পাহাড়ে ফুল ফোটাচ্ছে, পাওমুম থারক্লা

ক্লাসে পাওমুম থারক্লার শিক্ষার্থীরা
বান্দরবানের লামায় দুর্গম পাড়ায় গড়ে উঠেছে ম্রো সম্প্রদায়ের স্কুল ‘পাওমুম থারক্লা’। স্কুলের অন্যতম উদ্যোক্তা শাহরিয়ার পারভেজের সঙ্গে আড্ডা দিয়ে লিখেছেন সৈয়দ ফরহাদ
ঢাকা থেকে রাত ১০টার বাসে চড়ে বসলে সকাল ৭টায় নামিয়ে দেবে ঠিক লামা বাজারে। সেখান থেকে শুরু আসল যাত্রা। শুকনো মৌসুমে এক ঘণ্টার বাইক রাইড পৌঁছে দেবে একেবারে খাল অবধি। পরপর দুটো খাল— বমু ও পাদু। তখন খাল পেরোতে হবে গোড়ালি পানিতে পা ভিজিয়ে। এরপর পুরোটাই বুনো পথ। চাইলে লামা বাজার থেকে বাইকে না এসে অটোতেও আসা যাবে খাল অবধি। অবশ্য বর্ষা মৌসুমে সেই পথ ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ। কদাচিৎ খাল পার হওয়া যায় নৌকায়। ভীষণ খরস্রোতা সে খালগুলো।
বান্দরবান পার্বত্য জেলার লামা উপজেলার গজালিয়া ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান ‘পাওমুম থারক্লা’ স্কুলের। ম্রো ভাষায় এর অর্থ ‘ফুলের কলি ফোটাতে হবে’ বা ‘কলি থেকে ফোটা ফুল’। স্কুলটি চার-পাঁচটি ম্রোপাড়া দিয়ে ঘেরা পাহাড়ি বনের মধ্যে গড়ে উঠেছে। লামা সদর থেকে প্রায় ৩০-৪০ কিলোমিটার দূরে খাল ও জঙ্গল পেরিয়ে পৌঁছাতে হয় এই দুর্গম ঠিকানায়। এখানে নেই বিদ্যুৎ, মোবাইল নেটওয়ার্ক।
শাহরিয়ার পারভেজ জানালেন, স্কুলের যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে। তখন ছুটি পেলে পাহাড়ে ঘুরতে যেতেন। কখনো থাকতেন ম্রো কমিউনিটির কারও বাড়িতে। ওই সময়ই জানলাম, লামার বমু ও পাদুসংলগ্ন চার-পাঁচটি গ্রামের ৪০ কিলোমিটারের মধ্যেও কোনো স্কুল নেই।
তখন লামার আরেকটি স্কুলে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করছিলেন শাহরিয়ার। সেখান থেকেই ম্যানরং ম্রো-এর সঙ্গে পরিচয়। ম্যানরংও পাওমুম থারক্লা স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। আরেক প্রতিষ্ঠাতা হলেন কমিউনিটির কারবারি চংকক ম্রো।
শুরুটা কারবারির বাড়িতে। প্রথম দিকে সেখানে বাংলা বা ইংরেজির আনুষ্ঠানিক পাঠের চেয়ে গুরুত্ব পেত ধর্ম, সংস্কৃতি ও ম্রো ভাষা। রাতে ১০-১২ জন বাচ্চা আসত। দেওয়া হতো ছোট বিস্কিটের প্যাকেট। শুরুটা এভাবেই।
ম্রো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বিষয়ে জানতেন কাইংপ্রে ম্রো। তার তত্ত্বাবধানে সপ্তাহে দুই-তিন দিন চলত এই পাঠশালা। দুই বছর ধরে এভাবেই শিশুদের স্কুলমুখী করার চেষ্টা চলে। ধীরে ধীরে হাতে আসে স্লেট, চক, বই। অক্ষর চিনতে শেখার পাশাপাশি শিশুরা নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে থাকে।
২০১৬ সালে উদ্যোগটি আনুষ্ঠানিক স্কুলে রূপ পেতে শুরু করে। স্কুলঘর তৈরিতে গ্রামের মানুষ শ্রম দেন, কেউ বাঁশ দেন, কেউ কাঠ। উদ্যোক্তারা দেন টিনসহ প্রয়োজনীয় কিছু উপকরণ। পাহাড়ের মানুষের সম্মিলিত চেষ্টায় দাঁড়িয়ে যায় প্রথম স্কুলঘর। স্কুলঘর একটু উঁচুতে; অ্যাসেমব্লি গ্রাউন্ড আর রান্নাঘর খালের কাছে। হোস্টেল আরও ওপরে। প্রতি বছর বর্ষায় হয় আকস্মিক বন্যা (ফ্ল্যাশ ফ্লাড)। ভেঙে যায় রান্নাঘর। যদিও এ বছরের আকস্মিক বন্যায় স্কুলের বিশেষ ক্ষতি হয়নি।
এখন সেই স্কুলে শিক্ষার্থী ৭৮ জন। তাদের মধ্যে ৩৮ জন আবাসিক। শিশু থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। শিক্ষক ও কর্মী মিলিয়ে আছেন ছয়জন। পাঁচজন শিক্ষক ও একজন রাঁধুনি। প্রধান শিক্ষক কাইং পং রো, ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষাদানের সঙ্গে যুক্ত আছেন মাংকং রোসহ অন্যরা। শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগই প্রতিদিন হেঁটে স্কুলে আসে। কাছের গ্রামের শিশুদের ১৫-২০ মিনিট লাগে, দূরের শিশুদের ৪০-৫০ মিনিটও হাঁটতে হয়। প্রধান শিক্ষকও প্রতিদিন হেঁটেই স্কুলে আসেন।
