নিজের মৃত্যুর সঠিক ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে মেয়েটি

ছবিঃ এ আই
লাস ভেগাসের এক নিঝুম রাত। ঘড়ির কাঁটা তখন এগারোটা ছুঁইছুঁই। ষোলো বছরের এক কিশোরী বাড়ি থেকে বেরোনোর আগে মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, "মা, আমাকে একটা চুমু দাও। আমি ফেরার আগে হয়তো তুমি ঘুমিয়ে পড়বে।" মেয়েটি বেরিয়ে গেল কাছের সুপার মার্কেটে, একটি রোমান্টিক উপন্যাস কিনতে। মা ভিভিয়ান তখন ঘুণাক্ষরেও জানতেন না, এই চুমুই তাদের শেষ বিদায়।
কিন্তু সবচেয়ে ভয়ংকর সত্যিটা হলো- মেয়েটি নিজেই জানত, এমন কিছু একটা ঘটতে চলেছে। তার নাম ক্যাথি হবস। আর সে বহু বছর ধরে বলে আসছিল, ষোলো বছর বয়সের গণ্ডি সে কিছুতেই পার হতে পারবে না।
ছোট্ট মেয়ের এক অদ্ভুত আতঙ্ক
গল্পের শুরুটা আরও অনেক আগে। ক্যাথির ছোটবেলাটা মোটেও সুখের ছিল না। বাবা-মায়ের ডিভোর্স এবং সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় তার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর হঠাৎ মৃত্যু-এই দুটি ঘটনা ছোট্ট ক্যাথির মনে এক গভীর ছাপ ফেলে। তার ভেতরে ঢুকে যায় মৃত্যুর এক হিমশীতল ভয়।
মাত্র আট বছর বয়স থেকেই সে তার আশপাশের সবাইকে একটা কথা বলতে শুরু করে-সে কোনোদিনই ষোলো বছরের বেশি বাঁচবে না। প্রথমে সবাই ভেবেছিল, এটা হয়তো ছোট মেয়ের কোনো অদ্ভুত কল্পনা। কিন্তু ক্যাথির চোখে মুখে এমন এক আতঙ্ক থাকত, যা তার মা ভিভিয়ান কখনো ভুলতে পারেননি। এক রাতে ডুকরে কেঁদে উঠে ক্যাথি মাকে বলেছিল, "মা, আমি আর বড় হতে চাই না। আমি ছোট্ট মেয়েই থেকে যেতে চাই।"
নতুন শহর, মিথ্যে স্বস্তি
মেয়ের মনের এই অন্ধকার দূর করতে ভিভিয়ান ১৯৮৬ সালে ক্যাথিদের নিয়ে চলে আসেন লাস ভেগাসের নতুন পরিবেশে। নতুন শহর, নতুন বন্ধু-সব মিলিয়ে ক্যাথি যেন আবার হাসতে শুরু করল।
কিন্তু ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যতই তার ষোলোতম জন্মদিন এগিয়ে আসতে লাগল, ক্যাথি যেন আবার গুটিয়ে গেল নিজের খোলোসে। যেন কোনো এক অদৃশ্য ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে তার দিকেই এগিয়ে আসছে।
এরপর এল সেই দিন-২০ এপ্রিল, ১৯৮৭। ক্যাথির ষোলোতম জন্মদিন।
সেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্যাথির মুখে যেন রাজ্যের স্বস্তি! মাকে জড়িয়ে ধরে সে বলল, "মা, আমি পেরেছি! আমি ষোলো বছর পার করে ফেলেছি। আমি ভাবতেই পারিনি আমি বেঁচে ষোলোতে পৌঁছাব।"
সবাই ভাবল, অভিশাপ কেটে গেছে। ক্যাথি নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করল। বিউটি স্কুলে ভর্তি হলো, নিজের সেলুন খোলার স্বপ্ন বুনল। কিন্তু, নিয়তি তখন অলক্ষ্যে হাসছিল।
সেই অভিশপ্ত রাত
২৩ জুলাই, ১৯৮৭। ক্যাথির ষোলোতম জন্মদিনের ঠিক তিন মাস তিন দিন পরের ঘটনা। রাত প্রায় এগারোটা। ক্যাথি মাকে সেই শেষ চুমুটা দিয়ে বের হলো বই কিনতে। দোকানের রশিদ আর সিসিটিভি বলছে, রাত ১১টা ১৭ মিনিটে ক্যাথি বইটি কেনে। এরপর পৃথিবীর আর কেউ তাকে জীবিত দেখেনি।
