জিম করবেটের ভূত

বিখ্যাত শিকারি জিম করবেটের শিকার অভিযানের বর্ণনায় বেশ কিছু অদ্ভুত ও রহস্যময় অভিজ্ঞতার কথা জানা যায়। নিচে এমন এমন পাঁচটি ব্যাখ্যাতীত ঘটনার বিবরণ তুলে ধরেছেন ইশতিয়াক হাসান
১৯২৯ সালে যখন জিম করবেট তল্লাদেশের নরখাদক বাঘের সন্ধানে বের হন, সেবার তিনি সারদা খাদের পাশে রাতে ক্লান্তি দূর করার জন্য বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। ঠিক সে সময় খাদের অন্য পাড়ে আলোর ঝলকানি দেখতে পান। কিছুক্ষণ পর সেখানে আরও কয়েকটি আলো আবির্ভূত হয় এবং কিছু আলো একে অপরের সঙ্গে মিশে যেতে দেখা যায়। করবেট প্রথমে ভেবেছিলেন, এগুলো হয়তো কোনো দাবানলের অবশিষ্টাংশ বা কেউ মশাল জ্বেলে কিছু খুঁজছে।
কিন্তু পরের দিন সকালে তিনি খেয়াল করে দেখেন যে আলোগুলো ঠিক এমন এক খাড়া পাথরের দেয়ালে অবস্থান করছিল, যেখানে ওপর থেকে দড়িতে ঝুলে থাকা ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে মানুষের পক্ষে পৌঁছানোই অসম্ভব। তখন এক স্থানীয় বাসিন্দা তাকে একটি স্থানীয় কিংবদন্তির কথা জানান— বহু আগে এক দেবী এক সাধুর ওপর ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে খাদের ধার থেকে ফেলে দিয়েছিলেন এবং ওই আলো নাকি সেই সাধুরই প্রায়শ্চিত্তের রূপ। এ ঘটনার পর করবেট ও তার সঙ্গীরা আর কখনো ওই খাদের কাছাকাছি তাঁবু গাড়েননি।
দুই
১৯৩৮ সালে যখন করবেট থকের বাঘিনীকে শিকার করার জন্য ওত পেতে বসেছিলেন, ওই বাঘিনীর ভয়ে একটি পুরো গ্রামের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পালিয়ে গিয়েছিল। সে সময় তিনি এক বুক-কাঁপানো অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। করবেট এমন এক ভয়াবহ আর্তনাদ শুনতে পান, যা ছিল কল্পনা ও অনুমানের বাইরে। শব্দটা এতটাই আকস্মিক ও ভীতিপ্রদ ছিল যে অতিরিক্ত ক্লান্তিজনিত হ্যালুসিনেশন বা আচ্ছন্ন মনের ভুল বলেও মনে হতে পারত। কিন্তু তা ছিল না, কারণ পরিবেশের নিখুঁত পর্যবেক্ষক করবেট লক্ষ করেন যে মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের পরিবেশ সম্পূর্ণ স্তব্ধ ও শান্ত হয়ে গেছে। বনের সমস্ত সম্বর হরিণ চোখের পলকে উধাও হয়ে গিয়েছিল এবং কাকর হরিণগুলোর ডাকও সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
পরদিন সকালে যখন তিনি গ্রামপ্রধানকে বিষয়টি জিজ্ঞেস করেন, তখন প্রধান তাকে জানান যে বাঘিনীটি তার সর্বশেষ শিকারকে যখন জীবন্ত অবস্থাতেই টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছিল, তখন সে চরম যন্ত্রণায় ও মর্মান্তিক আর্তনাদে ফেটে পড়েছিল। করবেট তখন গ্রামপ্রধানকে সেই কান্নার আওয়াজটি নকল করে দেখাতে বলেন; ডাকটি কিছুটা মৃদু হলেও রাতের বেলা শোনা সেই আর্তনাদের হুবহু অনুরূপ ছিল।
করবেট যখন নিজের ঘরের ভেতরে ছিলেন, তখন বাইরে থাকা সঙ্গীরা স্পষ্ট শুনতে পান যে, তিনি কার সঙ্গে যেন অত্যন্ত উচ্চ স্বরে কথা বলছেন
তিন
