বিশ্বকাপের গল্প
অদ্ভুত লোকটা

ছবি এঁকেছেন রজত
বৃষ্টিভেজা মাঠে বাচ্চাগুলো মনের সুখে ফুটবল খেলছিল। আজব এক লোক এসে বাধাল গণ্ডগোল। কী গণ্ডগোল? সেই গল্প লিখেছেন আবুল কালাম আজাদ।
একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেছে। এখন রোদ উঠেছে। একেবারে ঝলমলে রোদ না। অল্প একটু মিষ্টি হাসির মতো রোদ। মাঠের এখানে-ওখানে ঘাসের নিচে কিছু পানি জামে আছে। এটা সমস্যার কিছু না। ওরা ওদের মতো খেলছে। বল খেলছে। ফুটবল।
মাঠের এক প্রান্তে দেয়াল ঘেঁষে বসে একটা লোক কী যেন করছে। লোকটার মাথায় লম্বা চুল। পরনে ফতুয়া আর পাজামা। মুখে দাড়িও আছে। এর বেশি কিছু খেয়াল করা যাচ্ছে না। ওরা খেলায় মজে আছে।
আচানক বল ছুটে গেল লোকটার দিকে। বলটা মেরেছিল পিলু। গোলপোস্টেই মেরেছিল। পা ভেজা, বলও ভেজা। তার ওপর বলটা বেশ পুরনো হয়ে গেছে। তাই পিছলে যায়। সোজা গিয়ে লাগে দেয়াল ঘেঁষে বসে থাকা লোকটার গায়ে। লোকটা বলটা ধরে ফেলল। হয়তো রেগে গেছে। রেগে গেলে কিছু করার নেই। খেলার মাঠের পাশে এসে এভাবে বসে আছে কেন? বল তো ছুটে যেতেই পারে।
মোহন গেল বল আনতে। লোকটা বলল, ‘বল দেব না, যা!’
‘কেন দেবেন না?’
‘আমার গায়ে বল লাগল কেন? দেখিস না, কেমন কাদা লেগে গেছে ফতুয়াটায়। গতকালই ফতুয়াটা বলসাবান দিয়ে ধুয়েছি। নিজ হাতে ইস্ত্রি করেছি। দিলি নষ্ট করে। বল পাবি না, যা।’
‘আপনি এখানে বসে কী করছেন?’
‘কী করছি, দেখছিস না?’
ততক্ষণে অন্যরাও সেখানে গিয়ে জড়ো হয়েছে। সবাই তাকিয়ে দেখে, লোকটা ছবি আঁকছে। রঙিন ছবি। মাঠে কিছু ছেলে বল খেলছে। কাদা-মাটি-পানি মেখে একাকার। ওরা অবাক হলো। লোকটা হয়তো ওদেরই এঁেকছে। তার মানে লোকটা ছবি আঁকে। আঁকিয়ে।
ঝন্টু বলল, ‘আমরা দুঃখিত। এখন থেকে সতর্ক থাকব। বল আর এদিকে আসবে না।’
‘দুঃখিত বললেই চলবে? কেমন ছেঁড়া, পুরনো একটা বল আমার গায়ে এসে লেগেছে।’
‘আমরা টাকা জমাচ্ছি। সবাই চাঁদা তুলে একটা নতুন বল কিনব পরে।’
লোকটা চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। বল ফেরত দেবে বলে মনে হচ্ছে না। আঁকিয়ে মানুষ। তার মন বোঝা কঠিন।
লোকটা বলল, ‘বল তো এখন বিশ্ব জুড়ে কী যুদ্ধ চলছে?’
যুদ্ধ! হঠাৎ যুদ্ধ টেনে আনছে কেন? তাও বিশ্ব জুড়ে। ঝন্টুর বুদ্ধিটা একটু বেশি। সে বিষয়টা ধরে ফেলেছে। সবাইকে ঠেলে পেছন থেকে সামনে এসে বলল, ‘বিশ্ব জুড়ে ফুটবলযুদ্ধ চলছে।’
‘বাহ! ঠিক বলেছিস। তোদের নিয়ে আমার অনেক আশা। হয়তো তোদের মাধ্যমেই আমাদের দেশ একদিন এই বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেবে। তোরা খেলা দেখিস তো?’
‘দেখি তো। রাত জেগে খেলা দেখে স্কুল কামাই হয়ে যায়, তা-ও দেখি।’
‘মাঝেমধ্যে স্কুল কামাই হলে সমস্যা নেই। আচ্ছা তোরা কে কোন দলের সাপোর্ট করিস?’
‘আমি ব্রাজিল দলের সাপোর্টার। আমার দল বাদ পড়ে গেছে!’
