পাঠকের ভয়
হারিকেনের আলোয়

আশির দশকের শুরুর কথা। ১৯৮২ কি ১৯৮৩ সাল। আমাদের বাড়ি নোয়াখালীর মাইজদী শহরের এক গ্রামে— শহর থেকে মাত্র কিলোমিটার তিনেক দূরে। তবে তখন আধুনিকা ছিল বহুদূরে। রাস্তা ছিল কাঁচা। বসতি ছিল কম। চারপাশ ঘন গাছপালায় ঘেরা, দিনেও যেখানে ছায়া ঘনিয়ে থাকত, আর রাত নামলে তো কথাই নেই। গা ছমছমে নিস্তব্ধতা নেমে আসত চারদিকে। আমাদের বাড়িটা তখন ছিল টিনের।
ঘটনাটি আমার মায়ের। আম্মা বরাবরই প্রচণ্ড সাহসী মানুষ। সেই তরুণী বয়সে তার তেজ ও সাহস ছিল দেখার মতো।
এক রাতের ঘটনা। চতুর্দিক নিঝুম, শুধু ঝিঁঝি পোকার একঘেয়ে ডাক আর বাতাসে গাছের পাতার খসখস শব্দ। গৃহস্থালির কিছু ধোয়ামোছার কাজে আম্মাকে পুকুরঘাটে যেতে হলো। বাড়ি থেকে পুকুরটা একটুখানি তফাতে, বাঁশঝাড় আর নানা গাছপালার ছায়ায় ঢাকা অন্ধকার এক কোণে। সাধারণ কেউ ওই রাতে সেখানে যাওয়ার সাহস পেত না, কিন্তু সাহসী আম্মা এক হাতে কুপির মতো মিটমিট করে জ্বলা আলো হারিকেন আর অন্য হাতে বালতিভর্তি থালাবাসন নিয়ে নিশ্চিন্ত মনে হেঁটে চললেন।
পুকুরঘাটের প্রায় কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন, এমন সময় হঠাৎ বাতাসের থমথমে ভাবটা যেন আরও ভারী হয়ে উঠল। থমকে দাঁড়ালেন তিনি। ঠিক কয়েক হাত সামনে অন্ধকার ফুঁড়ে দাঁড়িয়ে আছে বিশালাকার একটা কিছু! হারিকেনটা বাঁ হাতে ধরা থাকায় ডানদিকের ওই আলো-আঁধারি ছায়াটা স্পষ্ট হচ্ছিল না, তবে অস্বাভাবিক কিছুর উপস্থিতি আঁচ করতে আম্মার একমুহূর্তও সময় লাগল না।
বুকের ভেতর ভয়কে ঠাঁই না দিয়ে আম্মা স্পষ্ট কণ্ঠে শোধালেন, ‘কে রে?’
কথাটা বলেই হারিকেনটা এক ঝটকায় উঁচিয়ে ধরলেন ছায়ামূর্তিটার মুখের সোজা। আলো পড়তেই দৃশ্যটা ফুটে উঠল— অন্য কেউ হলে ভয়ে চিৎকার দিয়ে ওই মুহূর্তেই মূর্ছা যেত! ওটা অবিকল মানুষের মতো এক অবয়ব, অথচ কাঁধের ওপর মাথা বলতে কিচ্ছু নেই! শুধুই এক ভয়াল, মুণ্ডহীন ছায়াশরীর দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।
কিন্তু আমার আম্মা তো দমার পাত্রী নন! পিছিয়ে না এসে উল্টো ধীর পায়ে দুই পা সামনে এগিয়ে গেলেন। তারপর হাতের জ্বলন্ত হারিকেনটা সোজাসুজি বাড়িয়ে দিলেন ওই ছায়ামূর্তিটার গায়ে। যেন তপ্ত আগুনের ছ্যাঁকা খেল জিনিসটা! সঙ্গে সঙ্গে বিকট, কানফাটানো এক গর্জন করে অন্ধকার বাতাসে মিলিয়ে গেল ওটা।
যেন কিছুই হয়নি— আম্মা অতটা নির্ভাবনায় আবার পুকুরঘাটের দিকে হাঁটা দিলেন এবং কাজ শেষ করে ঘরে ফিরলেন।
রাতে আমরা শুনে ভয় পাব ভেবে আম্মা আমাদের কিচ্ছুটি টের পেতে দেননি। পরদিন সকালে একদম শান্ত মুখে, নাশতার টেবিলে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আব্বাসহ আমাদের শোনালেন সেই রাতের রোমহর্ষক ঘটনাটি।