কিছু অভিজ্ঞতা এতই অদ্ভুত এবং যুক্তির সীমানা ছাড়িয়ে যায় যে মানুষ তা স্মরণ করতেও দ্বিধাবোধ করে। ১৯০৭ সালে চম্পাবত ফরেস্ট বাংলোতে করবেটের সঙ্গে এমনই এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছিল। অলৌকিক বা অপ্রাকৃত ঘটনার কথা বিবেচনা করলে সেটি সম্ভবত তার জীবনের সবচেয়ে রহস্যময় অভিজ্ঞতা। তবে সেই রাতে ঠিক কী ঘটেছিল, সে বিষয়ে করবেট নিজে না বলায় নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
তিনি যখন নিজের ঘরের ভেতরে ছিলেন, তখন বাইরে থাকা তার সঙ্গীরা স্পষ্ট শুনতে পান যে তিনি কার সঙ্গে যেন অত্যন্ত উচ্চ স্বরে কথা বলছেন। এরপর যখন ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন, তখন করবেটের শরীর ঘামে ভেজা, গায়ে কোনো জামা ছিল না, তিনি ঘন ঘন ভারী নিঃশ্বাস নিচ্ছিলেন এবং ঘোষণা করেন যে নিজের ঘরের চেয়ে তিনি তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে রাত কাটানো পছন্দ করবেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, সেদিন রাতে করবেটের সঙ্গে বাংলোতে থাকার কথা ছিল স্থানীয় তহশিলদারের; কিন্তু তিনিও এতই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যে কোনো অস্ত্র ছাড়াই সম্পূর্ণ একা রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে হেঁটে প্রস্থান করেন। এটি কি কোনো তীব্র প্যানিক অ্যাটাক ছিল, নাকি এর পেছনে এমন কোনো গভীর ও অশুভ রহস্য লুকিয়ে ছিল, যা পৃথিবী আজও জানতে পারেনি?
চার
পাহাড়ে বা উঁচু পাহাড়ি অঞ্চলে চুড়েল, কান্নার আওয়াজ, মুখের ওপর লম্বা ছড়ানো চুল, উল্টো দিকে ঘোরানো পা কিংবা সাদা পোশাক পরা নারীর গল্প অত্যন্ত পরিচিত। পাহাড়ি লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, চুড়েলের দৃষ্টি বা সম্মোহন থেকে রক্ষা পেতে হলে কোনো অবস্থাতেই তার দিকে চোখাচোখি করা উচিত নয়।
বলা হয়ে থাকে যে জিম করবেট তার জীবনে বেশ কয়েকবার এই চিৎকার করা পেত্নী বা বানশির মুখোমুখি হয়েছেন। একবার নিজ বোনের সঙ্গে খাবার খাওয়ার ঠিক পরপরই তিনি বারান্দার বাইরে থেকে একটি কান্নার আওয়াজ শুনতে পান। বাইনোকুলার হাতে নিয়ে তিনি সেই শব্দের উৎসের দিকে নজর দেন এবং এমন এক অদ্ভুত পাখি বা পেঁচার বর্ণনা দেন, যা তিনি এর আগে বা পরে কখনো দেখেননি।
পাঁচ
নিস্তব্ধতা মানুষ যতটা সহজে অনুমান করতে পারে, বাস্তবে তা তার চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী। যখন জিম করবেট চৌগড়ের বাঘ শিকার করতে গিয়েছিলেন, তখন বনের সেই অস্বাভাবিক ও ভারী নিস্তব্ধতা তাকে সবচেয়ে বেশি গভীরভাবে আঘাত করেছিল। গাছের পাতার সামান্য মর্মর শব্দটুকুও না থাকা সেই নিঃশব্দ পরিবেশে মনের ভেতর সবসময় একটি মানসিক প্রবৃত্তি কাজ করত— কেউ যেন পিছু নিয়েছে বা কোনো অদৃশ্য বিপদ পাশেই ওত পেতে আছে।
গ্রামবাসী এই অদ্ভুত নীরবতাকে একটি বড় অমঙ্গল বা অশুভ সংকেত হিসেবে দেখতেন এবং এর সঙ্গে বিভিন্ন অতিপ্রাকৃত বা লোককথা জড়িয়ে ফেলতেন। করবেটের বর্ণনা অনুযায়ী, গ্রামবাসীর গভীর বিশ্বাস ছিল যে বাঘিনীটি আসলে কোনো অশুভ বা কুৎসিত শক্তিতে আবিষ্ট। ঠিক যেমন ভূত বা কোনো অশুভ শক্তির আগমন ঘটলে চারপাশ একেবারে গোরস্তানের মতো নিস্তব্ধ হয়ে যায়, তেমনই চৌগড়ের বনের সেই অস্বস্তিকর নীরবতাও বাঘিনীর পেত্নীসুলভ বা অশুভ উপস্থিতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল।



