বাঁশিওয়ালাদের বিশ্বকাপ

বিচিত্র সব ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে আছেন বিশ্বকাপের রেফারি-লাইন্সম্যানরা। লিখেছেন আখলাকুজ্জামান অনিক
গল্পটা শুরু করা যাক আজকের চেনা এক দৃশ্য দিয়ে— মাঠে ফাউল হলেই রেফারির পকেট থেকে বেরিয়ে আসা হলুদ বা লাল কার্ড। এ সহজ জিনিসটাও কিন্তু বিশ্বকাপের শুরু থেকে ছিল না। ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা ম্যাচে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক আন্তোনিও রাত্তিনকে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হলেও ভাষার জটিলতায় তিনি নিজেই বুঝতে পারছিলেন না কেন তাকে বের করা হচ্ছে। এ বিশৃঙ্খলা দেখেই রেফারি কেন অ্যাস্টনের মাথায় খেলে যায় এক অভিনব বুদ্ধি। রাস্তার ট্রাফিক সিগন্যাল দেখে তার মনে হলো, রঙেই যদি বোঝানো যায় অপরাধের মাত্রা! সে থেকেই জন্ম নেয় হলুদ আর লাল কার্ড, যা ১৯৭০ সাল থেকে বিশ্বকাপে চালু হয়ে আজও টিকে আছে।
রেফারিং মানেই যে শুধু বিতর্ক, তা নয়— কখনো কখনো তা রীতিমতো রেকর্ডও গড়ে। ১৯৭৪ সালের ফাইনালে ইংলিশ রেফারি জ্যাক টেলর খেলা শুরুর মাত্র এক মিনিটের মাথায় পশ্চিম জার্মানির বিপক্ষে পেনাল্টি দিয়ে বসেন— বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম পেনাল্টি। এর ঠিক উল্টো ঘটনা ঘটে চার বছর পর, ব্রাজিল-সুইডেন ম্যাচে। শেষমুহূর্তে ব্রাজিলের জিকো হেড করে বল জালে পাঠানোর ঠিক মুহূর্তেই ওয়েলশ রেফারি ক্লাইভ থমাস খেলা শেষের বাঁশি বাজিয়ে দেন— বল জালে ঢোকারও ঠিক আগে। গোল বাতিল আর এই এক সেকেন্ডের বাঁশিই হয়ে থাকে ফুটবলের অন্যতম আলোচিত মুহূর্ত।
রেফারিদের কড়া সিদ্ধান্ত এমনভাবে বদলে দিয়েছে ফাইনালের রঙও। ১৯৯০ সালের ফাইনালে মেক্সিকান রেফারি এদগার্দো কোদেসাল আর্জেন্টিনার দুই ফুটবলার পেদ্রো মনসন ও গুস্তাভো দেসোত্তিকে লাল কার্ড দেখান— বিশ্বকাপ ফাইনালে প্রথমবার এক ম্যাচে দুই খেলোয়াড় লাল কার্ড দেখলেন। ষোলো বছর পর, ২০০৬ সালের ফাইনালে ঘটে আরেক নাটক। জিনেদিন জিদান ইতালিয়ান ডিফেন্ডার মার্কো মাতেরাজ্জিকে লক্ষ্য করে যে হেড-বাট মারেন, তা রেফারি হোরাসিও এলিসোন্দোর চোখ এড়ায়নি— আর তাতেই নিজের ক্যারিয়ারের একদম শেষ ম্যাচে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় জিদানকে।
রেফারিরাও তো মানুষ, ভুল তাদেরও হয়। ২০১০ সালে ইংল্যান্ড-জার্মানি ম্যাচে ফ্র্যাংক ল্যাম্পার্ডের শট গোললাইন বহু দূর পেরিয়ে গেলেও রেফারির চোখে তা ধরা পড়েনি, গোল দেওয়াই হয়নি। টিভি রিপ্লেতে সবাই দেখলেও মাঠের রেফারি তা মিস করে যান। এই এক ভুলই ফিফাকে বাধ্য করে গোললাইন প্রযুক্তি নিয়ে ভাবতে আর কয়েক বছরের মধ্যেই তা যুক্ত হয় মাঠে।
