বাংলা সাহিত্যে মাসুদ রানা একজনই।
মাসুদ রানার জনপ্রিয়তা

প্রতিটি বইয়ে নতুন নতুন দেশ, ভিন্নধর্মী মিশন এবং পদে পদে বিপদ ও রোমাঞ্চ পাঠককে আচ্ছন্ন করে রাখে।
বাংলাদেশের রোমাঞ্চ-সাহিত্যের সবচেয়ে পুরনো, দীর্ঘস্থায়ী ও জনপ্রিয় চরিত্র কোনটি— এমন প্রশ্ন এলে সবাই সন্দেহাতীতভাবে বলবেন, মাসুদ রানা। কাল্পনিক এক বাঙালি গুপ্তচর, যে কিনা একই সঙ্গে এদেশি পাঠকের স্বপ্নের নায়ক।
১৯৬৬ সালে জন্ম নিয়ে দীর্ঘ ৬০ বছর পরেও সগৌরবে টিকে আছে চরিত্রটি; এর স্রষ্টা কাজী আনোয়ার হোসেন প্রয়াত হয়েছেন, কিন্তু মাসুদ রানার যাত্রা থামেনি। তার তৈরি করা লেখকরা এখনো অব্যাহত রেখেছেন সিরিজটি। ছয় দশক পেরিয়ে মাসুদ রানা পা রাখতে চলেছে সাত দশকে। তাই প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই সিরিজের আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও দীর্ঘস্থায়িত্বের রহস্য কী?
আসলে বাংলা সাহিত্যে মাসুদ রানা একজনই। এখানে ফেলুদা, ব্যোমকেশ বক্সী বা কিরীটি রায়ের মতো গোয়েন্দা চরিত্র রয়েছে প্রচুর। এরা সবাই আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস বা আগাথা ক্রিস্টির এরকুল পোয়ারোর ছায়ায় গড়ে উঠেছেন। এদের কার্যক্রম ছোট পরিসরের বিভিন্ন চুরি-ডাকাতি বা হত্যারহস্য সমাধানের মধ্যে সীমাবদ্ধ।
কিন্তু ইয়ান ফ্লেমিংয়ের জেমস বন্ডের মতো স্পাই বলতে যা বোঝায়, মানে যেখানে নায়ককে লড়াই করতে হয় জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের কোনো সমস্যা বা বিপদের বিরুদ্ধে, হয়তো বা রক্ষা করতে হয় পুরো পৃথিবী বা মানবজাতিকে, বাংলায় তেমন চরিত্র বলতে মাসুদ রানা ছাড়া আর কেউ নেই। চরিত্রটির এই অভিনবত্বকে জনপ্রিয়তার একটি অন্যতম কারণ বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে। এ কারণেই ৬০ বছর ধরে পাঠক রানার মুখাপেক্ষী। এই দীর্ঘ সময়ে চরিত্রটির আদলে অন্য নায়ক তৈরি করার চেষ্টা করেছেন বিভিন্ন লেখক; কিন্তু সফল হতে পারেননি।
তবে সেটাই একমাত্র কারণ নয়। মাসুদ রানার সবচেয়ে বড় শক্তি তার চরিত্র। দোষে-গুণে ভরা একজন সত্যিকার দেশপ্রেমিক ও মানবতার সেবক হিসেবে তাকে তৈরি করেছেন কাজী আনোয়ার হোসেন। আধুনিক-মনস্ক, কুসংস্কারমুক্ত, দেখতে সুদর্শন, নীতিতে অটল, অন্যকে সাহায্য করার জন্য যে নিজেকে বিপন্ন করতে দ্বিধা করে না। পাঠক তাকে সহজেই আপন করে নিতে পারে, তার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করতে পারে। তা ছাড়া কাহিনি নির্বাচনেও অত্যন্ত মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন কাজী আনোয়ার হোসেন।
প্রকাশিত পাঁচ শতাধিক বইয়ে রানাকে ঘুরিয়ে আনা হয়েছে পৃথিবীর প্রায় সব প্রান্তে, মুখোমুখি করা হয়েছে নানা ধরনের বিপদ-আপদ আর চ্যালেঞ্জের। প্রতিটি বইয়ে নতুন নতুন দেশ, ভিন্নধর্মী মিশন এবং পদে পদে বিপদ ও রোমাঞ্চ পাঠককে আচ্ছন্ন করে রাখে। রানার পাশাপাশি কিছু নিয়মিত চরিত্র তৈরি করা হয়েছে সিরিজে, যাদের প্রতি হৃদয়ের টান অনুভব করা যায়।
সর্বোপরি, বইগুলো লেখা হয়েছে অত্যন্ত সাবলীল ও প্রাঞ্জল ভাষায়, যা পাঠককে একাত্ম করে দেয় কাহিনির সঙ্গে। এমন একটি চরিত্রকে নিয়ে লেখা সিরিজ যে জনপ্রিয় ও দীর্ঘস্থায়ী হবে, তাতে আর আশ্চর্য কী?
মাসুদ রানার ৬০ বছরের দীর্ঘ পথচলা যে খুব সহজ ছিল, তা বলা যাবে না। সবচেয়ে বড় সমালোচনা ছিল (বা এখনো আছে) কাহিনির মৌলিকত্ব নিয়ে। হাতেগোনা কয়েকটি বই ছাড়া সিরিজের অধিকাংশ বই বিদেশি বিভিন্ন কাহিনির ছায়া অবলম্বনে রচিত। যদিও কোনোদিন অস্বীকার করেননি ব্যাপারটা, তারপরও এ নিয়ে প্রচুর ঝড়ঝাপটা পোহাতে হয়েছে কাজী আনোয়ার হোসেনকে। এর পাশাপাশি বইয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের কনটেন্ট নিয়ে আদালতে যেতে হয়েছে তাকে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের কারণে কোনো কোনো বই পুনর্লিখন করতে হয়েছে, এমনকি বইয়ের স্বত্ব নিয়েও মামলা-মোকদ্দমা লড়তে হয়েছে তাকে। কিন্তু গল্পের মাসুদ রানার মতো তিনিও কখনো হার মানেননি, যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে গেছেন। সে জন্যই থামেনি মাসুদ রানার প্রকাশনা। আমরা আজ উদ্যাপন করতে পারছি সিরিজটির ছয় দশক পূর্তি।
তাই নিঃসন্দেহে বলে দেওয়া যায়, মাসুদ রানার জনপ্রিয়তার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ স্বয়ং কাজী আনোয়ার হোসেন। আমরা তাকে ভুলব না।