‘আর তুই... ওই চশমা...?’
‘আমি আর্জেন্টিনা।’
‘আর তুই... ওই যে কোঁকড়া চুল...?’
‘আমিও আর্জেন্টিনা।’
‘আর তুমি... ওই যে মাথায় ক্যাপ...?’
‘আমি নরওয়ে।’
‘আর তুই... ওই যে নাকে কাদা...?’
‘আমি জার্মানি। আমার দলও বাদ পড়ে গেছে!’
এভাবে লোকটা সবার প্রিয় দলের নাম জেনে নিল। ওরা অধৈর্য হয়ে যাচ্ছিল। রতন বলল, ‘এবার বলটা দেন। অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
‘এই ছেঁড়া-ফাটা বল কেউ খেলে?’
‘বলেছি তো, আমরা চাঁদা তুলে নতুন একটা বল কিনব।’
‘ওই যে... মাঠের ওই কোনায় তাকা... বড় বড় ঘাস যেখানে...।’
সবাই তাকাল সেদিকে। রঞ্জু বলল, ‘কী ওখানে?’
‘ওখানে দুইটা ব্যাগ আছে।’
‘ব্যাগ! কই, দেখছি না তো...।’
‘ভালো করে তাকা।’
সবাই দেখল। লোকটা বলল, ‘যা, ব্যাগ দুটি নিয়ে আয়।’
রতন বলল, ‘কী আছে ওগুলোতে?’
‘আহ! আনতে বললাম নিয়ে আয়।’
ওরা ছুটে গেল সেখানে। ব্যাগ দুটো নিয়ে এলো। বেশ বড় বড় ব্যাগ। ওজনও বেশ। আনতে ওদের কষ্ট হলো। ব্যাগ এনে ধপাস করে লোকটার সামনে নামাল। লোকটা বলল, ‘শোন, এই ব্যাগে পাঁচটা বল আছে। এই পচা বলটা ফেলে দিয়ে এখান থেকে একটা নিয়ে খেলবি। বাকি চারটা তোদের একজনের কাছে রেখে দিবি। একটা নষ্ট হলে আরেকটা বের করে খেলবি।’
ওরা অবাক হলো। কী অদ্ভুত লোক! ওদের জন্য চমৎকার পাঁচটা বল নিয়ে এসেছে। রতন বলল, ‘আর এই ব্যাগে কী?’
‘বলছি, এত অধৈর্য হলে কি চলে? এই ব্যাগে জার্সি আছে। তোদের শরীরের মাপের জার্সি পাওয়া খুব সহজ না। খুব কষ্ট করে খুঁজে এনেছি। নে, যার যার প্রিয় দলের জার্সি নিয়ে গায়ে দে।’
সবাই ব্যাগ খুলে জার্সি গায়ে দিল। লোকটা বল দিল, জার্সি দিল, তার খোঁজখবর একটু না নিলে চলে? রান্টু বলল, ‘আপনার নাম কী?’
‘আমার নাম? আমার নাম দিয়ে কী হবে?’
‘শুনি, আমাদের জন্য এত কিছু করলেন।’
‘এত কিছু কী? কী করেছি আমি? আমার নাম ধ্রুব এষ।’
‘আপনি কী করেন?’
‘ছবি-টবি আঁকি।’
‘আপনি তো লেখকও,’ বলল মিথুন।
‘তুই কি বই-টই পড়িস?’
“হুম, আমি আপনার বই পড়েছি। ‘তুই ভূত মুই ভূত’, ‘কাকতাড়ুয়ার চোখ’, ‘সবুজ পণ্ডিত’— এগুলো আমি পড়েছি। আমার আপু আপনার অনেক বই কিনে আনে।”
‘আরে বাব্বা! তোরা তো আমাকে বিখ্যাত বানিয়ে দিবি। শোন, আমার সঙ্গে যোগাযোগ রাখিস। আমার ফোন নাম্বার নে।’
‘দেন।’
‘ধুর! আমার তো ফোন নাম্বার নাই।’
ওরা সবাই হেসে উঠল।
‘এই নে আমার ঠিকানা। চলে আসিস। লেবু চা আর সলটেড বিস্কুট খাওয়াব, গল্প হবে অনেক।’
লোকটা ওদের দিকে একটা কাগজ বাড়িয়ে দিল। তারপর তার ব্যাগ, রঙতুলি, ছবি সব গুটিয়ে হাঁটা দিল। একবারও পেছন ফিরে তাকাল না। ওরা সবাই লোকটার চলার পথে চেয়ে রইল। কী অদ্ভুত এক লোক!