এরপর আসে সবচেয়ে বড় বিপ্লব— ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে প্রথমবার চালু হয় ভিএআর। আর এই নতুন প্রযুক্তির অভিষেকটাও হয় রীতিমতো নাটকীয়। ফ্রান্স-অস্ট্রেলিয়া ম্যাচে গ্রিজমান বক্সের ভেতর পড়ে গেলে রেফারি আন্দ্রেস কুনিয়া প্রথমে পেনাল্টির আবেদন উড়িয়ে দেন। কিন্তু মাঠের পাশে থাকা মনিটরে রিপ্লে দেখেই মত পাল্টে ফেলেন তিনি, দিয়ে দেন পেনাল্টি— বিশ্বকাপ ইতিহাসে ভিএআরের মাধ্যমে দেওয়া প্রথম সিদ্ধান্ত। অস্ট্রেলিয়ার সমর্থকরা তখনো ক্ষোভে ফুঁসছেন, ঠিক তার চার মিনিটের মাথাতেই আবার ভিএআরেরই সাহায্যে হ্যান্ডবলের কারণে পেনাল্টি পেয়ে যায় অস্ট্রেলিয়া নিজেরাই! সেই একই ম্যাচে পরে আরেকটা গোল আবার নিশ্চিত হয় গোললাইন প্রযুক্তিতে।
ভিএআরের মাঠের পাশের মনিটরে গিয়ে রিপ্লে দেখার দৃশ্য আর হাত দিয়ে আকাশে বানানো সেই চৌকো ‘টিভি স্ক্রিন’ ভঙ্গিটাও কম মজার নয়— রেফারির এই ইশারা এতটাই জনপ্রিয় হয়ে যায় যে, খেলোয়াড়, দর্শক, এমনকি মাঠের বাইরের মানুষজনও মজা করে সেটা নকল করা শুরু করেন। ২০২২ বিশ্বকাপে যুক্ত হয় আরও একধাপ উন্নত প্রযুক্তি— সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি, যেখানে বলের ভেতরেই বসানো থাকে সেন্সর।
এবার আসা যাক হাল আমলে। কানাডা, মেক্সিকো ও যুক্তরাষ্ট্রে চলা এ বিশ্বকাপে রেফারিংয়ের বহরও ইতিহাসের সবচেয়ে বড়। এবার ৫২ জন রেফারি, ৮৮ জন সহকারী ও ৩০ জন ভিডিও সহকারী রেফারি বাছাই করা হয়েছে— ৪৮ দল আর ১০৪ ম্যাচের নতুন ফরম্যাটে যা এক রেকর্ড। এই দলে আছেন ছয়জন নারী কর্মকর্তাও, যাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের তোরি পেনসো আর মেক্সিকোর কাতিয়া ইতজেল গার্সিয়া নিজেদের দেশ থেকে পুরুষদের বিশ্বকাপে মাঠের রেফারি হওয়া প্রথম নারী। তালিকায় সবচেয়ে চেনামুখ পোল্যান্ডের সিমোন মার্চিনিয়াক, বর্তমান রেফারিদের মধ্যে একমাত্র যিনি আগে বিশ্বকাপ ফাইনাল— ২০২২ সালেরটা পরিচালনার অভিজ্ঞতা নিয়ে নামছেন এবার। সঙ্গে আছেন ইংল্যান্ডের অ্যান্থনি টেলর আর মাইকেল অলিভারের মতো প্রিমিয়ার লিগ-পরিচিত মুখও।
তবে সব গল্পই যে মধুর, তা নয়। নেদারল্যান্ডসের ভিএআর রব ডিপারিংককেও ইংল্যান্ডে গ্রেপ্তার হওয়ার পর বাদ পড়তে হয়, তার জায়গা নেন ফ্রান্সের উইলি দেলাজোদ। বোঝাই যাচ্ছে, মাঠের বাইরের নাটকও রেফারিদের পিছু ছাড়ে না। আর মজার ব্যাপার হলো, ফাইনালে কে বাঁশি বাজাবেন, তা আগে থেকে ঠিক করাই থাকে না।
প্রতিটি ম্যাচের তিন-চার দিন আগে রেফারিদের সাম্প্রতিক ফর্ম দেখে দায়িত্ব দেওয়া হয়, আর কোনো রেফারি নিজের দেশের ম্যাচ পরিচালনা করতে পারেন না বলে নকআউট পর্বের জন্য আগে থেকে কোনো তালিকাও বানানো যায় না। সুইডেনের রেফারি গ্লেন লিন্ডবার্গের একটা মজার অভিজ্ঞতাও এই প্রসঙ্গে উঠে এসেছে— নিজের দেশ যত দূর যাবে, তার নিজেরই তত বাদ পড়ার শঙ্কা, তাই নিজ দেশকে সেমিফাইনালের আগে বিদায় নিতে দেখাটাও তার কাছে হয়ে ওঠে অদ্ভুত এক স্বস্তির মুহূর্ত।
ফুটবলের ইতিহাস যেখানে খেলোয়াড়দের কীর্তিতে ঠাসা, সেখানে রেফারিদের এই নীরব লড়াইটা প্রায়ই থেকে যায় আড়ালে। অথচ বাঁশিওয়ালাদের একটা সিদ্ধান্তই লিখে দেয় ইতিহাসের নতুন পাতা— কখনো ট্র্যাজেডি হয়ে, কখনোবা নিছক কমেডি হয়ে।








