ইথিওপিয়ার বান্না আদিবাসীদের গ্রামে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
সামনে ঝকঝকে নীল আকাশ আর পথ ধূসর সরু ফিতার মতো এগিয়ে গেছে সামনে। দুপাশে সবুজ ঝোপঝাড়। কোথাও ফুটেছে বেগুনি রেল লতা ফুল, কোথাও আকন্দ ফুল। আমি আছি দক্ষিণ ইথিওপিয়ার ওমো ভ্যালি নামক এক জায়গায়। ওমো ভ্যালি বিখ্যাত এর বিচিত্র সব আদিবাসীর জীবনযাত্রার জন্য। এ আদিবাসীদের কাছে সভ্যতা এখনো পৌঁছায়নি। এরা নিজেদের খাবার নিজেরা উৎপাদন করে। নারী-পুরুষ কেউই ঊর্ধ্বাঙ্গে পোশাক পরে না। ইথিওপিয়ার সরকারের খুব একটি মনোযোগ নেই তাদের প্রতি। ফলে এখানে বিদ্যুৎ বা পানির সংযোগ নেই, নেই স্কুল বা হাসপাতাল। আদিবাসী মেয়েরা ১০ কিলোমিটার দূরের ওমো নদী থেকে পানি সংগ্রহ করে আনে। এখানে শীতকাল জুলাই মাসে। ভ্রমণটা অক্টোবরের, এখানে তাই বর্ষাকাল। পথ চলতে চলতে একপাল গরু-ছাগল পথরোধ করল। সামনের দিকে এগোনো যাচ্ছে না। তাই গাড়িতে বসে গরু-ছাগল দেখি।
ইথিওপিয়ায় বিদেশি ট্যুরিস্টদের একা চলাফেরা করা সম্পূর্ণ নিষেধ। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে এখানে একজন গাইড সঙ্গে রাখতে হয় এবং আদিবাসী গ্রামে যেতে হলে সেই আদিবাসী গোষ্ঠীর একজন গাইডও থাকতে হয়। আমি যাচ্ছি বান্না আদিবাসী গোষ্ঠীদের গ্রামে। ট্যুর অপারেটর কোম্পানি থেকে গাড়ি, ড্রাইভার ও গাইড পেয়েছি। ওমো ভ্যালির বেশিরভাগ জায়গায় রাস্তা নেই। এবড়োখেবড়ো মাটি বা নুড়িপাথরের ওপর দিয়ে চলতে হয়।
কিছু বোঝার আগেই দেখি ইয়া লম্বা কয়েকজন মানুষ পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে। এরা এত লম্বা কেন?
সামনে আকাশ আর পাহাড় আরও উদার হয়ে ধরা দিচ্ছে। আফ্রিকার ল্যান্ডস্কেপ সবসময়ই আমার প্রিয়। পথটা সরু ফিতার মতো আর বহুদূরে যেখানে আমরা ভাবি পথের শেষ সেখানে মাথা উঁচু করে সগর্বে সবুজ পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে। এই পথের রূপ দেখতে দেখতে পথের মাঝেই গাড়ি থেমে গেল। কিছু বোঝার আগেই দেখি ইয়া লম্বা কয়েকজন মানুষ পথ ধরে হেঁটে যাচ্ছে। এরা এত লম্বা কেন? এরা কি মানুষ? আসলে প্রখর রোদে ঠিকমতো তাকাতে পারছিলাম না। তাই খেয়াল করিনি কয়েকজন কিশোর রণপা পরে হাঁটছে। এরা ওমো ভ্যালির বান্না আদিবাসী গোষ্ঠী। কাছে মফস্বল শহরের অস্তিত্ব থাকায়, এদের অনেকেই এখন রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় টি-শার্ট পরে। তবে এদের জীবনযাপন এখনো কয়েক হাজার বছর আগের মতোই রয়ে গেছে। আছে নিজেদের আলাদা ভাষা, সংস্কৃতি।
বান্না গোষ্ঠীর বড় বৈশিষ্ট্য, এরা রণপা পরে চলতে পারে। শিশুকাল থেকেই এই কৌশল রপ্ত করে। পশুপালন এদের পেশা। তারা যখন গরু-ছাগল মাঠে চড়াতে যেত, তখন তাদের গবাদিপশু বহুদূরে চলে গেলে আর খুঁজে পাওয়া যেত না। তাই নিজেরাই রণপা বানিয়ে নেয়, যাতে গবাদিপশু বহুদূরে চলে গেলেও রণপায় দাঁড়িয়ে এরা নিজেদের পশু চিহ্নিত করতে পারে।
