভার্সিটির বায়োকেমিস্ট ইডো ব্রাসলাভস্কির মতে, তারা কেবল বরফের সাথে ফাইবার মেশাননি, বরং অণুপর্যায়ে উপাদানগুলোর সংযোগ কেমন হবে তা নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এর ফলে বরফ হঠাৎ ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যায় না, বরং ক্রমান্বয়ে শক্তি শোষণ করে ধীরে ধীরে বিকৃত হয়।
এটি বর্তমানে একটি ছোট আকারের প্রুফ অব কনসেপ্ট পরীক্ষা। দীর্ঘ সময় এবং পরিবর্তনশীল আবহাওয়ায় বায়োপাইক্রিট কতটা টিকসই হয়, তা যাচাই করতে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। তবে গবেষকদের মতে, প্রোটিন ডিজাইন ও স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মেলবন্ধনে তৈরি এই ‘সুপার আইস’ ভবিষ্যতে প্যাকেজিং থেকে শুরু করে চরম পরিবেশের নির্মাণকাজে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।



