ব্র্যান্ডের নাম মুছে শহরের নাম

মেটলাইফ স্টেডিয়াম। ছবি: সংগৃহীত
কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর চোখ এখন বিশ্বসেরা স্টেডিয়ামগুলোর সবুজগালিচায়। কিন্তু যারা নিয়মিত ফুটবল বা অন্যান্য খেলাধুলা অনুসরণ করেন, তারা খেলা দেখতে গিয়ে কিছুটা খটকার মধ্যে পড়েছেন।
যে স্টেডিয়ামটিকে তারা এতদিন ‘মেটলাইফ স্টেডিয়াম’ বা ‘মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়াম’ নামে চিনতেন, বিশ্বকাপের অফিসিয়াল শিডিউল বা টিকিটে সেগুলোর নাম দেখা যাচ্ছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। বিশ্বকাপ উপলক্ষে বেশ কয়েকটি বিশ্বখ্যাত স্টেডিয়ামের নাম সাময়িকভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে।
তবে এটি কোনো প্রশাসনিক বা মালিকানা পরিবর্তনের কারণে নয়, বরং ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ামক সংস্থা ‘ফিফা’র কঠোর বাণিজ্যিক নীতিমালার মারপ্যাঁচে ঘটেছে।
বিশ্বকাপের মতো মেগা ইভেন্টে স্টেডিয়ামের নাম বদলে ফেলার মূল কারণ ফিফার একটি বিশেষ নিয়ম, যাকে বলা হয় ‘ক্লিন সাইট রুল’।
আধুনিক যুগের বেশিরভাগ বড় স্টেডিয়ামের নামকরণের অধিকার বড় বড় করপোরেট কোম্পানি কোটি কোটি ডলারের বিনিময়ে কিনে নেয়। কিন্তু ফিফা বিশ্বকাপের নিজস্ব গলোবাল স্পন্সর ও পার্টনার থাকে। ফিফার স্পন্সরদের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনো কোম্পানির নাম যদি স্টেডিয়ামের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে সেখানে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হয়।
তা ছাড়া ফিফা তাদের অফিসিয়াল স্পন্সরদের কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার পেয়ে থাকে। বিনিময়ে তারা গ্যারান্টি দেয়, বিশ্বকাপ চলাকালীন স্টেডিয়ামের ভেতর, টিকিট, টিভি সম্প্রচার কিংবা ধারাভাষ্যে অন্য কোনো থার্ডপার্টি ব্র্যান্ডের নাম বা লোগো ফ্রিতে প্রচারিত হতে পারবে না।
যেহেতু স্টেডিয়ামের নাম গণমাধ্যমে লাখো-কোটিবার উচ্চারিত হয়, তাই ফিফা পুরো ভেন্যুকে করপোরেট নামমুক্ত বা ‘ক্লিন’ রাখার নিয়ম করেছে।
ফিফার এই নিয়মের বেড়াজালে পড়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের বেশ কয়েকটি হাই-প্রোফাইল ভেন্যু সাময়িকভাবে তাদের বাণিজ্যিক নাম বিসর্জন দিয়ে ভৌগোলিক বা শহরের নামে আত্মপ্রকাশ করেছে। যেমন— নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে অবস্থিত বিখ্যাত ‘মেটলাইফ স্টেডিয়ামটি’ তার নাম মুছে সাময়িকভাবে ‘নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম’ নামে টুর্নামেন্ট পরিচালনা করছে।
একইভাবে আটলান্টার চোখধাঁধানো ছাদযুক্ত ‘মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামটি’ থেকে মার্সিডিজের ব্র্যান্ডিং সরিয়ে শুধু ‘আটলান্টা স্টেডিয়াম’ রাখা হয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার বিলিয়ন ডলারের ‘সোফি স্টেডিয়ামটি’ সোফি নামক ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানির নাম বাদ দিয়ে ‘লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়াম’ নামে ম্যাচ আয়োজন করছে।
একই নিয়মে টেক্সাসের বিখ্যাত ‘এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামের’ নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘ডালাস স্টেডিয়াম’। মায়ামির ‘হার্ড রক স্টেডিয়াম’ এখন অফিসিয়ালি ‘মায়ামি স্টেডিয়াম’। ফিলাডেলফিয়ার ‘লিংকন ফাইন্যান্সিয়াল ফিল্ড’ তার বাণিজ্যিক নাম বদলে হয়েছে ‘ফিলাডেলফিয়া স্টেডিয়াম’। বোস্টনের ‘জিলেট স্টেডিয়ামের’ নাম সাময়িকভাবে বদলে রাখা হয়েছে ‘বোস্টন স্টেডিয়াম’ এবং সিয়াটলের ‘লুমেন ফিল্ড’ পরিচিতি পেয়েছে ‘সিয়াটল স্টেডিয়াম’ নামে।
এমনকি কানাডার টরন্টোতে অবস্থিত ব্যাংক অব মন্ট্রিয়লের নামাঙ্কিত ‘বিএমও ফিল্ড’ এখন কেবলই ‘টরন্টো স্টেডিয়াম’। বিশ্বকাপের ফাইনাল বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই এই স্টেডিয়ামগুলো আবার তাদের পুরনো বিলিয়ন ডলারের করপোরেট নামে ফিরে যাবে। তবে এক মাসের এই ছদ্মনাম ধারণ প্রমাণ করে, আধুনিক ফুটবলে খেলাধুলার রোমাঞ্চের পাশাপাশি পর্দার পেছনের বাণিজ্যিক সমীকরণ এবং ডলারের যুদ্ধ কতটা শক্তিশালী ও নিখুঁত।
সূত্র: ফিফা, সিবিএস স্পোর্টস, ফক্স স্পোর্টস