জীবনযাপনের জন্য পশুপালন ও কৃষিকাজ করে। সংসারের খরচ চালানোর জন্য পুরুষদের সঙ্গে নারীরাও কাজ করে জমিতে। নারীরাই বেশিরভাগ কাজ করে। পুরুষরা পশুপালন ও ক্ষেতে কাজ করা ছাড়া অন্য কোনো কাজ করে না। ক্ষেতের ফসল বাইরে বিক্রি করার দায়িত্বও নারীদের। এখানে টাকার প্রচলন নেই। পশু বা শস্যের বদলে দরকারি জিনিস কেনে। পথে কয়েকজন বান্না নারীকে দেখলাম পিঠে শস্য নিয়ে হেঁটে হেঁটে মফস্বল শহরে যাচ্ছে। এ শস্যের বদলে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্তর আনবে। শহর এখান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে। বিবাহিত বান্না নারীদের আলাদা করে চেনা যায় তাদের কেশ বিন্যাসের কারণে। চুল ড্রেডলক করা বা সরু সরু বিনুনি করে কাঁধ পর্যন্ত ছাঁটা থাকে। অন্যদিকে অবিবাহিত নারীরা যেকোনো কেশ সজ্জা করতে পারে।
ইথিওপিয়ার অন্যান্য আদিবাসীর মতোই এরাও প্রকৃতি পূজারি। মূলত পাহাড় বা বড় পাথর, প্রাচীন বৃক্ষ বা পাহাড়ি ঝরনাকে অপরিসীম শক্তির আধার মনে করা হয়। এ ছাড়া সর্বময় কর্তৃত্ববাদী কেউ বাতাসে মিশে আছে বা আকাশে বসবাস করে এমনও তারা মনে করে। গ্রামপ্রধান সবার ভালো-মন্দের সিদ্ধান্ত নেয়। অন্যের পশু ছিনিয়ে নেওয়ার বা ফসল কেটে নেওয়ার মতো আকাঙ্ক্ষা কারও মাঝেই নেই। আমাদের সমাজের মতো অপরাধও নেই। এরা অপরাধ কী, তা-ই জানে না। একেবারে মৌলিক জীবনযাপন করে বলে খাবার ছাড়া তেমন কোনো চাহিদাও নেই তাদের। এ অঞ্চলে নেই কোনো স্কুল বা হাসপাতাল। চিকিৎসার প্রয়োজন পড়লে জড়িবুটি সহায়। কিশোর বয়সে ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয় এবং বিয়েতে বর কনের পিতাকে বেশ কিছু গবাদিপশু বাধ্যতামূলকভাবে যৌতুক হিসেবে দেয়। পুরুষের বহুবিবাহ এদের মাঝে স্বীকৃত। নারী-পুরুষ সবাই গলায়, হাতে, পায়ে পুঁতির তৈরি গয়না পরে।
পথের দুপাশে এখন ঝোপঝাড় আর ক্যাকটাসের বন বাড়ছে। এই পথ দিয়ে হেঁটে আমাকে বান্না আদিবাসী গ্রামে যেতে হবে।
এত অল্পতেই কী শান্তি তাদের আর সেখানে আমাদের অনেকের চাহিদার শেষ নেই
সামনে পরিচ্ছন্ন একটি গ্রাম। আফ্রিকার সব জায়গাই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। আদিবাসীদের গ্রাম যেখানে সভ্যতা পৌঁছায়নি সে গ্রাম এত পরিচ্ছন্ন দেখে অবাক হলাম। গ্রামে অবশ্য এখন তেমন কেউ নেই। বাড়িগুলো গোলাকার ছনের চাল আর মাটির দেয়াল দিয়ে তৈরি। গবাদিপশুর জন্য আছে আলাদা খোঁয়াড়। একটি ঘরে ঢুকে দেখি ভেতরে কিছুই নেই। শুধু চাল থেকে কয়েকটা লাউয়ের খোল ঝুলছে, যা তারা বাসনপত্র হিসেবে ব্যবহার করে আর মাটির দুটি হাঁড়ি এক কোনায় পড়ে আছে। বান্নারা মেঝেতে ঘুমায়। আরেক কোনায় একটি মাদুর গুটিয়ে রাখা আছে। এই হলো এদের তৈজসপত্র ও আসবাবপত্র। রান্নার কাজ করে ঘরের বাইরে পাথরখণ্ড দিয়ে বানানো অস্থায়ী চুলায়।
কয়েকটি শিশু এদিক-ওদিকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কয়েকজন কিশোরীর সন্ধান পেলাম। ওরা সবে কাজ সেরে এসেছে। গ্রামের ভেতরে থাকলে তারা টি-শার্ট পরে না। নিম্নাঙ্গে একখণ্ড বস্ত্র জড়িয়ে থাকে, এমনকি পুরুষরাও। এই গ্রাম একটি সুখী ও সমৃদ্ধ গ্রাম। খাবার ছাড়া আর কোনো বস্তুর প্রয়োজন নেই বলে তাদের জাগতিক বস্তুর প্রতি আকর্ষণও জন্মায়নি। ভাবলাম, এতো অল্পতেই কী শান্তি তাদের। আর সেখানে আমাদের অনেকের চাহিদার শেষ নেই।