পাঠ্যক্রমে আছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) পড়াশোনা। পাশাপাশি আলাদা সময় রাখা হয়েছে ম্রোদের ধর্ম, ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য। স্কুলের শিক্ষকরা নিজেরাই ম্রো ভাষার প্রাথমিক পাঠের বই, ছড়া ও অন্যান্য উপকরণ তৈরি করেছেন। শিশুদের মাধ্যমে তাদের পরিবার এবং পুরো গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করার চেষ্টা চলছে। স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা, কারুশিল্প, আধুনিক প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে কর্মশালার আয়োজন করা হয়।
এই কাজের আরেকটি বড় ফল হলো, আশপাশের চারটি গ্রামে বাল্যবিয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। স্কুল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, মেয়েদের পড়াশোনায় ধরে রাখার কারণে এই সামাজিক বাস্তবতায়ও পরিবর্তন এসেছে।
স্কুলটি চালাতে বছরে প্রয়োজন হয় প্রায় ১৮ থেকে ২০ লাখ টাকা। প্রতি বছর প্রায় এক লাখ টাকা ঘাটতি থেকে যায়। শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন ও অন্যান্য খরচের বড় অংশ আসে নিয়মিত দাতা ও ক্রাউডফান্ডিং থেকে।
সবচেয়ে বড় চাপ এখন খাবারের খরচ। আলাপের এক পর্যায়ে আফসোস করে শাহরিয়ার জানালেন, আবাসিক শিশুদের প্রোটিনের চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। স্কুল কর্তৃপক্ষের স্বপ্ন, পর্যাপ্ত অর্থ পাওয়া গেলে প্রতিটি আবাসিক শিশুর জন্য একটি করে মুরগি পালন করা হবে। এতে ডিম ও মাংস— দুই ধরনের পুষ্টিরই ব্যবস্থা করা সম্ভব হবে।
শিশুদের তৈরি পুঁতির অলংকারও স্কুলের অর্থসংস্থানের একটি পথ। গত বছর শিশুদের তৈরি অলংকার বিক্রি করে প্রায় এক লাখ টাকা পাওয়া গেছে। সেই অর্থও স্কুলের কাজে ব্যয় হয়েছে। এই স্কুলের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো শিক্ষার্থীদের অর্জন। সাংলেন ম্রো তাদেরই একজন; কারবারি চংকক ম্রো-এর মেয়ে। পাওমুম থারক্লা থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাস করে এখন সে মাধ্যমিকে পড়ছে। নিচ্ছে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি।
এই স্কুল গড়ে তোলার পথও সহজ ছিল না। শাহরিয়ারের ভাষায়, গত ১২ বছরে এমন সময় গেছে, যখন বছরের চার-পাঁচ মাস তাকে পাহাড়েই থাকতে হয়েছে। স্কুল ভবন নির্মাণের সময় চাকরি ছেড়ে থেকেছেন শ্রমিকদের সঙ্গে। বাঁশ-কাঠের দোতলা দুটি ভবন এখন দাঁড়িয়ে আছে; মোট আয়তন আড়াই হাজার বর্গফুটের বেশি।
খালের ওপর আগে প্রায় প্রতি বছর নতুন করে সেতু বানাতে হতো। এবার স্থানীয়দের প্রশিক্ষণ দিয়ে পুরনো ইউরোপীয় নকশার আদলে খুঁটিবিহীন একটি ঝুলন্ত সেতু তৈরি করা হয়েছে।
সহকারী প্রধান শিক্ষক ম্যানকং ম্রো বলেন, ‘২০২০ সাল থেকে স্কুলের সঙ্গে আছি। ক্লাসে বাংলা ও ম্রো— দুই ভাষাতেই পাঠদান করা হয়। তবে বাচ্চাদের ইংরেজি ভাষা বোঝার ক্ষেত্রে এখনো কিছু ঘাটতি আছে। কারণ, এটি তো তাদের থার্ড ল্যাঙ্গুয়েজ। আশা করি, এটিও তারা কাটিয়ে উঠবে।’
শাহরিয়ার জানান, এখন লক্ষ্য আরও বড়। একটি ফাউন্ডেশন বা ট্রাস্ট নিবন্ধনের উদ্যোগ চলছে। পঞ্চম শ্রেণির পর যেন শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে না যায়, সে জন্য স্কুলটিকে মাধ্যমিক পর্যায়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে। পাশাপাশি বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির অন্য এলাকায়ও ম্রো শিশুদের জন্য এ ধরনের শিক্ষার সুযোগ তৈরির স্বপ্ন দেখছেন স্কুলের উদ্যোক্তারা।



