কোন ছবিটি আসল, আর কোনটি এআইয়ের তৈরি?

ড. ক্লেয়ার সাদারল্যান্ডের হাতে ধরা ছবির একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার তৈরি। ভেবে বের করুন নিজেই। আর নয়ত উত্তর ফিচারেই আছে। ছবি: বিবিসি
ড. ক্লেয়ার সাদারল্যান্ড তার হাতে দুটি বড় ছবি ধরে আছেন। এর একটিতে দেখা যাচ্ছে আন্তর্জাতিক এক গবেষণা দলের প্রধান, একজন অস্ট্রেলীয় অধ্যাপকের আসল চেহারা; আর অন্যটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) দ্বারা তৈরি একটি ‘ডিপফেক’ বা নকল ছবি।
বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাস্তবসম্মত ছবি তৈরিতে এতটাই পারদর্শী হয়ে উঠেছে, কোনটি আসল আর কোনটি নকল তা সাধারণ চোখে ধরা কঠিন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষকে কি এমন কোনো প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব যার মাধ্যমে তারা কম্পিউটারের তৈরি নকল ছবি ধরে ফেলতে পারবে?
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অফ অ্যাবারডিনের গবেষক ড. ক্লেয়ার সাদারল্যান্ড এবং তার অস্ট্রেলীয় সহকর্মীরা এই প্রশ্নেরই উত্তর খুঁজছিলেন। আর তাদের গবেষণায় উঠে এসেছে এক চমকপ্রদ তথ্য-মানুষকে প্রশিক্ষণ দিলে তারা খুব সহজেই এই এআই জালিয়াতি ধরে ফেলতে পারে।
পুরনো দিন শেষ, এআই এখন নিখুঁত
একটি সময় ছিল যখন এআইয়ের তৈরি ছবি সহজেই চেনা যেত। ছবিতে প্রায়ই অদ্ভুত কোনো ভুল থাকত— যেমন হাতের একটি অতিরিক্ত আঙুল (৬টি আঙুল) কিংবা কানের দুপাশে দুরকম দুল; কিন্তু এআই এখন নিজের ভুল থেকে শিখছে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ‘ইমোশনস অ্যান্ড ফেসেস ল্যাব’-এর পরিচালক অধ্যাপক অ্যামি ডাওয়েল (যার আসল ছবি ড. সাদারল্যান্ডের হাতে রয়েছে— বাম দিকে) বললেন, ‘ছবির খুঁত যেমন অতিরিক্ত আঙুল খোঁজার প্রশিক্ষণে এখন আর খুব বেশি লাভ হচ্ছে না। কারণ এআই দিন দিন নিখুঁত হচ্ছে এবং জালিয়াতি করা ব্যক্তিরা স্পষ্ট ভুল থাকা ছবিগুলো এড়িয়ে চলছে।’
তাহলে উপায়? অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং যুক্তরাজ্যের গবেষকদের নিয়ে গঠিত অধ্যাপক ডাওয়েলের দলটি দেখিয়েছে, মানুষকে কিছুটা সূক্ষ্ম উপায়ে চিন্তা করার প্রশিক্ষণ দিলে এখনো এআইয়ের চাল ধরে ফেলা সম্ভব।
মানুষের সূক্ষ্ম অনুভূতি জাগ্রত করার প্রশিক্ষণ
ড. সাদারল্যান্ডের নেতৃত্বে যুক্তরাজ্যের গবেষকরা খেয়াল করেন, কিছু ছবি দেখার পর তাদের অবচেতন মনেই একটি ‘খটকা’ বা অনুভূতি তৈরি হচ্ছিল যে ছবিটি নকল হতে পারে। এরপরই তারা ভাবেন, এই অনুভূতিটা কি অন্য মানুষকেও শেখানো সম্ভব?
গবেষণার জন্য 'স্টাইল জেনথ্রি' নামক একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এআই টুলের সাহায্যে তৈরি হাজার হাজার নকল মুখের ছবি ব্যবহার করা হয়। অংশগ্রহণকারীদের পরীক্ষার আগে ও পরে বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এই প্রশিক্ষণে মূলত ছয়টি সূক্ষ্ম বিষয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়:
১. সামঞ্জস্যতা: মানুষের চেহারায় কিছু না কিছু ছোটখাটো অসামঞ্জস্যতা থাকে, যেমন— একটি চোখের পাতা সামান্য ঝুলে থাকা বা একটু বাঁকা হাসি। এআইয়ের তৈরি ছবিগুলো সাধারণত অতিরিক্ত নিখুঁত হয়। গবেষকদের ভাষায়, ‘যদি কোনো কিছু প্রয়োজনের চেয়ে বেশি নিখুঁত মনে হয়, তবে তা নকল হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’
২. অনুপাত: এআইয়ের ছবিতে সচরাচর খুব বড় নাক বা অতিরিক্ত বের হয়ে থাকা কানের মতো অস্বাভাবিক অনুপাত দেখা যায় না।
৩. আকর্ষণীয়: এআই সাধারণত দেখতে সুন্দর বা মনোরম মুখ তৈরি করতে পছন্দ করে। ফলে এআইয়ের মুখগুলো সাধারণ মানুষের চেয়ে বেশি আকর্ষণীয় দেখায়।
৪. স্বাতন্ত্র্য: ভিড়ের মধ্যে কিছু মানুষকে আলাদা করে চেনা যায় তাদের বিশেষ চেহারার জন্য; কিন্তু এআইয়ের তৈরি মুখগুলো গড়পড়তা বা সাধারণ ঘরানার হয়।
৫. অভিব্যক্তি: এআইয়ের তৈরি মুখে আবেগের প্রকাশ বা ইমোশন অনেক কম থাকে। এগুলো দেখতে কিছুটা ভাবহীন মনে হয়।
৬. স্মরণযোগ্যতা: এই মুখগুলো সহজে মনে রাখা যায় না, মানুষের স্মৃতিতে এগুলো দ্রুত আবছা হয়ে যায়।
এ ছাড়া এআই সাধারণত শ্বেতাঙ্গ ও তরুণদের ছবি দিয়ে বেশি প্রশিক্ষিত হওয়ায়, কৃষ্ণাঙ্গ বা অন্য বর্ণের এবং অতিরিক্ত বয়স্ক বা শিশুদের নিখুঁত ছবি তৈরিতে এটি এখনো কিছুটা দুর্বল।
অবিশ্বাস্য সাফল্য: মাত্র ১ ঘণ্টার ম্যাজিক!
