‘মিলনের শ্বাসরোধী কথা’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
প্রিয়
ডাকাতিয়া নদীর সেতু, মনোহরগঞ্জ, কুমিল্লা
নদীর একূল-ওকূলের মাঝে বন্ধন সৃষ্টি করেছ তুমি। দূর থেকে তোমাকে দেখলে প্রথমে কেউ হয়তো ভাবে, তুমি বুঝি দুই পাড়ের হাজারো মানুষের যাতায়াতের কষ্ট ভুলিয়ে দিয়েছ। একটু কাছে গেলেই সেই ভ্রম ভেঙে যায়। তারা দেখতে পায়, তোমাকে আর আমাকে মিলিয়ে দেওয়া হয়নি। তোমার দুই প্রান্ত হঠাৎ করেই শেষ হয়ে গেছে, তারপর খাড়া ঢাল নেমে গেছে। আমার অস্তিত্ব নেই তাতে। মনোহরগঞ্জের ডাকাতিয়া নদীর বুকে দীর্ঘ ২১ বছর ধরে তুমি নিঃসঙ্গ, নিশ্চল আর উদাসীনভাবে দাঁড়িয়ে আছো আমার অপেক্ষায়। তোমাকে ওই রূপে দেখলে বিনয়ের কবিতার এই চরণের কথা মনে পড়ে, ‘...যে যার ভূমিতে দূরে দূরে চিরকাল থেকে– ভাবে মিলনের শ্বাসরোধী কথা।’ আমাদের এমন দূরত্ব দেখে কর্তৃপক্ষের কি একটুও মায়া হয় না?
২০০৫-০৬ অর্থবছরে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা ব্যয়ে বড় সাধ করে তোমাকে গড়া হয়েছিল। ২০০৬ সালে যখন আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের লাল ফিতে কাটা হলো, তখন ভেবেছিলাম– খুব দ্রুতই একসঙ্গে চলতে শুরু করব আমরা। কিন্তু নিয়তির কী পরিহাস, উদ্বোধনের পর থেকে আজ অবধি তোমার দুই পাশের সংযোগ সড়ক, অর্থাৎ আমাকে তৈরিই করা হলো না! আজ তুমি স্থবির আর আমি অপূর্ণ।
আমাকে তৈরি না করায় এলাকার মানুষ অতীতের জরাজীর্ণ বাঁশের সাঁকোকেই আদর্শ মনে করছে
আমাদের তো একে অপরের পরিপূরক হওয়ার কথা ছিল; কিন্তু যারা আমাদের তৈরি করলেন, তারাই আমাদের এমন পরিস্থিতিতে ফেলে রেখেছেন! মানুষের কী নির্মম খেলা! অথচ তোমার পশ্চিম পাশেই রয়েছে হাওরা মাদ্রাসা, পূর্ব পাশে উপজেলা পরিষদ, সরকারি বিভিন্ন দপ্তর, মনোহরগঞ্জ বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। প্রশাসনিক, শিক্ষাগত আর অর্থনৈতিক– সব দিক থেকেই তুমি আর আমি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হতে পারতাম।
আমাকে তৈরি না করায় এলাকার মানুষ অতীতের জরাজীর্ণ বাঁশের সাঁকোকেই আদর্শ মনে করছে! তারা বলছেন, ঝুঁকি নিয়ে হলেও তখন পার হওয়া যেত! এখন তো সংযোগ সড়কই নেই। হতাশ হওয়া স্বাভাবিক, তাই না? মানুষ কি মই বেয়ে উঠবে, বলো?
২০২২-২৩ অর্থবছরে ‘ম্যাক্স’ নামে এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নাকি আমাদের জুড়ে দেওয়ার কাজ শুরু করেছিল, মাঝপথেই তারা উধাও হয়ে গেছে। উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এখন আশ্বাস দিচ্ছেন আমাদের এক করার; কিন্তু কবে আসবে সেই দিন? তুমি আর আমি কি দেখে যেতে পারব, নাকি ততদিনে তোমার আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে যাবে?
ইতি
সংযোগহীন পথ




