টুনি হলো প্রজাপতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ছিল একটা পতঙ্গ। পায়ের মাপের জুতা না পেয়ে ভীষণ পেরেশানিতে পড়ে গিয়েছিল সে। তারপর একসময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম ভাঙতেই দেখে, ম্যাজিক! মজার এই গল্প লিখেছেন পল্লব শাহরিয়ার
টুনি। টুনি কিন্তু এখন প্রজাপতি। টুনি যখন শুঁয়োপোকা ছিল, তখন সে প্রতিদিন তার পছন্দের লাল রঙের ছোট্ট এক জোড়া জুতা পরে পুরো বাগানের সব গাছের পাতায় হাঁটাহাঁটি করত। তার সবচেয়ে বেশি ভালো লাগত বর্ষার দিনে। এ সময় অনেক গাছে কচি কচি পাতা হয়, সেগুলোর ওপর দিয়ে হাঁটতে তার খুব ভালো লাগে।
একদিন সকালে টুনি ঘুম থেকে উঠে দেখে, তার একটি জুতা কোথাও নেই! সে তখন খুঁজতে শুরু করল; পাতার নিচে, ডালের ফাঁকে, ঘাসের ভেতর। সারা দিন খোঁজার পরও সে কোথাও তার জুতা পেল না। সমস্যা হচ্ছে, সে কখনো জুতা ছাড়া হাঁটেনি। তাই এখন হাঁটতে গেলেই পায়ে ব্যথা লাগছে।
টুনি পড়ল মহাবিপদে। তার তো জুতা ছাড়া চলবে না। উপায় না পেয়ে সে তখন পুকুরপাড়ের মাকড়সার কাছে গেল। সমস্যার কথা জানিয়ে সে মাকড়সাকে তার একটি জুতা দিতে বলল। মাকড়সা অনেক চিন্তাভাবনা করে তাকে একটি জুতা দিয়ে দিল। কিন্তু সমস্যার ওপরে আরেকটি সমস্যা যোগ হলো, মাকড়সার জুতা টুনির পায়ে হচ্ছে না। হবে কীভাবে? মাকড়সার জুতা তো ছোট! টুনির মন আবার খারাপ হয়ে গেল। সে মন খারাপ করে অনেকক্ষণ একটা কলাপাতার নিচে বসে রইল।
মন খারাপ করে থাকলে তো আর হবে না, তাকে যে জুতা খুঁজতে হবে। সে যে গাছে থাকে, সেই গাছের নিচে যে পুকুর, সেখানে একটি ব্যাঙ থাকে। তার মন খারাপ দেখে ব্যাঙ তাকে কারণ জিজ্ঞেস করল। টুনি সব খুলে বলল। এবার ব্যাঙ তার নিজের একটা জুতা টুনিকে দিয়ে দিল। টুনি তো মহাখুশি। সে তার পায়ে জুতা পরে হাঁটতে শুরু করল। কিন্তু একি! জুতা খুলে যাচ্ছে কেন? এ তো মহা সমস্যা! জুতা টুনির পায়ে হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটি তার পায়ের চেয়ে অনেক বড়। হাঁটতে গেলেই খুলে যায়।
‘এটিও আমার হচ্ছে না’ বলে দুহাতে চোখ ঢেকে পাতায় বসে পড়ল টুনি। মন খারাপ এবার আরও দ্বিগুণ হয়ে গেল। সকাল গড়িয়ে তখন দুপুর, কিছু একটা না করতে পারলে আজ সারা দিন খালি পায়ে হাঁটতে হবে। সেদিক দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল একটা ফড়িং। টুনি উত্তেজিত হয়ে ফড়িংকে তার কাছে ডাকল। তার সব সমস্যার কথা খুলে বলল। ফড়িংয়ের কাছে অনেক জুতা ছিল। সে তাকে একটা না, একজোড়া জুতা দিয়ে গেল। টুনি এবার মহাখুশি, কারণ মাকড়সার জুতার মতো এটা ছোট না, আবার ব্যাঙের জুতার মতো বড়ও না। একেবারে তার পায়ের সাইজের।
অবশেষে টুনি তার পায়ে পরার মতো জুতা পেল। আনন্দ নিয়ে সে তার পায়ে জুতা পরল। মাথায় বেণি করে বাইরে যাওয়ার জন্য যেই সে পা বাড়িয়েছে, অমনি তার মনে হলো, সে যেন কাঁটার ওপর দিয়ে হাঁটছে। টুনির সব খুশি একমুহূর্তে উড়ে গেল। সবকিছু মিলে যাওয়া জুতার ভেতর কাঁটা। এবার কী হবে! টুনি আর মন খারাপ নিতে পারছে না। সে এবার সত্যি ক্লান্ত। কোথাও তার জন্য ঠিকঠাক কিছু পাওয়া যাচ্ছে না।
ক্লান্ত আর মন খারাপ নিয়ে সে একটা বড় সবুজ পাতার ওপর গুটিসুটি হয়ে বসে পড়ল। সত্যি সত্যি সে যদি আর জুতা খুঁজে না পায়, তাহলে কী হবে? তাহলে সে হাঁটবে কীভাবে? টুনি এসব ভাবছে আর নিজের চারপাশে একটা নরম, আরামদায়ক গুটি বানাচ্ছে। সারা দিন যে পরিশ্রম গেছে, তাতে টুনির ঘুম চলে আসছে। সে সেই গুটির ভেতর চোখ বুঝে ঘুমিয়ে পড়ল।
এভাবে দিন পার হলো। রাত পার হলো। বৃষ্টি গিয়ে রোদ চলে এলো। বাগানের গাছগুলোতে নতুন নতুন পাতা আর ফুল আসতে শুরু করল। আর টুনি সেই যে তার গুটির ভেতর ঘুম দিয়েছে, সেই ঘুমের ভেতরেই তার শরীরে চলতে থাকল আশ্চর্য কিছু পরিবর্তন।
একদিন সকালে টুনির ঘুম ভাঙল। সে দেখল, রোদের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে তার গুটির ভেতর ঢুকছে। সে আস্তে আস্তে গুটি খুলে সেখান থেকে বাইরে বের হয়ে এলো। কিন্তু একি, টুনির আগের শরীর কই! তার এখনকার শরীরটা আরও সুন্দর; লাল, হলুদ আর নীল রঙের পাখা। সে তো অবাক হয়ে তার নতুন পাখাগুলো দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে তার জুতার কথা মনে পড়ল। আবার তাকে জুতা খুঁজতে বের হতে হবে। মন খারাপ করে সে তার নতুন রঙিন পাখাগুলো বাতাসে মেলে দিল। আর তখনই শুরু হলো টুনির আশ্চর্য হওয়ার পালা। তাকে আর মাটিতে হাঁটতে হচ্ছে না, সে এখন উড়ছে!
মনের সুখে টুনি আকাশে উড়তে লাগল। জুতার চিন্তা আপাতত বাদ। সে এখন রঙিন প্রজাপতি।