গবেষকরা দেখেছেন, মানুষকে যখন আসল ও নকল ছবি পাশাপাশি দেখিয়ে কোনটি কী তা বুঝিয়ে দেওয়া হয়, তখন মাত্র এক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের ছবি চেনার ক্ষমতা অবিশ্বাস্যভাবে বেড়ে যায়।
প্রশিক্ষণের আগে যেখানে সাধারণ মানুষের নির্ভুলভাবে এআই ছবি চেনার হার ছিল মাত্র ৪০ শতাংশ, প্রশিক্ষণের পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ শতাংশে!
এমনকি কয়েকজন ১০০ শতাংশ নির্ভুলভাবে ডিপফেক ছবি শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, মানুষের মস্তিষ্ক ঠিক সেভাবেই এই কাজটি শিখছে যেভাবে এআই নিজে শেখে— প্রচুর ডেটা বা ছবি দেখার মাধ্যমে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠা। শুধু তাই নয়, প্রশিক্ষণের পর মানুষের নিজের সিদ্ধান্তের প্রতি আত্মবিশ্বাসও অনেক বেড়ে গেছে, যা জালিয়াতি রুখতে অত্যন্ত জরুরি।
কেন ডিপফেক চেনা এত জরুরি?
ডিপফেকের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো আর্থিক জালিয়াতি ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র।
বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি: বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ডেলয়েট’ (Deloitte)-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী বছর নাগাদ শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই এআই ডিপফেক স্ক্যামের কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়াতে পারে চার হাজার কোটি পাউন্ড। সম্প্রতি হংকংয়ের একটি সংস্থায় কর্মরত একজন কর্মচারী ভিডিও কলে তার হুবহু নকল (ডিপফেক) বসের নির্দেশ পেয়ে ২ কোটি ৫০ লাখ পাউন্ড জালিয়াতি চক্রের অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার করে দেন।
রাজনৈতিক গুপ্তচরবৃত্তি: ২০১৯ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের এক তদন্তে দেখা যায়, 'কেটি জোন্স' নামে লিংকডইনের একটি প্রোফাইল সম্পূর্ণ ভুয়া ছিল। রাশিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা এআই দিয়ে তৈরি একটি নিখুঁত নারীর ছবি ব্যবহার করে ওয়াশিংটনের শীর্ষ রাজনৈতিক ও জাতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করেছিল।
এই পরিস্থিতির কারণে বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার একজন রাজনীতিবিদ একটি প্রস্তাব এনেছেন, যেখানে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে এআইয়ের তৈরি যেকোনো কন্টেন্টে বাধ্যতামূলকভাবে ‘ওয়াটারমার্ক’ বা বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করার কথা বলা হয়েছে।
প্রযুক্তির ইতিবাচক দিকও আছে
ড. সাদারল্যান্ড অবশ্য এআইয়ের কিছু ভালো দিকও দেখছেন। যেমন— বহু বছর আগে হারিয়ে যাওয়া কোনো শিশু বড় হয়ে এখন দেখতে কেমন হতে পারে, তা এআই দিয়ে খুব কম খরচে ও দ্রুত তৈরি করা সম্ভব। সৃজনশীল কাজে যদি মানুষ সততার সঙ্গে এবং সবাইকে জানিয়ে এটি ব্যবহার করে, তবে এর সুফল রয়েছে।
আমরা এখনো এমন কোনো ভয়ানক পৃথিবীতে পৌঁছাইনি যেখানে আসল আর নকলের পার্থক্য করা অসম্ভব। তবে দুঃসংবাদটিও মাথায় রাখতে হবে— বিজ্ঞানীদের এই নতুন গবেষণাপত্রটি কিন্তু এর মধ্যে এআই নিজে পড়ে ফেলেছে এবং সে আরও নিখুঁত হওয়ার জন্য প্রতিনিয়ত শিখছে!




