শত আদরের মেয়ে

অলংকরণ করেছেন রজত
আজ মীনা দিবস। তোমাদের অনেক পছন্দের এই চরিত্রকে নিয়ে লিখেছেন রবিউল কমল
‘আমি বাবা-মায়ের শত আদরের মেয়ে...’ গানটি শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে দুদিকে বেণি করা এক ছোট্ট মেয়ের মুখ। সঙ্গে তার ভাই রাজু আর দুষ্টু টিয়া পাখি মিঠু। মেয়েটির নাম মীনা।
প্রতি বছর ২৪ সেপ্টেম্বর পালিত হয় মীনা দিবস। শিশুদের শিক্ষা, অধিকার, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও ছেলেমেয়ের সমান সুযোগের কথা মনে করিয়ে দিতেই দিবসটি পালন করা হয়। বাংলাদেশে ১৯৯৮ সাল থেকে এ দিবস পালনের তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু জানো কি, মীনার সৃষ্টির গল্পটাও বেশ মজার। সেই গল্পই বলছি এবার।
সময়টা নব্বইয়ের দশকের শুরুর দিকের। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক কন্যাশিশুই তখন নানা কারণে স্কুলে যেতে পারত না। কোথাও তাদের পড়ালেখাকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হতো না, কোথাও অল্প বয়সে বিয়ের চাপ ছিল, কোথাও আবার ছেলে ও মেয়ের জন্য থাকত আলাদা নিয়ম।
তখন দুনিয়া জুড়ে শিশুদের অধিকার রক্ষা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কল্যাণ নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘের সংস্থা ইউনিসেফ ভাবল, শিশুদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো শুধু বক্তৃতা দিয়ে বললে হবে না। দরকার এমন একটি চরিত্র, যাকে শিশুরা নিজেদের মতো মনে করবে। যে তাদের সঙ্গে হাসবে, খেলবে, প্রশ্ন করবে এবং গল্পের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলো বলবে। সেই ভাবনা থেকেই তৈরি হলো মীনা।
ইউনিসেফ বাংলাদেশের যোগাযোগ বিভাগের তখনকার প্রধান নীল ম্যাককির নেতৃত্বে ১৯৯০ সালের দিকে মীনা প্রকল্পের যাত্রা শুরু হয়। মীনার গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের অসাধারণ শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের নাম। তার পাপেট অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ নব্বইয়ের দশকের শিশুদের কাছে ছিল ভীষণ প্রিয়। সেই অনুষ্ঠানের অন্যতম জনপ্রিয় চরিত্র ছোট্ট মেয়ে পারুল। বাংলার লোককথার ‘সাত ভাই চম্পা’ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তিনি চরিত্রটি তৈরি করেছিলেন। এই চরিত্রও মীনার জন্মের গল্পের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বিভিন্ন স্মৃতিচারণ ও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউনিসেফের মীনা প্রকল্পের ভাবনায় বাংলাদেশের পারুল চরিত্রটি গুরুত্বপূর্ণ অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছিল। পরে মুস্তাফা মনোয়ারও প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত হন। আর মীনার পরিচিত চেহারাটি গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন ভারতের বিখ্যাত অ্যানিমেটর রাম মোহন।
কিন্তু একা কি গল্প জমানো যায়? তাই দরকার সঙ্গী। যোগ হলো মীনার সবচেয়ে কাছের সঙ্গী, তার ছোট ভাই রাজু। আর আছে মিঠু, কথাবলা সেই দুষ্টু টিয়া পাখি। মীনা যখন কোনো সমস্যায় পড়ে, রাজু আর মিঠু তখন নানা মজার কাণ্ড ঘটায়।
বাংলাদেশে মীনার প্রথম টেলিভিশন পর্ব প্রচারিত হয় ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে। সেই থেকে মীনা ধীরে ধীরে ঢুকে পড়ে বাংলাদেশের শিশুদের শৈশবে। তার গল্প বাংলাদেশেই থেমে থাকেনি; দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, নেপালি, উর্দুসহ বিভিন্ন ভাষায় প্রচারিত হয়েছে। টেলিভিশন ছাড়াও বই, কমিকস, রেডিও এবং পরবর্তী সময়ে ডিজিটাল মাধ্যমেও পৌঁছে গেছে শিশুদের কাছে।
মীনার প্রথম দিকের গল্পগুলোর একটি বড় বিষয় ছিল মেয়েদের স্কুলে যাওয়া নিয়ে। আজ আমাদের কাছে স্কুলে যাওয়া খুব স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন অনেক পরিবার মনে করত, মেয়েদের এত পড়ালেখা করে কী হবে? মীনা সেই ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল। সে দেখিয়েছিল, মেয়েরাও পড়তে, স্বপ্ন দেখতে এবং বড় হয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারে। এ কারণেই মীনা দক্ষিণ এশিয়ার লাখো-কোটি কন্যাশিশুর সাহসের প্রতীক হয়ে উঠেছিল।



