রোমাঞ্চকর ফাইনাল

বিশ্বকাপ ফুটবলের রোমাঞ্চকর যাত্রায় ফাইনাল ম্যাচগুলো উপহার দিয়েছে অদ্ভুত, নাটকীয় সব মুহূর্ত। লিখেছেন ইমরানুর রহমান
১৯৩০ সালের প্রথম বিশ্বকাপ ফাইনালটি মাঠের খেলার চেয়ে বেশি জমে উঠেছিল মাঠের বাইরের মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে। ফাইনালে মুখোমুখি দুই প্রতিবেশী দেশ— স্বাগতিক উরুগুয়ে আর আর্জেন্টিনা। বিপত্তি বাধল ম্যাচের বল নিয়ে। দুই দলই নিজেদের দেশ থেকে আনা বল দিয়ে খেলতে অনড়। শেষমেশ রেফারি এক অদ্ভুত কিন্তু ঐতিহাসিক সমাধান দিলেন; প্রথমার্ধ খেলা হবে আর্জেন্টিনার বলে আর দ্বিতীয়ার্ধ উরুগুয়ের বলে! নিজেদের বল পেয়ে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে গেলেও দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ে নিজেদের বলের জাদুতে ৪-২ গোলে ম্যাচ জিতে প্রথম বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
তবে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটি ঘটেছিল ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপে। কাগজে-কলমে সেটি ফাইনাল না হলেও (রাউন্ড রবিন লিগ পদ্ধতির শেষ ম্যাচ), কার্যত সেটিই ছিল শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচ। ব্রাজিলের মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় দুই লাখ দর্শকের সামনে স্বাগতিকদের দরকার ছিল মাত্র একটি ড্র। ম্যাচ শুরুর আগেই ব্রাজিলের সংবাদপত্রগুলো তাদের ‘বিশ্বজয়ী’ ঘোষণা করে দিয়েছিল, এমনকি মেয়রের তৈরি করা অভিনন্দন বার্তা আর মেডেলও প্রস্তুত ছিল। কিন্তু উরুগুয়ের আলসিদেস ঘিগিয়া যখন ম্যাচের শেষ মুহূর্তে জয়সূচক গোলটি করলেন, পুরো স্টেডিয়ামে যেন শ্মশানের নীরবতা নেমে এলো। ফুটবল ইতিহাসে এই স্তব্ধতাকে বলা হয় ‘মারাকানাজো’ বা মারাকানা বিপর্যয়। এই হারের শোকে স্তব্ধ হয়ে ব্রাজিলের বেশ কয়েকজন সমর্থক স্টেডিয়ামেই হার্ট অ্যাটাক করে মারা যান।
ম্যাচ শুরুর আগেই ব্রাজিলের সংবাদপত্রগুলো তাদের ‘বিশ্বজয়ী’ ঘোষণা করে দিয়েছিল
১৯৫০ সালের সেই কান্নার আট বছর পর ১৯৫৮ সালের ফাইনালে ফুটবলবিশ্ব দেখল এক ১৭ বছরের কিশোরের অতিমানবীয় উত্থান। ব্রাজিলের হয়ে মাঠে নেমেছিলেন এডসন আরান্তেস দো নাসিমেন্তো, যাকে আজ আমরা ‘পেলে’ নামে চিনি। ফাইনালে স্বাগতিক সুইডেনের বিপক্ষে জোড়া গোল করে দলকে জেতালেন তিনি।
বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসের সবচেয়ে বিতর্কিত ঘটনাটি ঘটে ১৯৬৬ সালে; ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানির ম্যাচে। অতিরিক্ত সময়ে ইংল্যান্ডের জিওফ হার্স্টের একটি শট বারে লেগে গোললাইনের ঠিক ওপরে বা বাইরে ড্রপ খেয়ে ফিরে আসে। রেফারি লাইন্সম্যানের সঙ্গে কথা বলে এটিকে গোল ঘোষণা করেন, যা ‘ক্রসিং দ্য লাইন’ বিতর্ক নামে পরিচিত। এই ম্যাচে হার্স্ট হ্যাটট্রিক করেছিলেন, যা দীর্ঘ ৫৬ বছর ধরে ফাইনালের একমাত্র হ্যাটট্রিক হিসেবে অক্ষত ছিল।
আর্জেন্টিনা ৩-১ গোলে জিতে প্রথমবার বিশ্বকাপ ঘরে তোলে
১৯৭৮ সালের ফাইনালে আর্জেন্টিনা যখন নেদারল্যান্ডসের মুখোমুখি হয়, তখন মাঠে নামার আগেই শুরু হয় তীব্র মনস্তাত্ত্বিক নাটক। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা রেফারিকে অভিযোগ করেন, ডাচ উইঙ্গার রেনে ফন ডি কারখফের হাতের প্লাস্টার কাস্টটি বিপজ্জনক এবং সেটি নিয়ে খেলা যাবে না। এই আপত্তির কারণে ম্যাচ শুরু হতে বেশ দেরি হয়, যা ডাচদের মানসিকভাবে নাড়িয়ে দিয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ৩-১ গোলে জিতে প্রথমবার বিশ্বকাপ ঘরে তোলে। ১৯৯৪ সালের ফাইনালে ফুটবলবিশ্ব দেখল অন্যরকম এক নাটকীয়তা। ব্রাজিল ও ইতালি ১২০ মিনিট খেললেও কোনো গোল না হওয়ায় ইতিহাসের প্রথম ফাইনাল হিসেবে এটি টাইব্রেকারে গড়ায়। ইতালির রবার্তো বাজ্জিও একাই প্রায় টেনে দলকে ফাইনালে এনেছিলেন। কিন্তু এই ট্র্যাজিক হিরোর নেওয়া শেষ পেনাল্টি শটটি ক্রসবারের অনেক ওপর দিয়ে আকাশ ছুঁয়ে চলে যায়। ২০০৬ সালের বিশ্বকাপে মাতারাজ্জিকে ঠুস মেরে জিদানের লাল কার্ড দেখার গল্পও বা েবাদ দেবেন কেমন করে।
সবশেষে আসে ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপ ফাইনাল। লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা বনাম কিলিয়ান এমবাপ্পের ফ্রান্স। ৮০ মিনিট পর্যন্ত আর্জেন্টিনা ২-০ গোলে এগিয়ে, খেলা প্রায় শেষ। ঠিক তখনই মাত্র ৯৭ সেকেন্ডের ব্যবধানে এমবাপ্পের জোড়া গোল! ম্যাচ অতিরিক্ত সময়ে গড়াল। মেসি আবার গোল করে ৩-২ করলেন। এমবাপ্পে পেনাল্টি থেকে গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করে আবার ৩-৩ করলেন! ১২০ মিনিটের শেষ সেকেন্ডে আর্জেন্টিনার গোলরক্ষক এমিলিয়ানো মার্টিনেজের সেই অবিশ্বাস্য সেভ ম্যাচটিকে টাইব্রেকারে নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত মেসির হাতে ওঠে আরাধ্য সোনালি ট্রফি।





