পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু বসতি

ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। বরফে ঢাকা আন্দিজ পর্বতের বুক চিরে ধীরে ধীরে এগিয়ে চলছে একটি শ্রমিকবোঝাই ট্রাক। চারপাশে কেবল পাথর, বরফ আর ধূসর পাহাড়। বাতাস এতটাই পাতলা যে, কয়েক কদম হাঁটলেই বুক ধড়ফড় শুরু হয়। প্রতিবার শ্বাস নিতে গেলে মনে হচ্ছে ফুসফুস ছিঁড়ে যাবে। এদিকে হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় শরীর অবশ হওয়ার জোগাড়। কিছুক্ষণ পরই এই শ্রমিকদের নামিয়ে দেওয়া হবে শাবল আর কুড়াল নিয়ে পাথরের দেয়াল খুঁড়তে। কারণ ওই পাথরের আড়ালেই লুকিয়ে রয়েছে ভাগ্যবদলের হাতিয়ার।
পেরুর একদল মানুষ ঘর বাঁধার জন্য বেছে নিয়েছে লা রিনকোনাডা নামে এমন এক জায়গা, যেটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৫১০০ মিটার ওপরে অবস্থিত। পেরুর এ শহরটি বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থায়ী জনবসতি হিসেবে স্বীকৃত।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, অক্সিজেনের পরিমাণ সমুদ্রপৃষ্ঠের তুলনায় অর্ধেক হলেও এখানে হাজার হাজার মানুষ বছরের পর বছর বাস করে যাচ্ছে।
লা রিনকোনাডা শহরটি বলিভিয়া সীমান্তের কাছে মাউন্ট আনানিয়া পর্বতের ঢালে অবস্থিত। এর ঠিক ওপরেই রয়েছে লা বেলা দুরমিয়েন্তে নামের একটি হিমবাহ। এখানকার জলবায়ু অনেকটা মেরু অঞ্চলের মতো। সারা বছরই প্রবল শীতের দাপট। এত প্রতিকূল জায়গায় মানুষ কেন থাকে, সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে। এর উত্তর একটাই, সোনা। এখানে মানুষ আসে ভাগ্যের খোঁজে। এই রুক্ষ পাহাড়ের খাঁজেই লুকিয়ে রয়েছে অমূল্য সম্পদ।
লা রিনকোনাডা মূলত একটি স্বর্ণখনি শহর। শুরুতে এটি ছিল অস্থায়ী খনিশ্রমিকদের ক্যাম্প। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এখানে সোনার খোঁজ পেয়ে মানুষ পরিবার নিয়ে আসতে শুরু করে। অনেকে ভেবেছিলেন, সোনা হয়তো তাদের ভাগ্য বদলে দেবে। সে আশাতেই গড়ে ওঠে স্থায়ী বসতি। বর্তমানে সরকারি হিসাবে এখানে ৭ হাজার মানুষ থাকলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়, এ সংখ্যা ৩০ থেকে ৫০ হাজারের কাছাকাছি।
পেরুর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ভাগ্য বদলানোর আশায় এখানে ছুটে আসে। কিন্তু এই অপরিকল্পিত জনবসতি বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘ সময় কম অক্সিজেনে থাকার কারণে এখানকার বাসিন্দাদের অনেকেই ক্রনিক মাউন্টেন সিকনেস বা দীর্ঘস্থায়ী পাহাড়ি রোগে ভোগে। এত প্রতিকূলতার মধ্যেও লা রিনকোনাডা এখন রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকদের প্রিয় গন্তব্য। যারা চরম অভিজ্ঞতা নিতে পছন্দ করেন, তারা বিশ্বের এই সর্বোচ্চ শহরে পা রাখতে চান।