পরদিন সকালে মা ভিভিয়ান দেখলেন, মেয়ের বিছানা খালি। কিন্তু এর চেয়েও গা-শিউরে ওঠা ব্যাপার হলো, আগের রাতে ভিভিয়ানের দেখা একটি স্বপ্ন। রাত ঠিক তিনটের দিকে স্বপ্নে তিনি দেখেছিলেন-কেউ যেন তার মাথায় সজোরে আঘাত করেছে আর যিনি আঘাত করেছে তিনি বলছে-, "যাক, এবার সব শেষ হলো।"
মরুভূমির বুকে নিথর দেহ
নয় দিন পর। মোজাভে মরুভূমির এক নির্জন খাদে এক পর্যটক খুঁজে পেলেন ক্যাথির নিথর দেহ। তার মাথায় ছিল জোরালো আঘাতের চিহ্ন- ঠিক যেমনটা তার মা স্বপ্নে দেখেছিলেন! আশপাশের গাড়ির চাকার দাগ আর রক্তমাখা পাথর প্রমাণ করছিল, মৃত্যুর আগে খুনিদের সঙ্গে কতটা লড়াই করেছিল মেয়েটি। পুলিশ যখন তদন্তে নেমে ক্যাথির ঘর তল্লাশি করল, তারা এমন কিছু পেল যা দেখে পুলিশ অফিসারদেরও শিরদাঁড়া বেয়ে ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। ক্যাথির ড্রয়ারে পাওয়া গেল একগুচ্ছ চিঠি। চিঠিগুলো লেখা হয়েছিল তার ষোলোতম জন্মদিনের এক মাস আগে। সেখানে ক্যাথি তার পরিবারের সবাইকে অনুরোধ করেছিল, তার মৃত্যুতে তারা যেন বেশি কষ্ট না পায়। সে কি তবে সত্যিই সব জানত?
রহস্যময় ফোনকল আর এক সিরিয়াল কিলার
খুনের তিন মাস পর লাস ভেগাস পুলিশের অ্যানসারিং মেশিনে একটা বেনামি অডিও মেসেজ আসে। এক অজানা কণ্ঠস্বর দাবি করে, সে রাতে সুপার মার্কেটের সামনে সাদা জ্যাকেট পরা এক কিশোরীকে জোর করে গাড়িতে তুলতে দেখেছিল সে। লোকটি 'রবি' নামের একজনের কথা বলে এবং একটা গাড়ির নম্বর দেয়। কিন্তু পুলিশ খোঁজ নিয়ে দেখে, ওই নম্বরের কোনো অস্তিত্বই নেই! সেই রহস্যময় কলার আর কোনোদিন সামনে আসেনি।
বছর কয়েক পর, পুলিশ এই খুনের সঙ্গে কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার মাইকেল লি লকহার্টের যোগসূত্র খুঁজে পায়। লকহার্টের চুরি করা গাড়ির সিটের সুতোর সঙ্গে অপরাধস্থলে পাওয়া সুতো মিলে যায়। সে রাতে লকহার্ট লাস ভেগাসেই ছিল।
অন্য এক খুনের দায়ে ১৯৯৭ সালে লকহার্টের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। পুলিশও ক্যাথির ফাইলটি "সমাধান হয়েছে" বলে বন্ধ করে দেয়। কিন্তু লকহার্ট কি সত্যিই ক্যাথিকে খুন করেছিল? সেই রহস্যময় ফোনকলটি তবে কার ছিল? উত্তর আজও অজানা।
এক অমীমাংসিত প্রশ্ন
আজ প্রায় চার দশক পর, ক্যাথি হবসের ফাইল পুলিশের খাতায় বন্ধ হয়ে গেলেও, মানুষের মনে তা আজও খোলা।
একটা আট বছরের শিশু কীভাবে এত নিশ্চিতভাবে তার মৃত্যুর কথা জানতে পারল? তাও আবার নির্দিষ্ট বয়স উল্লেখ করে! এটা কি নিছকই এক মর্মান্তিক কাকতালীয় ঘটনা? নাকি মানুষের মনের গহিনে এমন কোনো ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় লুকিয়ে আছে, বিজ্ঞান আজও যার নাগাল পায়নি?
মায়ের দেখা স্বপ্ন, ড্রয়ারে লুকিয়ে রাখা বিদায়ী চিঠি আর ষোলো বছরের এক কিশোরীর মর্মান্তিক পরিণতি- ক্যাথি হবসের গল্প আজও এক রহস্যময় থ্রিলারের মতোই মানুষের বুকে কাঁপন ধরিয়ে যায়।
সূত্রঃ হিস্টরিক মিস্ট্রিজ, উনসলভেদ মিস্ট্রিজ উইকি (ফান্ডম),প্যারানরমাল ক্যাটালগ





